আকাশপথে প্রতিদিন আসছে ৪০ কেজি চোরাই সোনা

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক
ADVERTISEMENT

বিশ্বের চারটি দেশ থেকে প্রতিদিনই আকাশপথে বৈধ ও অবৈধ উভয় পথেই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ আসছে। তবে বৈধভাবেই প্রতিদিন গড়ে ৪০ কেজিরও বেশি স্বর্ণ ঢুকছে। আর কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই দিয়েই যাচ্ছে ওই স্বর্ণ। আইনি মারপ্যাঁচে তা আটকানো যাচ্ছে না। আর অবৈধভাবে আসা স্বর্ণ চালানও মাঝে মধ্যে ধরা পড়ছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে যে পরিমাণ স্বর্ণ ধরা পড়ছে অবৈধভাবে তার চেয়ে বেশি আসছে। এই পরিস্থিতিতে শুল্কমুক্ত স্বর্ণ আনার বিদ্যমান আইনের সংশোধন আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। আগামী বাজেট অধিবেশনে চোরাচালান বন্ধে শুল্কমুক্ত স্বর্ণ বহনের আইনটি সংশোধনের প্রস্তাবনা সংসদে উত্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হবে। এনবিআর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা শুল্কমুক্তভাবে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত স্বর্ণ বহন করতে পারেন। ওই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শুধমাত্রু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই প্রতিদিন চারটি দেশ থেকে ৪০ কেজিরও বেশি স্বর্ণ আসছে দেশে। কিন্তু আইনসম্মত হওয়ায় চোখের সামনে ওসব ঘটলেও কর্তৃপক্ষের কিছু করার নেই। সেই জন্য বিদ্যমান আইনে সংশোধন আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। আর আগামী বাজেট অধিবেশনেই ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।

সূত্র জানায়, কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে প্রতিদিন সিঙ্গাপুর থেকে ৪টি, মালয়েশিয়া থেকে ৪টি, দুবাই থেকে ৫টি এবং সৌদি আরব থেকে ৩টি ফ্লাইট ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রতিটি ফ্লাইটে যাত্রী থাকে ৪০০ জন। কিন্তু সিঙ্গাপুর থেকে আসা ফ্লাইটগুলোর যাত্রীদের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশের (৪০ জন) কাছেই প্যাকেটে ১০০ গ্রাম করে মোট ৪ কেজি স্বর্ণ থাকে। অর্থাৎ প্রতিদিন সিঙ্গাপুর থেকেই আসা ৪টি ফ্লাইটের যাত্রীদের মাধ্যমে দেশে স্বর্ণ প্রবেশ করে ১৬ কেজি (১ হাজার ৩৭১ দশমিক ৬৮ ভরি)। ওই ১৬ কেজি স্বর্ণের বাজারমূল্য ৬ কোটি ২৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। একই কায়দায় মালয়েশিয়া থেকে আসা বিমানের ৭ শতাংশ (২৮ জন) যাত্রীর মাধ্যমে আসছে ২ কেজি ৮০০ গ্রাম স্বর্ণ। তাছাড়া মালয়েশিয়া থেকে ৪টি বিমানে করে স্বর্ণ আসছে গড়ে প্রায় ৮ কেজি (৬৮৭ দশমিক ২১ ভরি)। যার আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা। দুবাই থেকে আসা বিমানের মোট যাত্রীর মধ্যে ৫ শতাংশের (২০ জন) হাত দিয়ে বৈধ পন্থায়ই স্বর্ণ আসছে ২ কেজি। দুবাই থেকে প্রতিদিন শুধুমাত্র শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই অন্তত ৫টি ফ্লাইট অবতরণ করে। ওসব ফ্লাইট থেকে প্রতিদিন ১০ কেজি (৮৫৭ দশমিক ৩ ভরি) স্বর্ণ দেশে প্রবেশ করে। যার আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৯৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। আর সৌদি আরব থেকে আসা বিমানের মোট যাত্রীর মধ্যে ৫ ভাগ (২০ জন) যাত্রীর কাছে দুই কেজি স্বর্ণ পাওয়া যায়। রাজধানীর বিমানবন্দরে প্রতিদিন দেশটি থেকে আসা ফ্লাইট অবতরণ করছে অন্তত তিনটি। ওসব ফ্লাইট দিয়ে প্রতিদিন দেশে স্বর্ণ ঢুকছে ৬। কেজি (৫১৪ দশমিক ৩৮ ভরি)। যার আনুমানিক মূল্য ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

সূত্র আরো জানায়, স্বর্ণ চোরাচালানে দুটি চক্র জড়িত থাকে। একটি চক্র বিদেশ থেকে প্যাকেটভর্তি ১০০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ বিমানের যাত্রীদের হাতে দিয়ে দেয়। আরেকটি চক্র শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরেই অপেক্ষা করে। চুক্তি অনুযায়ী ১০০ গ্রাম স্বর্ণের প্যাকেটটি ওই চক্রের সদস্যরাই সংগ্রহ করে। প্রতিটি ১০০ গ্রা ওজনের স্বর্ণ বহনের জন্য যাত্রীদের দেয়া হয় ১০ হাজার টাকা করে। আগে চোরাচালানিরা দেশে বড় বড় চালানে অবৈধ স্বর্ণ আনতো। কিন্তু সম্প্রতি তারা ওই কৌশল বদলে অল্প অল্প পরিমাণে অনেক যাত্রীর হাতে ওই স্বর্ণ পাচার করছে। যা দেখেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। সেজন্য আগামী বাজেটে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের ১০০ গ্রাম স্বর্ণ শুল্কমুক্তভাবে আনার আইনটি সংশোধনের প্রস্তাবনা দেয়া হবে।

এদিকে গতবছর প্রতি মাসেই ৫-৭টি স্বর্ণের অবৈধ চালান জব্দ হয়েছে। কিন্তু চলতি বছর চোরাকারবারিদের নতুন কৌশলের ফলে তা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে মাত্র দু-একটি উল্লেখযোগ্য স্বর্ণের চালান জব্দ হয়েছে। গত ১ নভেম্বর রাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো ফ্লাইট এসকিউ-৪৪৬ অবতরণ করলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালিয়ে ১৪ কেজি স্বর্ণ জব্দ করে ঢাকা কাস্টম হাউজের প্রিভেনটিভ টিম। তার আগে ২ ফেব্রুয়ারি দোহা থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করা বাংলাদেশ বিমানের (বিজি ০২৬) ফ্লাইটে অভিযান চালিয়ে বিমানের সিটের নিচ থেকে ৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (শুল্ক) সেকেন্ড সেক্রেটারি ও শুল্ক অধিদপ্তরের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহাম্মাদ সাফিউর রহমান জানান, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চালানে স্বর্ণ আনার বিষয়টি লক্ষ করা হচ্ছে। কিন্তু আইন অনুযায়ী বৈধ হওয়ায় কিছু করার নেই। সরকার যদি আইন সংশোধন করে নির্দেশনা দেয় াহলে অবশ্য ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।

 

 

"