অসুস্থ মাকে শেকল পরিয়ে আটকে রেখেছে সন্তানরা

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০১৬, ১৯:১২

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

অসুস্থ বৃৃদ্ধা মাকে শেকলে দিয়ে আটকে বন্দি করে রেখেছে নিজ সন্তানরা। বর্বরতার সামিল এমন ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের রাউজানে।

জানা গেছে, রাউজান পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কিশোরী মোহন বাড়ির অসুস্থ মাকে (মীরা দে) তিন মাসের বেশিসময় ধরে পায়ে শেকল পরিয়ে অন্ধকার ঘরে তালাবদ্ধ করে রেখেছেন তার সন্তানরা।

প্রায় দেড়-দুই বছর ধরে এই বৃদ্ধা মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তিনমাস ধরে মীরাকে শেকল পরিয়ে রাখা হয়েছে। ঘটনাটি প্রতিবেশী সচেতন ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

এলাকাবাসীর অনেকেই বলছেন, মীরার মানসিক সমস্যা আছে। কিন্তু, পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্যহীন কিংবা পাগল নন। তিনি প্রতিবেশী ও স্বজনদের চিনতে পারেন। ভাত খেতে চান, শেকল খুলে দিতে বলেন। ডাক্তারের কাছে যাবেন কিনা জিজ্ঞেস করলে ‘হ্যাঁ’ বলে উত্তর দেন। এ রকম রোগীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা অন্যকোনো হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করা হলে সুস্থ হয়ে উঠবেন। অথচ তার সন্তানরা সেটি না করে তাকে পায়ে শেকল পরিয়ে বন্দি অবস্থায় রেখেছেন ঘরের মধ্যে।

মীরা দেকে যে রুমে রাখা হয়েছে সেটি অন্ধকার। বিদঘুটে গন্ধ পুরো রুমজুড়ে। বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দরজা। ভেতরে ৬৫ বছর বয়সী মীরা দে’র পায়ে শেকল পরা। খাটের (চৌকির) সঙ্গে বাঁধা সেই শেকল। বাইরে কোনো আগন্তুকের কণ্ঠ শুনলেই বৃদ্ধা মীরা বলছেন, ‘ইবা কন, কন আইস্যিদে, কিল্লা আইস্যিদে’ (সে কে, কি জন্যে এসেছে) কিংবা ‘আই ভাত খাইয়ুম, আরে দু’য়া ভাত দে’ (আমি ভাত খাবো, আমাকে অল্প ভাত দাও)।

প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা বৃদ্ধা মীরা দে’র স্বামী বিরেন্দ্র দে মারা যান বহু বছর আগে। তার দুই ছেলে সন্তানের মধ্যে অঞ্জন দে’র দোকান আছে রাউজানে। কাঞ্চন দে চট্টগ্রাম শহরে থাকেন কর্মসূত্রে।
 
মীরার দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। দেড় বছর আগে মীরার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। অস্বাভাবিক আচরণের কারণে তাকে কখনো শেকল পরিয়ে রাখা হয়নি। কিন্তু গত তিনমাস ধরে তাকে দুর্গন্ধময় একটি রুমে শেকল পরিয়ে তালাবদ্ধ রেখেছেন তার সন্তানরা।

প্রতিবেশী এক তরুণ বলেন, মীরার মানসিক কিছু সমস্যা থাকলেও তিনি সবকিছু চেনেন। আমি ডাক দিলে আমার ডাকে সাড়া দেন। খেতে চান। শেকলপরা থেকে মুক্ত হয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে চান। চিকিৎসা পেলে তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই তরুণের মা বলেন, আমি বাইরে থেকে এসেছি বুঝলে আমাকে ভাত দিতে বলেন। সাধ্যমতো চেষ্টা করি তাকে খাবার দিতে। তার ছেলেরা তাকে মেডিকেলে না নিয়ে গিয়ে কেন শেকল পরিয়ে রেখেছেন বুঝছি না। সবসময় শেকল খুলে দিতে বলেন মীরা। খারাপ লাগে তার জন্যে।

এ ব্যাপারে প্রতিবেশী রত্না চৌধুরী ও কমলা চৌধুরী বলেন, শেকলপরা থেকে মুক্ত হতে আর্তনাদ করেন বৃদ্ধা মীরা।

মীরার ছেলে অঞ্জন দে’র স্ত্রী শিবু দে বলেন, দেড় বছরেরও অধিক সময় ধরে শাশুড়ি অসুস্থ। ওষুধ খেতে চায় না। ঝোঁপ জঙ্গলে চলে যায়। তাই তাকে গত তিনমাস ধরে শেকল পরিয়ে ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। সেই ঘরেই তাকে খাবার দেয়া হয়। তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়াও দেন সেই ঘরে।

এ ব্যাপারে মীরার ছেলে কাঞ্চন দে মুঠোফোনে বলেন, মানসিক সমস্যার কারণে তাকে (মাকে) কিছুদিন ধরে শেকল পরিয়ে রাখা হয়েছে। তার চিকিৎসা করাবো।
 
স্থানীয় পৌরসভার কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট দীলিপ চৌধুরী বলেন, মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ায় ঘরের মধ্যে এক নারীকে আটকে রাখার কথা শুনেছি। বিষয়টি আমি সরেজমিনে গিয়ে দেখবো।