কলকাতায় বাংলাদেশি গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ

জামাই ফারুকের কাছ থেকে জঙ্গি কর্মকান্ডের তথ্য মেলেনি

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

কলকাতা প্রতিনিধি
ADVERTISEMENT

বাংলাদেশের পুলিশ ও গোয়েন্দাদের দুটি দল দুদফায় কলকাতায় এসে আনোয়ার হোসেন ফারুক ওরফে জামাই ফারুকের সঙ্গে কথা বলেছেন। জঙ্গি কার্যকলাপের বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য তার কাছ থেকে পাননি বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। এ তথ্য জানিয়েছেন কলকাতা পুলিশ ও ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)।

জামাই ফারুক বাংলাদেশের মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ফারুককে গত ২৫ সেপ্টেম্বর উত্তর ২৪ পরগনা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

লালবাজারের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) ও এনআইএ সূত্রের খবর, গত সপ্তাহে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) তিনজন সদস্য প্রথমে কলকাতা আসেন। তার পরে আসে র‌্যাবের একটি দল। জামাই ফারুক কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে ছিল। বাংলাদেশের গোয়েন্দারা যাতে তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন, সেই জন্য ফারুককে নিজেদের হেফাজতে নিতে আদালতে আবেদন জানায় এসটিএফ। কলকাতার ব্যাঙ্কশাল কোর্টের বিচারক সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজারে ফারুকের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশের পুলিশ ও গোয়েন্দারা।

এনআইএর এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশের পুলিশ অফিসাররা দুভাগে ভাগ হয়ে এসে কলকাতা পুলিশের হেফাজতে থাকা আনোয়ার হোসেন ফারুকের সঙ্গে কথা বলে গেছেন। তবে ফারুকের সঙ্গে কথা বলে তারা তেমন চাঞ্চল্যকর বা জরুরি তথ্য পেয়েছেন বলে জানা নেই।’

ফারুককে গ্রেফতার করার পর পরই এসটিএফ জেনেছিল, বাংলাদেশের আরেক জেএমবি নেতা আসাদুল ইসলাম ওরফে আরিফকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে খুলনা জেল থেকে বের করে আনার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ওই পরিকল্পনা কার্যকর করার আগেই ফারুক ধরা পড়ে যায়। গত ১৬ অক্টোবর খুলনা জেলে ফাঁসি হয় আরিফের।

গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর জেএমবির বহু জঙ্গি এখন বাংলাদেশের জেলগুলোতে বন্দি। তাদের মধ্যে এভাবে কাউকে ছাড়ানোর পরিকল্পনা আছে কি না, থাকলে তারা কারা এবং বাংলাদেশে জেএমবির আর কী কী নাশকতার পরিকল্পনা আছে, সেই ব্যাপারে ফারুকের সঙ্গে কথা বলে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করেছিল বাংলাদেশ পুলিশ। তবে সেই চেষ্টা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি বলেই এসটিএফ ও এনআইএ সূত্রের খবর।

গত ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর জামাই ফারুকসহ ছজন জেএমবি জঙ্গি এসটিএফের হাতে ধরা পড়ে কলকাতা পুলিশের হাতে। জামাই ফারুক বাদে বাকি পাঁচজনের নামই খাগড়াগড় বিস্ফোরণ তথা জেএমবি ষড়যন্ত্র মামলায় আছে। সেজন্য ওই মামলার তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ অক্টোবর মাসে ওই পাঁচজনকে হেফাজতে পেয়েছিল। তাদের মধ্যে জহিদুল ওরফে জবিরুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও রুবেল মিয়া বাংলাদেশের নাগরিক। বাকি দুজন ইউসুফ গাজী ও আবুল কালাম বর্ধমান জেলার বাসিন্দা। এনআইএ হেফাজতে থাকাকালীন, অক্টোবর মাসে এই পাঁচজনের সঙ্গে কথা বলতে আসেন বাংলাদেশের পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তবে সে যাত্রা জামাই ফারুকের সঙ্গে তারা কথা বলতে পারেননি। ফারুক সে সময়ে জেলে ছিল। খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলায় অভিযুক্তদের তালিকায় ফারুকের নাম নেই বলে তাকে এনআইএ হেফাজতে নিতে আবেদন করেনি।

তদন্তে জানা গেছে, ফারুক পশ্চিমবঙ্গে জেএমবির প্রধান ছিল। সেই সঙ্গে জেএমবির সর্বভারতীয় অর্থসচিব ছিল সে। তার পরেও খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার তদন্ত চলাকালীন গোয়েন্দারা তার কথা জানতে পারেননি। ফারুকের সঙ্গে তখন কথা বলতে না পারায় বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের ফের কলকাতায় আসতে হয়। কলকাতা পুলিশের এসটিএফের দাবি, দক্ষিণ ভারত ও দেশের উত্তর-পূর্বে নাশকতা ঘটানোর ষড়যন্ত্র করেছিল ফারুক ও তার সঙ্গীরা। সেই মামলা তাদের বিরুদ্ধে রুজু করা হয়েছে। ভারতে জেএমবির নাশকতার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নিয়ে এটাই প্রথম মামলা। খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলায় কিন্তু বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ধারাবাহিক নাশকতা ঘটানোর মাধ্যমে সে দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনা করেছিল জেএমবি এবং সেই প্রস্তুতির জন্য তারা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের মাটিকে ব্যবহার করেছিল। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত তাদের আক্রমণের লক্ষ্য, এমন কথা খাগড়াগড় মামলার চার্জশিটে বলা হয়নি, যেটা বলা হয়েছে ফারুকের বিরুদ্ধে এসটিএফের রুজু করা মামলায়।

কিন্তু ফারুক কি সত্যিই খাগড়াগড় মামলায় অভিযুক্ত নয়?

এনআইএর ডিএসপি পদমর্যাদার এক অফিসার বলেন, ‘অবশ্যই অভিযুক্ত। কিন্তু ওর বিরুদ্ধে অকাট্য কোনো প্রমাণ এখনো আমরা হাতে পাইনি। খাগড়াগড় মামলার অভিযুক্ত হিসেবে আমরা ফারুককে নিশ্চয়ই হেফাজতে নেব। তবে তার আগে বাকি পাঁচজনের কেউ এ ব্যাপারে বিচারকের কাছে গোপন জবানবন্দি দেবে। সে ক্ষেত্রে ফারুককে শুধু হেফাজতে পাওয়া নয়, খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলায় ওর বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়াও সহজ হবে।’ কলকাতা নগর দায়রা আদালতের মুখ্য বিচারকের এজলাসে খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ আপাতত স্থগিত। ফারুকসহ ছজনের বিরুদ্ধে চার্জগঠনের পর ফের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবে।

"