ঘূর্ণিঝড় নাডা নয়, শাহিদার কাছে বড় বিপদ এনজিওর ঋণ

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

কক্সবাজার প্রতিনিধি
ADVERTISEMENT

গত ২ নভেম্বর উপকূলে আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় নাডা। সেই আঘাতে তছনছ হয়ে যায় জেলেপতœী শাহিদা আক্তারের সাজানো কষ্টের সংসার। ওই দিন নিখোঁজ হন তার স্বামী লেডু, পরিবারের একমাত্র উপার্জ্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। ঘরে রয়েছে তাদের চার সন্তান। কক্সবাজার শহরের উত্তর কুতুবদিয়া পাড়ায় তাদের বসত বাড়ি। স্বামী হারা সংসারে চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন শাহিদা। অবুঝ চার সন্তানকে নিয়ে কিভাবে পাড়ি দেবেন এই জীবন তরী। এই চিন্তা কেড়ে নিয়েছে তার রাতের ঘুম। ঠিক এসময় তার ঘরে দেখা দিয়েছে ঘূর্ণিঝড় নাডার চেয়ে আরো বড় বিপদ-এনজিও ঋণের কিস্তি পরিশোধের তাগিদ। মরার ওপর ঘড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে ‘শক্তি সমিতি’ নামক এনজিও’র ঋণ।

জেলেপতœী শাহিদা আক্তার জানেন না তার স্বামী জীবিত আছেন নাকি সাগরে সলিল সমাধি ঘটেছে। উপার্জনের একমাত্র পথ হারিয়ে চার সন্তান নিয়ে পথে বসার উপক্রম তার। পাড়া-প্রতিবেশীরা সন্তানদের দু’বেলা খাবার দিতে মাঝে মাঝে কিছু চাল দেয়। সেই চাল সেদ্ধ করে অবুঝ শিশুদের মুখে তুলে দেন তিনি। পেটের ক্ষুধা ভুলে থাকতে শিশুদের বাইরে খেলতে পাঠান মা। এতে দু:খ বাড়ে শাহিদার। এর ওপর চলে দিনরাত শুধু এনজিও কর্মীদের লাঞ্ছনা।

প্রতিবেশীরা জানায়, ‘এনজিও’র কিস্তির টাকা জোগাড় করতে কি করেননি শাহিদা? সন্তানদের জন্য প্রতিবেশীদের দেয়া খয়রাতের চাল বিক্রি করে পরিশোধ করেছেন কিস্তির টাকা। কিস্তির বাকী টাকা পরিশোধ করতে চাপ দিয়ে যাচ্ছে জিহাদ নামে এনজিও অফিসার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানসিক নির্যাতন চলছে তার ওপর। বাড়ির হাঁস, মুরগী, গরু, ছাগল বিক্রি করেও শোধ হয়নি কিস্তির টাকা। শাহিদা বলেন, ‘তার ঘুমহীন রাত কাটে ঋণের চিন্তায়। আর ভোর হলেই দরজায় কড়া নাড়ে এনজিও’র স্যার আর আপা।’ প্রতিটি ভোরে এই ‘আপা আর স্যার’ তার কাছে দেখা দেয় যন্ত্রণার নতুন বার্তা হয়ে। যেন সাক্ষাৎ যমদূত। সন্তানদের উপোস আর ঋণের কিস্তি, এই দুইয়ের ভার আর সইতে পারছেন না একজন মা শাহিদা। সন্তানদের ক্ষুধার চেয়ে বড় চিন্তা ‘কিভাবে ঋণের অর্থ পরিশোধ করা যায়।’

গত সোমবার শাহিদার বাড়িতে গিয়ে তার দেখা মিললো এ প্রতিবেদকের। সন্তানরা কোথায় জানতে চাইতেই বললো, খেলতে গেছে। এই বলেই সে দৌঁড়ে গিয়ে সন্তানদের নিয়ে আসেন। জানতে চায়, কোনো সুযোগ সুবিধা আছে কিনা। স্বামীর প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করতেই জানালো এখনো পর্যন্ত তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এনজিও’র ঋণের প্রসঙ্গ আসতেই বললো, চলতি বছরেই শক্তি সমিতি থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন তিনি। প্রতি সপ্তাহে ৪২৫ টাকা করে ৪৫ কিস্তিতে সেই টাকা পরিশোধ করার কথা। স্বামী সাগরে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তাদের চিন্তার শেষ নেই। কীভাবে সেই টাকা পরিশোধ করবেন সেই চিন্তায় হিমসিম খাচ্ছেন। প্রতিদিন শক্তি সমিতির অফিসাররা চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। সন্তানদের নিয়ে এখন কি করবেন, কোনো কুলকিনারা পাচ্ছেন না বলে জানান শাহিদা।

এদিকে, সাংবাদিকদের উত্তর কুতুবদিয়া পাড়ায় যাওয়ার খবর পেয়ে আবার এলাকাটিতে যান শক্তি সমিতি নামক এনজিও’র কর্মীরা। তাদের এক পুরুষ ও একজন নারী কর্মী। সেখানে গিয়েই শাহিদার উপর কিস্তির টাকা পরিশোধে চাপ দিতে থাকেন। এই প্রতিবেদক এনজিও কর্মীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা কথা বলতে রাজী হননি। উল্টো শাহিদাকে বলতে থাকেন, ‘আমরা টাকা সাংবাদিকদের দেইনি। তোমাকে দিয়েছি। তুমিই আমাদের টাকা ফেরত দিবে।’

শুধু শাহিদাই নয়, উপকূলের বহু নারীই এখন এনজিও’র কিস্তির ঋণের জালে বন্দি। এনজিও নামক এই মহাজনি সংগঠনের যাঁতাকলে পড়ে তাদের জীবন অতীষ্ঠ বলে জানান শাহিদা।

উল্লেখ্য, গত ২ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় নাড়ার কবলে পড়ে ৫ টি মাছ ট্রলারসহ ৭৬ জন নিঁখোজ হন। পরে কিছু জেলেদের জীবিত উদ্ধার করা হলেও এখনো ৩৭ জেলে নিঁখোজ রয়েছেন।

"