পুলিশের গর্ব ওসি মর্জিনা

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

শরীফুল রুকন চট্টগ্রাম
ADVERTISEMENT

‘পুলিশ বাহিনীতে যোগদানের জন্য চিঠি হাতে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম। এরপর দিনদিন পুলিশের ইউনিফর্মের প্রতি ভালোবাসাই বেড়েছে। পরিবারের সবাই সাহস দিয়েছেন। তারপর থেকে যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গেই আমি আমার দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি। মাথার উপর ছায়া হয়ে আছেন বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ব্যর্থ হয়েছি, তা কখনো মনে হয়নি।’

মঙ্গলবার চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাট থানায় নিজের কার্যালয়ে বসে কথাগুলো বলছিলেন মোছাম্মৎ মর্জিনা আক্তার মর্জু। কর্মজীবনে দক্ষতার সঙ্গে যে কাজ করছেন, তা তার কাজের পরিধি দেখলেই বোঝা যায়। মর্জিনা এখন সদরঘাট থানা পুলিশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে।

অবশ্য নেতৃত্বদানের সহজাত গুণ তাঁর মধ্যে ছিল শিক্ষাজীবন থেকেই! ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর চট্টগ্রাম সরকারী মহিলা কলেজ ছাত্রী সংসদের নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) ছিলেন মর্জিনা। মেধা, দক্ষতা ও সদিচ্ছা থাকলে নারীরাও যে নেতৃত্বদানে সক্ষম তা শিক্ষাজীবনে প্রমাণ দিয়ে এসেছেন এই নারী পুলিশ কর্মকর্তা।

শিক্ষাজীবনে ১৯৯৩ সালে এসএসসি পাস করেন প্রথম শ্রেণীতে। এরপর পড়াশোনার পাশাপাশি স্কাউট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। গার্ল ইন স্কাউটিং বিভাগের প্রথম ব্যাচের একজন ছিলেন মর্জিনা। ছিলেন লিডার ট্রেনার। অর্জন করেন উডব্যাজ। ১৯৯৫ সালে এইচএসসি’র ফলাফলে দ্বিতীয় বিভাগ পান। ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম সরকারী মহিলা কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ১০ম স্থান অর্জন করে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ নাম্বার নিয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৩ সালে চট্টগ্রাম সরকারী বিএড কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ২০০৩ সালে সারদা পুলিশ একাডেমীতে এক বছরের মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে ২০০৪ সালে মর্জিনা বাংলাদেশ পুলিশে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষানবীশ এসআই হিসেবে কক্সবাজার সদর ও রামু থানা কাজ করেন। চাকরি স্থায়ী হওয়ার পর মর্জিনাকে পদায়ন করা হয়, কক্সবাজার জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায়।

আলাপচারিতায় মর্জিনা আক্তার মর্জু বলেন, ‘কক্সবাজার জেলা ডিবি পুলিশে দুই বছর কাজ করেছি। সেসময় পুরো কক্সবাজারের প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে গৃহপরিচারিকার তথ্য সম্বলিত ডাটাবেজ তৈরী করেছিলাম। আমার নেতৃত্বে ডিবির একটি টিম ছিল। পুরো কক্সবাজারজুড়ে অভিযান চালাতাম। মাদকবিরোধী অসংখ্য অভিযান চালিয়েছি। তৎকালীন পুলিশ সুপার বনজ কুমার মজুমদার স্যার ছিলেন মাথার উপর ছায়া হয়ে।’

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট কক্সবাজারে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটির তদন্ত শেষে চার্জশিট দিয়েছিলেন তৎকালীন জেলা ডিবি পুলিশের এসআই মর্জিনা। ‘ভয়ংকর জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রমাণের জন্য দিনরাত কাজ করেছি। জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ২০০৭ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছি। জঙ্গিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আদালতে সাক্ষী দিয়েছি।’ -বলেন মর্জিনা আক্তার মর্জু।

২০০৭ সালে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের ডবলমুরিং থানায় পদায়ন করা হয় মর্জিনাকে। এরপর ২০০৮ সালে কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে জানতে মর্জিনাসহ চার পুলিশ কর্মকর্তাকে নেপাল পাঠানো হয়। সেখান থেকে ফিরে নগরীর দামপাড়ায় পুলিশ ট্রেনিং স্কুলে প্রশিক্ষক হিসেবে পদায়ন করা হয় তাকে। সেখান থেকে ২০০৯ সালে মর্জিনাকে কোতোয়ালী থানায় বদলি করেন তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উত্তর জোনের উপকমিশনার বনজ কুমার মজুমদার। কোতোয়ালীতে দুই বছর কাজের পর ২০১১ সালে সেকেন্ড অফিসার হিসেবে পাঁচলাইশে বদলী করা হয় মর্জিনাকে। উত্তর জোনে চাকরির ৩ বছর পূর্ণ পওয়ায় তাকে বদলি করা হয় বন্দর জোনের ডবলমুরিং থানায়। সেখানে কয়েক মাস কাজ শেষে ২০১২ সালে পাড়ি জমান জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন সুদানে। মিশনে যাওয়ার ১৫ দিনের মাথায় পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি পান মর্জিনা। ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুদানের দারফুরে ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেন হিউম্যান রাইটস অফিসার, মুভকন অফিসার ও সর্বশেষ জেন্ডার অফিসার হিসেবে। ২০১৪ সালে মিশন থেকে ফেরার পর তাকে ১১ এপিবিএনে পদায়ন করায়, সেখান থেকে রিক্যুইজিশন দিয়ে তাকে সিএমপিতে নিয়ে আসেন তৎকালীন সিএমপি কমিশনার মোহাঃ শফিকুল ইসলাম। এরপর ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল সদরঘাট থানায় নতুন করে সৃষ্ট পরিদর্শক (তদন্ত) পদে পদায়ন করা হয় মর্জিনাকে। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল একই থানায় তাঁকে অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে পদায়ন করা হয়।

১৩ বছরের পুলিশ জীবনে অনেক প্রাপ্তি মর্জিনার। খোলাসা করে বলা যাক তাঁর অর্জনের কথা। ২০১৩ সালে সুদানের দারফুরে শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনে সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরুপ ‘শান্তি পদকে’ ভূষিত হন মর্জিনা। মাঠ পর্যায়ে সুনামের সাথে কাজ করা ও পুলিশি তদন্তে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখা ও সাহসিকতার জন্য তাকে ‘উইমেন পুলিশ অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়েছে। গত ৩১ মার্চ বাংলাদেশ পুলিশে প্রথমবারের মত এই অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়।

একমাত্র নারী ওসিকে স্মারক কয়েন ও ফুল দিয়ে সংবর্ধিত করতে গত ১৭ মে সদরঘাট থানায় গিয়েছিলেন উইলিয়াম স্কট কর্টিজি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস এর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেটিভ ট্রেনিং অ্যাসিসটেন্ট প্রোগ্রামের সিনিয়র ল এনফোর্সমেন্ট এডভাইজার। থানার প্রধান হিসেবে একজন নারীকে পদায়ন করায় সেসময় সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার ও বাংলাদেশ পুলিশের প্রশংসাও করেছিলেন উইলিয়াম।

গত ৯ থেকে ১৩ অক্টোবর স্পেনের বার্সেলোনা শহরে অনুষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশের (আইএডব্লিউপি) ৫৪তম বার্ষিক সম্মেলন। এতে বাংলাদেশ থেকে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পান ডিআইজি মিলি বিশ্বাস, সদর দপ্তরের দুইজন এআইজি, ডিএমপির একজন এডিসি ও সিএমপির পরিদর্শক মর্জিনা। মাঠপর্যায়ে কর্মরত নারী পুলিশ সদস্যদের মধ্যে থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে এই সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার শিকলবাহা গ্রামে ১৯৭৮ সালের ৩ নভেম্বর জন্ম নেয়া মর্জিনা আট ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম। বাবা মোহাম্মদ রফিক মারা গেছেন। মা জয়নব বেগম বেঁচে আছেন। ২০০৮ সালে ব্যাংকার আরিফুল আজমের সঙ্গে মর্জিনা সংসারজীবনে প্রবেশ করেন। ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের নাজিরহাট শাখায় ম্যানেজার (অপারেশন্স) হিসেবে কর্মরত আছেন আরিফুল আজম। তাঁদের এক মেয়ে ও এক ছেলে সন্তান রয়েছে। একজন নুজহাত মার্জিয়া আজমি (৬), আরেকজন আজলান মালিক আবির (৩)।

শিক্ষাজীবনে বাবার পক্ষ থেকে ‘বাধার’ সম্মুখীন হয়েছিলেন। বাবার ভয় ছিল ডানপিটে মর্জিনা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়বেন; তাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও সেখানে পড়তে দেননি। কিন্তু নেতৃত্ব দেয়া যাঁর সহজাত, তাকে তো আর আটকিয়ে রাখা যায় না! সরকারী মহিলা কলেজে পড়ার সময় ছাত্র সংসদের নেতৃত্ব কাঁধে তুলে নেন মর্জিনা। এ নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন মর্জিনা, ‘মহিলা কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি হওয়ার পর বাবা বলেছিলেন, তাকে তো আটকিয়ে রাখতে পারলাম না!’

পুলিশের কাজ ও সংসার জীবন দুটোই দারুণভাবে সামলাচ্ছেন মর্জিনা আক্তার মর্জু। বলেন, ‘অন্যান্য চাকরির সঙ্গে পুলিশের চাকরি মেলানো যাবে না। সেবার মানসিকতা নিয়ে পুলিশে কাজ করতে হয়। বিষয়টা আমার স্বামী বুঝেন। অনেক সময় রাত দুইটা-তিনটায় বাসায় ফিরতে হয়। স্বামী এ নিয়ে কোনো অভিযোগ করেননা। বরং অনুপ্রেরণা দেন। ২৪ ঘন্টা আমি মোবাইল রিসিভ করি। চোখে ঘুম নিয়েও মুহুর্তের মধ্যে কল রিসিভ করি। অফিসারদের দিক-নির্দেশনা দিই।’

প্রচলিত একটি কথা আছে; আইন হচ্ছে গরীবের জন্য মাকড়সার জাল, আর ধনীদের জন্য মুক্ত আকাশ! এ কথার সাথে একমত পোষন করেন ওসি মর্জিনা। এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘টাকা না থাকায় আইনী সহায়তা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে গরীব মানুষরা পিছিয়ে পড়েন। তাই আমার থানায় কোন অসহায় মানুষ আসলে, সবার আগে তার কাজটা করি। সবসময় অসহায়, নির্যাতিতদের পাশে থাকার চেষ্টা করি।’

চট্টগ্রাম মহানগর পুুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘বর্তমানে থানার দায়িত্বে থাকা দেশের একমাত্র নারী ওসি মর্জিনা। তিনি ভালো কাজ করছেন। মাঠপর্যায়ের নারী পুলিশ সদস্যরা তাকে অনুসরণ করলে লাভবান হবে।’

 

###২৯-১১-২০১৬

"