গারো পাহাড়ি অঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির ঘর

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৬:০০

মাজহারুল ইসলাম মিশু
ADVERTISEMENT

একটা সময় ছিল ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট গারো পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় হাজার হাজার পরিবার মাটির তৈরি ঘরে বসবাস করত। বর্তমান আধুনিক সভ্যতার যুগে এখন আর এই ঘরের প্রতি আগ্রহ যেন হারিয়ে ফেলেছে এই অঞ্চলের প্রায় সব পরিবার। একসময় এই এলাকার ছোট-বড় প্রায় পরিবারই নিজেদের হাতে গড়া মাঠির দালানের ঝুপড়ি ঘরে পরিজন নিয়ে বসবাস করত। গারো পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষজন মাটির দালানে বসবাসকে নিজেদের আভিজাত্য মনে করত। উপজেলার পাহাড়বেষ্টিত জনপদ ভুবনকুড়া, জুগলী, গাজীরভিটা এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অনেক পারিবার এখনো মাটির ঘরে বসবাস করছে। 

সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরিকালে মাটির দালানের ছবি তোলার জন্য যেতে হলো জুগলী ও ধারা ইউনিয়নের হতদরিদ্র এলাকা লালারপারে। অথচ একসময় প্রায় সব বাড়িতেই ছিল এই মাটির ঘর। পাহাড়ি এসব এলাকায় অনেক পরিবার এখনো মাটির দালানে নিজেদের সাধ্যমতো টিন ও ছনের (খড়ের) চাল তৈরি করে যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন। 

আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের মতো আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে মাটির দালানেও ব্যবহার করা হয় দর্শনীয় কারুকাজসহ দরজা-জানালা। সাধারণ একটি মাটির তৈরি দালানের স্থায়িত্ব হচ্ছে একশ’ থেকে দেড়শ’ বছর। অনেকে মনে করেন এগুলোর সবই ভূমিকম্প সহনীয়। মাটির দালান তৈরি করতে ৩-৪ মাস সময় ব্যয় হলেও এটির তৈরি খাতে কোনো আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতো না। টিলার চিকনি মাটি দিয়ে নিজেদের বসবাসের জন্য তৈরি করা হয় এসব মাটির দালান, যা এখন শুধু আদিবাসীদের সংস্কৃতিতে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে সর্বমহলে সমাদৃত। জানা যায়, এসব মাটির দালান তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে নারীরা।

পাহাড়ি এলাকার মাটির ঘরে বসবাসকারী অনেক আদিবাসী জানান, মাটির দালানে টিলা থেকে সংগৃহীত চিকনি মাটি ও পানির সংমিশ্রণে এটি তৈরি করা হয়। ঘরের চাল দেওয়া হয় ছন ও টিন দিয়ে। আগেকার দিনে এলাকার প্রায় প্রতিটি ঘরেই দেওয়া হতো ছনের চাল। এখন অনেকে সাধ্যানুযায়ী চালে টিন ব্যবহার করেন। এসব মাটির দালানের দেয়ালের পুরুত্ব হচ্ছে এক ফুট থেকে দেড় ফুট পরিমাণে। অনেক দালানের দেয়ালের ভেতরে বাঁশের খুঁটি ব্যবহার করা হয়। কাঠ ও বাঁশের তৈরি দরজা ব্যবহার করা হয় এগুলোতে। আর এসব দালানে প্রয়োজন মতো জানালা তৈরি করায় ঘরের সৌন্দর্যও অনেকটা বৃদ্ধি পায়। 

এসব ঘরে বসবাস করলে আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বলে মনে হয়। আগেকার দিনে এলাকার মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টানসহ প্রায় প্রতিটি জাতিই মাটির ঘরে বসবাস করত। এখন আদিবাসী পরিবারগুলোই এসব মাটির ঘরকে আঁকড়ে ধরে আছে। যদিও অনেক মুসলিম ও হিন্দু পরিবারে কিছু কিছু মাটির ঘর মাঝে মধ্যে দেখা যায়। মাটির ঘরে বসবাসকারী অনেকে এই ঘরকে স্বাস্থের জন্য খুবই উপকারী বলে দাবি করেন। ঘর তৈরির সময়ে মাটির নিচ থেকে গাঁথুনি দিয়ে দেয়াল নির্মাণের ফলে ছিঁচকে চোর ও সিঁদেল চোরের উপদ্রব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। দেয়ালের পুরুত্ব এক থেকে দেড় ফুট থাকায় বন্দুকের গুলিও এসব দেয়াল ভেদ করতে পারে না। টিলার ভেতর থেকে সংগৃহীত চিকনি মাটি একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে ভেঙে গুঁড়ো করা হয়। এরপর গুঁড়ো মাটির সঙ্গে কয়েক দফা পানির সংমিশ্রণ দিয়ে এসব মাটি থেকে আঠালো জাতের কাদা তৈরি করে দেয়াল নির্মাণের উপযোগী করে তোলা হয়।

পাহাড়ি অঞ্চলের প্রায় লোকজন হতদরিদ্র ও দিনমজুর থাকায় ছোট ছোট মাটির দালান তৈরি করে অনেক পরিবার যুগ যুগ ধরে মাটির তৈরি ঘরে বসবাস করে আসছেন। টিলা এলাকায় পুকুরের ব্যবস্থা না থাকায় মাত্র একশ ফুট গভীরতার মধ্যেই একটি টিউবওয়েল বসানোরও ক্ষমতা নেই অনেকের। এসব এলাকায় ৬০ থেকে ৭০ ফুট গভীরেই টিউবওয়েলের সুস্বাদু পানি পাওয়া যায়। আধুনিক যুগে হয়তো আর কিছুদিনের মধ্যেই মাটির তৈরি ঘরগুলো স্মৃতি হয়ে যাবে। হয়তো এই অঞ্চলে স্মৃতি হয়ে থাকবে আভিজাত্যের প্রতীক মাটির ঘর।