বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা বাধা

কঠিন সমস্যার মুখোমুখি মেয়র নাছির

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর চট্টগ্রাম ব্যুরো
ADVERTISEMENT

মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ আ জ ম নাছিরের বেশি দিন হয়নি। এরই মধ্যে নানামুখী জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাকে। সিটি কর্পোরেশনের লোকসান কমাতে গিয়ে একদিকে তোপের মুখে পড়ছেন। অন্যদিকে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে সিটি কর্পোরেশনের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

বিগত সময় যেসব প্রতিষ্ঠানে মেয়র ছিলেন সর্বসের্বা, সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে এখন মেয়র নাছিরের নাম মুছে ফেলার চেষ্ঠা চলছে। একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে আদালতে সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির মুখোমুখি। সেই সঙ্গে জাতিসংঘ পার্কের উন্নয়ন, ডোর টু ডোর ময়লা আবর্জনা সংগ্রহসহ উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু প্রকল্পের কাজে নানা বাধাঁ এসেছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের জন্য বরাদ্দের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের কমিশন বাণিজ্যের ব্যাপারে মুখ খোলায় তার উপর চেপেছে নতুন ঝামেলা।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিপুল পরিমাণ ব্যয় হয় কর্পোরেশনের। দীর্ঘদিন ধরে আওতাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বেতন ভাতা তেমন বাড়ানো হয়নি। বর্তমান মেয়র ক্ষমতা গ্রহণের পর বর্ধিত বেতন ও ফি বাড়ানো হলে তা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নামেন অভিভাবকরা। অন্যদিকে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা প্রশ্নে চসিকের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর আইনী লড়াই শেষ হচ্ছে না বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের সঙ্গে।

জানা গেছে, ২০০২ সালে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। নগরীর প্রবর্তক মোড়, দামপাড়া ও কেসিদে রোডের সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়টির তিনটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ২০১০ সালের ১৮ জুন মেয়র নির্বাচনে জেতার পর মোহাম্মদ মনজুর আলম হন ট্রাষ্টি বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান। তবে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা আইন অনুযায়ী, মনজুর আলম ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেও পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। অথচ আইন অনুযায়ী সদ্য সাবেক মেয়র হিসেবে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর শুধুমাত্র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে থাকার কথা। পরবর্তী সময় নগরীর জিইসি মোড়ে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের নামে আরো ৬২ কাঠা জমি কেনা হয়, কাজটির তদারকি করেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। পরবর্তীতে এ জমিটি কেনার সময় মহিউদ্দিন চৌধুরী ও তৎকালীন মেয়র মনজুর আলম ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে একটি অভিযোগ করে দুদক। এদিকে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়কে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা বিধি অনুযায়ী ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের জন্য চিঠি দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বিধি অনুযায়ী ট্রাষ্টি বোর্ড গঠন করবেন বলে ঘোষণা দেন মেয়র। আ জ ম নাছির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরপরই প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা কার তা জানার চেষ্টা করেন। তিনি দেখতে পান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে কোনো তথ্যই সিটি করপোরেশনে নেই। এমনকি সিটি করপোরেশনের পরিচালিত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকাতেও নেই প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। তখন মেয়র আ জ ম নাছির প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাষ্টি বোর্ড ঢেলে সাজানো ও প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম সিটি করপোরেশনের অধীনে আনার উদ্যোগ নেন। কিন্ত আইনী লড়াই শুরু হলে শেষপর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠান নিয়ে শুরু হয় কর্পোরেশন ও মেয়র মহিউদ্দিনের টানাহেচড়া। যা এখনও অব্যাহত আছে। আদালতে উভয় পক্ষ সমানভাবে লড়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতায় থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্ধিত বেতন ফি কমানোর দাবিতে আন্দোলনে নামেন অভিভাবকরা। গত বছর জুনে ১৯টি কলেজের বেতন বৃদ্ধির পর নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে চসিক পরিচালিত ৪৬টি মাধ্যমিক স্কুলে শতভাগ বেতন বৃদ্ধি করা হয়। বর্ধিত এ বেতন ফি বাতিলের দাবিতে মেয়রকে স্মারকলিপি, সংবাদ সম্মেলন, সংহতি সমাবেশ ও মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্ঠা চালাচ্ছেন তারা।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের শিক্ষা বিভাগের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানায়, আ জ ম নাছির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে চসিকের স্কুলগুলো বন্ধের কথা বলেছিলেন। দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি শিক্ষা খাতে ভর্তুকির পরিমাণ কমিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া বর্তমান যুগের চাহিদা বিবেচনায় একজন জুনিয়র শিক্ষককে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা না দিলে ভাল শিক্ষকও পাওয়া যায় না। সার্বিক বিবেচনায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা চসিকের শিক্ষা বিভাগে গতি আনতে বেতন ফি বাড়ানো হয়েছে। এতে সুশিক্ষা নিশ্চিত ও শিক্ষা খাতে চসিকের ভর্তুকির পরিমাণটা কমে আসবে। তিনি আরো জানান, এমনিতেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের উপর পড়ে না। এরপরও সিটি কপোরেশন সেটা করেই যাচ্ছে। অভিভাবককের কেউ কেউ অনেকটা বিনামূল্যে সন্তানদের পড়াতে চাচ্ছেন। কোটি কোটি টাকার বিশাল ভর্তুকির বোঝা টানতে গিয়ে একটা সময় সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। তখন অধিক মুনাফা লোভী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোই লাভবান হবে।

চট্টগ্রামের পাচঁলাইশের জাতিসংঘ পার্কটি ৫০ বছর আগে সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করে গণপূর্ত বিভাগ। হস্তান্তরের পর থেকে এটি সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি। এখানে নির্মাণ করা হয় সুইমিং পুলসহ পার্ক। কিন্ত অপরিকল্পিভাবে নির্মাণ করার কারণে সুইমিং পুলে কেউ যান না। এখানে গভীরতা ৯ ফুট। তাই সুইমিং পুলটি সাতাঁর শেখার পরিবর্তে মৃত্যু ঝুঁকির কারণ হয়ে দাড়াঁয়। তাছাড়া পার্কটিতে রাতভর চলে নানা অপকর্ম। এর থেকে উত্তোরনের জন্য মেয়র উদ্যোগ নিলে নানা বাঁধা আসতে থাকে। পরিকল্পিতভাবে এ পার্কটির উন্নয়ন জরুরী হলেও নানা বাঁধায় কাজে হাত দিতে পারছেন না মেয়র।

নগরীকে ময়লা-আর্বজনা মুক্ত করার লক্ষে ডোর টু ডোর কর্মসূচি হাতে নিলেও কাঙ্খিত সহায়তা পাচ্ছেন না মেয়র। এ প্রকল্পের জন্য চট্টগ্রামের বেশ কিছু শিল্পপতি বা গ্রুপ এগিয়ে এলেও তা অপ্রতুল। চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা তাকে সহযোগিতা করার ঘোষণা দিয়েও রহস্যজনক কারণে পিছিয়ে যায়। ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা মেয়রকে বলেছেন, তারা ঢাকা থেকে সাড়া পাচ্ছেন না।

চট্টগ্রামের জন্য গত বছর সরকারের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ৯০০ কোটি টাকা। অথচ বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ৮০ কোটি টাকা। অনেকদিন পর এ বরাদ্দ নিয়ে মুখ খুলতে গিয়ে বিপাকে পড়েন মেয়র। পাজেরো জিপ আর ৫ শতাংশ কমিশন দিলে বরাদ্দ সাড়ে ৩শ থেকে ৫শ কোটি টাকা পাওয়া যেতো বলে মন্তব্য করে বিপাকে পড়েন মেয়র। তার কথার জবাব ও প্রমাণ ৭ দিনের মধ্যে দিতে বলেছে মন্ত্রণালয়।

তারপরও মেয়র হতাশ নন। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামবাসী আমাকে সেবার জন্য মেয়রের চেয়ারে বসিয়েছে। ভালো কাজ করতে গেলে নানা বাধা আসবে। এটা আমি জানি। সব বাধা অতিক্রম করে চট্টগ্রামের কাঙ্খিত উন্নয়নে এগিয়ে যাবো।’

"