নাসিক নির্বাচন

মুখে ঐক্য, ভেতরে বিভক্তি

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি
ADVERTISEMENT

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে দলীয় ঐক্য নিয়ে বেশ বিপদে রয়েছেন মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী আওয়ামী লীগের ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও বিএনপির অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। মুখে ঐক্যের কথা বললেও দুই দলের দুই প্রার্থী কেউ-ই এখন পর্যন্ত মাঠে নামাতে পারেননি দুই দলের স্থানীয় নেতাদের। পুরনো বিভক্তিকে কেন্দ্র করে দুই প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষের পন্থিদের মধ্যে ক্ষোভ-অভিমান অব্যাহত রয়েছে।

এই দুই প্রার্থীর মধ্যে আইভীর পক্ষে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সব পক্ষকে এক হয়ে কাজ করার জন্য দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতাদের ঢাকায় ডেকে নির্দেশ দেন। বিশেষ নির্দেশ দেন স্থানীয় এমপি শামীম ওসমানকে। কিন্তু প্রকাশ্য বিরোধ প্রশমিত হলেও বিভক্তি রেখা মোছেনি। অনুরূপ দশা বিএনপিতেও। অনেকটা হঠাৎ করেই স্বল্প পরিচিত সাখাওয়াতকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়ায় স্থানীয় নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তাকে।

তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই মুখর হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি। নানা হিসাব-নিকাশ ও আলোচনা চলছে দুই দলের বাইরে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও। দুই প্রার্থী নিজেদের মতো করে এখন পর্যন্ত দল গোছানোয় ব্যস্ত। ঘন ঘন সভা করছেন ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে। পরামর্শ নিচ্ছেন। বিভিন্ন সভা-সেমিনারেও অংশ নিচ্ছেন। গতকাল নারায়ণগঞ্জে খোঁজখবর নিয়ে এবং আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য অনুযায়ী নির্বাচনের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

আওয়ামী লীগে নতুন সংকট : আমাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরও স্থানীয় আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করা যাচ্ছে না। নেতাদের বিভক্তিতে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। বিশেষ করে হঠাৎ করেই শামীম ওসমানের রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা নতুন সংকট সৃষ্টি করেছে দলে। এক ধরনের হতাশা দেখা দিয়েছে শামীম ওসমানপন্থী নেতাকর্মীদের মধ্যে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এ অবস্থা চলতে থাকলে বিএনপি সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে নগরের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে নাসিক নির্বাচনে।

দলীয় সূত্র জানায়, নাসিক নির্বাচনে শামীম ওসমান ও আইভীকে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু সে নির্দেশের পরও গত রোববার আইভী ‘শামীম ওসমান নির্বাচনে থাকলে ভালো, না থাকলে আরো ভালো’Ñ এমন ধরনের মন্তব্য করেন। এ মন্তব্যের জের ধরে আবারো দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আইভী ও শামীম ওসমান। এরই জের ধরে গতকাল জেলা পার্টি অফিসসংলগ্ন একটি ভবনে শামীম ওসমান তার সমর্থক নেতাকর্মীদের সামনে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকেও অবহিত করেন। ওবায়দুল কাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে এ বিষয়ে অবহিত করা হবে আশ্বাস দেন। এ নিয়ে দলের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

বিএনপিতে পেছনের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট : তৈমূর আলম খন্দকারকে শেষ পর্যন্ত রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি মেয়র পদে সাখাওয়াতকে মনোনয়ন দেওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মী-সমর্থকরা কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। ২০১১ সালে নাসিকের প্রথম নির্বাচনে মেয়রের প্রতিযোগিতা থেকে ভোটের আগের রাতে ‘দলীয় সিদ্ধান্তে’ সরে যেতে হয় তৈমূরকে। সে কষ্ট এখনো ভুলতে পারেননি। এমনকি তারপর থেকে রাজনীতির মাঠেও তেমন করে সক্রিয় নন বিএনপির এই প্রভাবশালী নেতা। ফলে সাখাওয়াতের পক্ষে মাঠে সক্রিয় থাকবেন বলে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ঢাকায় কথা দিয়ে গেলেও এখনো সক্রিয় নন বলে দলের স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এ ব্যাপারে তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, নেত্রীকে কথা দিয়েছি, সাখাওয়াতের পক্ষে মাঠে থাকব। সেই কথা রাখব। দলের একজন ঈমানদার কর্মী হিসেবে ধানের শীষের বিজয়ের জন্য যা যা করা দরকার সব করব। নারায়ণগঞ্জে বিএনপির ঝা-া আমার হাতে। দল আমার সঙ্গে কী আচরণ করেছে বা করেনি, সেসব এখন আর মনে করতে চাই না।

স্থানীয় বিএনপি যে এখনো ঐক্যবদ্ধ নয়Ñ গত সোমবার জেলা বিএনপির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী মতবিনিময় সভায় সে ইঙ্গিত দেন প্রার্থী সাখাওয়াত নিজে। তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমার ওপর অনেকের ক্ষোভ-অভিমান থাকতে পারে। কিন্তু দলের স্বার্থে ও খালেদা জিয়ার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সবার উচিত ধানের শীষের পক্ষে কাজ করা। এখানে বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে নির্বাচনে জিততে হবে।

একইভাবে তৈমূর আলমের বিপক্ষের অংশকে নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাখাওয়াত। দলীয় সূত্র জানায়, তৈমূর আলম সাখাওয়াতের পক্ষে অবস্থান নিলে তৈমূরবিরোধী অংশ নির্বাচনী মাঠে না-ও থাকতে পারেন। কারণ মেয়র পদে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার আগে তৈমূর আলমের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম বক্তব্য নিয়েও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, তৈমূর আলম দলকেও বিভ্রান্ত করেছেন। কারণ তিনি নিজে গণমাধ্যম ও দলকে একাধিকবার বলেছেন, তার নির্বাচনে আগ্রহ নেই, তবে দল মনোনয়ন দিলে তিনি নির্বাচন করবেন। কিন্তু দল মনোনয়ন দিলেও তিনি তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। তার এই ভূমিকার কারণে অন্য কেউ মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি নিতে পারেননি।

"