চলনবিল অঞ্চলে ‘কুমড়া বড়ি’ তৈরির ধুম

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি
ADVERTISEMENT

শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চলনবিলঅঞ্চলের স্বতন্ত্র খাবার ‘কুমড়া বড়ি’ তৈরি ধুম লেগেছে। তবে পাবনার চাটমোহর পৌর শহরে প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার কুমড়া বড়ি বানিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এছাড়াও উপজেলার বেশ কিছুু জায়গায় তৈরি হয় অনন্য স্বাদের এই কুমড়া বড়ি। চাল-কুমড়ার মিশ্রণ থাকায়ই এর নাম হয়েছে ‘কুমড়া-বড়ি’। প্রতিবছর শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কম-বেশী কুমড়া বড়ি তৈরি করতে দেখা যায়।

চলনবিলের দেশি প্রজাতির কৈ, মাগুর, শিং, শৈল, আইড়, গজারসহ বিভিন্ন মাছ রান্নায় কুমড়া বড়ি অতিপ্রিয় অনুষঙ্গ। সুস্বাদু ও মজাদার তরকারির এ উপাদানটি তৈরি করতে অবশ্য বেশ পরিশ্রম করতে হয়। বিশেষ করে বাড়ির গৃহিনীরা এই কাজে পারদর্শী এবং কুমড়া বড়িগুলো মুলত তারাই তৈরি করে থাকেন। আকাশ পরিস্কার থাকলে প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হয় কুমড়া বড়ি দেওয়ার কাজ। মূলত আর্শ্বিন মাস থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত কুমড়া বড়ি দেওয়ার উপযুক্ত সময়। এই কয়েকমাস ওই এলাকায় বড়ি তৈরির ধুম লেগে যায়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে ভেজান ডাল মেশিনে গুঁড়ো করা হয়। সাধারণত পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কাজে সাহায্য করে। বড় গামলা বা বালতিতে এই ডাল গুঁড়োর সঙ্গে পাকা চালকুমড়া, কালোজিরা, গোল মরিচ, এবং আরও কিছু মশলা মিশিয়ে তৈরি করা হয় বড়ি। ভোর থেকে শুরু করে সকাল ৯টার মধ্যে বড়ি দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করতে হয়। পরে তা রোদে শুকানোর জন্য টিনের বা কাঠের পিঁড়িতে সরিষার তেল মাখিয়ে বড়ি করে সাজিয়ে শুকাতে দেওয়া হয়। ৩/৪ দিন কড়া রোদে শুকিয়ে প্রস্তুত করা হয় সুস্বাদু অনন্য স্বাদের কুমড়া-বড়ি। পরে তা বাজারজাত করা হয়।

এ কাজে নারীরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। তবে অনেকে পারিশ্রমিক এর বিনিময়ে প্রতি কেজি ৭ টাকা দরে কুমড়া বড়ি তৈরি করে দেন। একজন নারী গড়ে প্রতিদিন ২০ কেজি ডালের বড়ি দিতে পারেন। এতে করে অনেক নি¤œবিত্ত পরিবার তাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ সহ জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।

চাটমোহর পৌর এলাকার দোলং মহল্লার কুমড়া বড়ি উৎপাদনকারী ঊষা রানী ভৌমিক দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, ‘প্রায় ৫০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। একটা সময় অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে আমাদের। এখন শিল-পাটার বদলে ডালগুলো মেশিন দিয়ে ভাঙানো হওয়ার কারণে বড়ি দিতে পারছি বেশি। শীত মৌসুমে এই বড়ি তৈরী করে সংসারে বাড়তি কিছু আয় করাও সম্ভব হচ্ছে’।

কুমড়া বড়ি বিক্রেতা সুনীল সরকার ও প্রদীপ ভৌমিক দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, ‘আকারভেদে প্রতিটি বুড়ো চাল কুমড়া ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে কিনতে হয়। এছাড়াও ৭৫ টাকা কেজি খেসারী, অ্যাংকর ডাল ৪০ এবং ১০৫ টাকা কেজি দরে মাশকলাই ডাল কিনে কুমড়া বড়ি তৈরী করে থাকি। প্রতি কেজি ডাল থেকে সাড়ে ৭শ’ থেকে ৮শ’ গ্রাম বড়ি তৈরী হয়। বাজারে খেসারী ডালের বড়ি ৯০ থেকে ১০০ টাকা, অ্যাংকর ডালের বড়ি ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং মাসকলাই ডালের বড়ি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে থাকি। তবে অ্যাংকর ও মাসকলাই-এর ডালের বড়ির চাহিদা একটু বেশি থাকে।’

তিনি জানান, ‘শীতকাল জুড়ে বাজারে কুমড়া বড়ির যথেষ্ট চাহিদা থাকে। এলাকার চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা আসেন কুমড়া বড়ি কিনতে। এছাড়া অর্ডার দিয়ে বানালে খরচটা আরো বেশি পড়ে। তবে পাটায় বাটা ডালের বড়ির কদর সবসময় একটু বেশি থাকে।’

শুধু গ্রামাঞ্চলেই নয়, শহরের মানুষও আজকাল কুমড়া বড়ি পছন্দ করতে শুরু করেছে। তাই চাটমোহরের উৎপাদিত কুমড়া বড়ি স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে জেলা শহর হয়ে এখন রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের কাঁচা বাজারগুলোতে স্থান করে নিয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের হাতঘুরে কুমড়া বড়ি এখন প্রবাসী বাঙালীদের রসনা তৃপ্ত করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় অনন্য স্বাদের এই কুমড়া বড়ি বিক্রি করে স্বচ্ছলতা এসেছে অনেক পরিবারে।

 

 

"