রোহিঙ্গা নারী জরিনার আর্তি

‘আমাদের দেশ কোনটা তা আল্লাহ জানে’

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

শরীফুল রুকন ও দীপক শর্মা দীপু কক্সবাজার
ADVERTISEMENT

গত ২৬ নভেম্বর শনিবার ভোরে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছেন জরিনা খাতুন (৬০)। উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। মিয়ানমারের মংডু জামবুনিয়া রাঙ্গাবালি গ্রামের বাসিন্দা তিনি। সেখানে সেনাবাহিনীর নির্যাতনে স্বামী ও ছেলে হারিয়েছেন। পরে তিন নাতিনকে নিয়ে কোনো রকমে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। সেই তিন নাতনিকে জড়িয়ে ধরে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘যে দেশে আমাদের নাগরিক মনে করা তো দূরের কথা, মানুষই মনে করে না, সেই দেশ কোনো সভ্য মানুষের হতে পারে না। এটা জুলুম-নির্যাতনের অমানুষের দেশ। তবে আমাদের দেশ কোনটা তা আল্লাহ জানে।’ জরিনা খাতুন বলেন, ‘মোরে এ পাড়ত মারি ফেলা, মুই তিনগোয়া গুরা নাতিনর জীবন লই এই পাড়ত আইসসি পরাণ বাঁচাইবার লাই। অহন বর্মা পাড়ত আঁরারে পাড়াইলে আঁরেসহ গুরা তিন পোয়ারে মারি ফালাইবো। ঐ পাড়ত মরনোরতুন এই পাড়ত মরণ ভালা অইবো। ঐ পাড় দোজখ। তিন নাতিনসহ মোরে এই পাড়ত জিঁয়াতা গারি ফালা।’

এই কথার অর্থ হচ্ছে ‘আমাকে এই পাড়ে মেরে ফেলুন, আমি তিন শিশু নাতি-নাতনির জীবন নিয়ে এ পাড়ে (বাংলাদেশে) প্রাণ বাঁচাতে এসেছি। এখন ওই মিয়ানমারের পাড়ে ঠেলে দিলে আমাকেসহ তিন শিশুকে মেরে ফেলবে। ওই পাড়ে মরার চেয়ে এই পাড়ে মরে যাওয়া ভালো হবে। ওই দেশ দোজখের দেশ। ওই পাড়ে না পাঠিয়ে তিন নাতিসহ আমাকে জীবন্ত কবর দিন এই পাড়ে।’

কেন বাংলাদেশে এসেছেন, এখানে আসা তো অবৈধ, এটা আপনার দেশ নয়, এখান থেকে তাড়িয়ে দিলে কী করবেনÑএসব প্রশ্ন রাখতেই মিয়ানমার থেকে আসা বৃদ্ধা জরিনা খাতুন (৬০) এভাবেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেন।

জরিনা খাতুন জানান, মিয়ানমারের সেনাসদস্যরা রাতের আঁধারে অতর্কিতভাবে তাদের গ্রামে হামলা চালায়, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। এ সময় প্রাণ বাঁচাতে কে কোথায় গেছে তার জানা নেই। তবে নূর ফাতেমা (৭), সাহেনা (৬) ও হাসিনা এই তিন নাতিনকে নিয়ে পাশের জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে জীবন রক্ষা করে। পরে ঝিমংখালী সীমান্ত পথ ধরে আরো ৭-৮ জনের সঙ্গে কোনো রকমে এপারে আসে। তার কাছ থেকে জানা যায়, তার ৪ ছেলে মোহাম্মদ শাহ আলম (২৭), নূর সালাম (১৫), হামিদ হোসেন (১২), আমান উল্লাহ (৩৯) ও স্বামী জসিম উদ্দিন কোথায় তা সে জানেন না। বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে, তাও জানে না। পুরো পরিবার তছনছ হয়ে গেছে।

তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, ‘এখন এ তিন শিশু নাতিনকে নিয়ে কোথায় যাব, কী করব জানি না। আল্লাহর ওপর আমাদের জীবন ছেড়ে দিয়েছি।’

এদিকে নিজ দেশের শাসকের অমানবিক নির্যাতনে টিকতে না পেরে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। নাফ নদীতে রোহিঙ্গাবোঝাই অনেক নৌকা বিজিবির সতর্ক পাহারার কারণে প্রবেশ করতে পারছে না। নাফ নদীর উভয় পারের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের কান্নায়। উভয় সংকটে পড়ে বেঁচে থাকা রোহিঙ্গারা এখনো জানে না, তাদের কপালের ভাগ্য লেখনে আর কী কী লেখা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত অক্টোবরে মিয়ানমারের এক পুলিশ চেকপোস্টে অতর্কিত হামলায় ৯ পুলিশ নিহতের পর রাখাইন ও মংডু প্রদেশে সেনা-পুলিশের অভিযান শুরু হয়। প্রায় দুই মাস ধরে চলা ওই অভিযানে রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা, মহিলা ও কিশোরীদের ধর্ষণ, তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে।

ইতোমধ্যে উনছিপ্রু, ওয়াব্রাং, লেদা, জাদিমুরা ও উখিয়ার বালুখালী ও তমব্রু সীমান্তবর্তী পয়েন্ট দিয়ে বেশ কিছু রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। তারা এ দুই উপজেলার পাহাড়-জঙ্গলসহ বিভিন্ন স্থানে আগে থেকেই বসবাসরত রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। কেউ কেউ টেকনাফের লেদা ও উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে ঢুকে পড়ছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কতজন এভাবে প্রবেশ করেছে, তা নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারছে না।

এদিকে পুলিশ জানতে পেরেছে, টেকনাফ এবং উখিয়ার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থানকারী ৪০ জন দালালের সহযোগিতায় রোহিঙ্গারা অবাধে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এর মধ্যে ২৫ বাংলাদেশি আর বাকিরা মিয়ানমারের নাগরিক। মিয়ানমার সীমান্তে প্রতিজন রোহিঙ্গার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ সীমান্তে ১ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে এসব দালাল।

 

"