‘জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে’ শিক্ষার এমন নমুনা!

নাটোর সরকারি বালক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে শতাধিক ভুল

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

নাটোর প্রতিনিধি
ADVERTISEMENT

জেলার ‘শ্রেষ্ঠ বিদাপীঠ’ হিসেবে দাবি করা হয় নাটোর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়কে। কিন্তু সেই শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের প্রশ্নপত্রে দেখা গেছে অন্তহীন ভুল। ভুলে ভরা প্রশ্নে নেওয়া হচ্ছে ছাত্রদের বার্ষিক পরীক্ষা। তাও একেবারে নিচের ক্লাসে! এমনকি এক প্রশ্নে বিদ্যালয়ের নামই লেখা হয়নি। অন্য প্রশ্নে যদিও নাম লেখা হয়েছে, তাতে খোদ বিদ্যালয়ের নামের বানান ভুল। অথচ রীতিমতো ভর্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সন্তানদের এই স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন অভিভাবকরা। এমন ভুলে ভরা প্রশ্নে বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়ায় এখন সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় হতাশ হয়ে পড়েছেন তারা। গত সোমবার স্কুলের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির গণিত পরীক্ষায় এই ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রদের পরীক্ষার হলেই মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে, সব ছাত্রকেই এই ২৪ নম্বর দিয়ে দেওয়া হবে!

গত সোমবার বিকেলে স্কুলে অন্যান্য ক্লাসের সাথে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রদের ১০০ নম্বরের গণিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। অথচ এই প্রশ্নেপত্র শুরুতেই দেওয়া হয়নি স্কুলের নাম। এক থেকে ২৪ নম্বরের ২৪টি নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের প্রায় সব লেখাই ছিল ভুল। এর মধ্যে ১৫ নম্বর প্রশ্নে ভুলভাবে প্রশ্ন উল্লেখ থাকলেও দেওয়া ছিল না নৈর্ব্যক্তিকে চারটি অপশন। অপরদিকে ১৬ নম্বরের উত্তরে চারটি অপশন দেওয়া থাকলেও কোনো প্রশ্নই ছিল না।

সৃজনশীল প্রশ্নপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ২ নং সংক্ষিপ্ত (চ) প্রশ্নে হাস্যকরভাবে লেখা হয়েছে ‘২.২ কিলোমিটারে কত লিটার?’, ৩ নম্বর প্রশ্নে ‘রাশেদ সাহেবের’ কাছে থাকা মূল টাকা (৯০০০) না লিখেই স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ের মাঝে টাকা ভাগ করলে কে কত পাবে বলে জানতে চাওয়া হয়েছে। ৪ নং প্রশ্নে পুরোটা ভুল লেখার পরও দেওয়া হয়নি অথবা (বিকল্প) প্রশ্ন। পরে পরীক্ষা কক্ষের বোর্ডে এই অথবা প্রশ্ন লিখে দিলে ছাত্ররা প্রশ্নপত্রে তা লিখে নিয়েছে।

৫, ৬ ও ৭ নং প্রশ্নে বানান ও বাক্যে ভুলের ছড়াছড়ির পর ৭ নং প্রশ্নের অথবায় ওপরের চিত্রটি লক্ষ করে চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হলেও কোনো চিত্র দেওয়া হয়নি। ৮, ৯ এবং ১০ নং প্রশ্নেও অন্য প্রশ্নের মতোই বানান ও বাক্য গঠনে অসংখ্য ভুল রয়েছে। চার পৃষ্ঠার এই প্রশ্ন পত্রে শতাধিক ভুল চিহ্নিত করে অভিভাবকরা নাটোরের সাংবাদিকদের কাছে এসে তাদের হতাশার কথা জানিয়েছেন। তৃতীয় শ্রেণির গণিতের প্রশ্নেও প্রায় একই রকম ভুল দেখা গেছে।

পরীক্ষার নির্ধারিত সময় ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট হলেও ভুলে ভরা প্রশ্নের কারণে ছাত্রদের ১৫ মিনিট সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তার পরও ছাত্ররা ভুলের কারণে বুঝতে না পেরে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এই স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির সমাপনীর চূড়ান্ত মডেল টেস্টের ইংরেজির প্রশ্নে স্কুলের নাম লেখার সময় নাটোর বানানটিও ভুল লেখা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সঞ্জয় শীল ও চতুর্থ শ্রেণির অপর এক ছাত্রের অভিভাবক আমিরুল ইসলাম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আগে জানলে এমন স্কুলে ভর্তির জন্য সন্তানকে নিয়ে ভর্তিযুদ্ধে নামতাম না। আমরা বাড়িতে সন্তানদের যা শিখিয়েছি, স্কুলে গিয়ে মনে হয় তারা সেটাও ভুলে যাচ্ছে।’

স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার একাধিক প্রশ্নপত্রে কিভাবে শত শত ভুল থাকে তা জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাটোর সরকারি বালক বিদ্যালয়ের স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা ভুলের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এটি একটি দুর্ঘটনা। প্রায় একই সাথে বার্ষিক ও ভর্তি পরীক্ষার ব্যস্ততার কারণে চতুর্থ শ্রেণির একটি প্রশ্নপত্র অসাবধানতায় ভুল হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ বিষয়ে অভিভাবকদের সাথে আলোচনা হয়েছে। সব ভুল প্রশ্নের নম্বর ছাত্রদের দিয়ে দেওয়া হবে।’ তবে এতে মেধার সঠিক মূল্যায়ন হবে কি না জানতে চাইলে তিনি এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

নাটোর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুনের জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানে না বলে জানান। তবে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।

এ বিষয়ে নাটোর সিটি কলেজের প্রভাষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘একটি প্রশ্নপত্রে অসংখ্য ভুল মার্জনীয় নয়। বিশেষ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদেও যারা পাঠদান করে থাকেন, তাদের আরো সচেতন হতে হবে। তা না হলে দেশের শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।’

শেরে বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আলী আজগর ভূঁইয়া বলেন, ‘নিয়ম মানলে একটি প্রশ্নপত্রে এতগুলো ভুল হতে পারে না। কারণ শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণে প্রশ্নপত্রের ধারণা ও কৌশল শেখানো হয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষক প্রশ্ন তৈরি করবেন, সেই সঙ্গে সমাধানও তিনিই তৈরি করবেন। যাতে করে প্রশ্নপত্রে ভুল থাকলে সংশোধন করা যায়। এ ছাড়া প্রতিটি স্কুলে মডারেটরি কমিটি থাকার কথা। এই কমিটি প্রশ্নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর সেটা চূড়ান্ত হয়।’ এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম মানা হয়নি বলে তার ধারণা।

নাটোর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও এমকে কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এ ধরনের ভুল কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়।’ তিনি দোষী শিক্ষকদের চিহ্নিত করে তদন্তের ভিত্তিতে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জোর দাবি জানান।

ভুল প্রশ্নপত্র বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাটোর সরকারি বালক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বিষয়টির সত্যতা স্বিকার করে বলেন,

এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

"