ঝুঁকিতে কেনাবেচা হচ্ছে জ্বালানী তেল-এলপি গ্যাস

চোরাই তেলের বাজার রমরমা

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
ADVERTISEMENT

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় দূর্ঘটনার ঝুঁকিতে জ্বালানি তেলের ডিজেল, পেট্টোল ও এলপি গ্যাস কেনা বেচা হচ্ছে। সরকারি লাইসেন্স অনুমোদন ছাড়াই এবং বিধি বিধানের কোন তোয়াক্কা না করেই অবাধে এসব কেনা বেচা চলছে। উপজেলা শহর ছাড়াও প্রত্যন্ত হাট বাজারগুলোয় অত্যন্ত খোলা মেলা পরিবেশে ডিজেল, পেট্টোল বিক্রি হচ্ছে। এমনকি মুদি দোকানে বিক্রি হচ্ছে উচ্চ দাহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন পেট্টোল। অপরদিকে চোরাই তেলের ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। ফলে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় রকমের দূর্ঘটনা।

সরকারি বিধি বিধানে একজন খুচরা বিক্রেতা সর্বোচ্চ এক হাজার লিটার ডিজেল তেল মজুদ রেখে সাধারণ ক্রেতাদের নিকট বিক্রি করতে পারবে। তবে বিক্রেতা দোকান কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবশ্যই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং বিস্ফোরক লাইসেন্স থাকতে হবে। আর পেট্টল বিক্রিতে আরো কঠোর বিধান আছে। এ বিধানে পেট্টল চালিত সরকারি লাইসেন্সধারী বাহনগুলোর মালিক এবং ট্যাংকির কাছেই সরবরাহ করতে হবে। কোন অবস্থায় বোতল কিংবা অন্য কোন পাত্রে পেট্টল কেনা বেচা করা যাবে না। এছাড়া বিক্রি রশিদে ক্রেতার বাহনে লাইসেন্স উল্লেখ থাকতে হবে। সরকারি রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স নেই, এমন বাহনের ক্রেতাদের নিকট পেট্টল বিক্রি করা যাবে না।

অথচ উল্লাপাড়ায় সরকারি এসব নিয়ম নীতি না মেনেই অতি অবাধে পেট্টোল কেনা বেচা হচ্ছে। অপরদিকে ডিলারশীপ, লাইসেন্স এবং বিস্ফোরক লাইসেন্স ছাড়া এলপি গ্যাস বিক্রিতে মানা থাকলেও উল্লাপাড়ায় অনেক বাজারেই সিলিন্ডারের মাধ্যমে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে তা বিক্রি করা হচ্ছে।

উল্লাপাড়া উপজেলা সদর ছাড়া রেলস্টেশন বাজার, বালসাবাড়ি বাজার, লাহিড়ীমোহনপুর বাজার, উধুনিয়া বাজার, বোয়ালিয়া বাজার, ধামাইলকান্দি বাজার, ধরইল বাজার, গয়হাট্টা বাজার, বিনায়েকপুর বাজারসহ প্রায় সব হাট বাজারেই অত্যন্ত খোলা মেলা ভাবে জ্বালানী হিসেবে পেট্টোল ও ডিজেল, কেরোসিন কেনা-বেচা হচ্ছে। এসব হাট বাজারগুলোয় মুদি দোকানসহ অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জ্বালানী তেল কেনা-বেচা হয়।

উল্লাপাড়া শহরেই দশটিও বেশি লাইসেন্সবিহীন এলপি গ্যাসের দোকান রয়েছে। লাহিড়ীমোহনপুর বাজারে রুপক ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে এলপি গ্যাস বিক্রি করা হয়ে আসছে। উল্লাপাড়ায় পেট্টোল, ডিজেল ও এলপি গ্যাস বিক্রিতে সরকারি বিধি বিধানের তোয়াক্কা না থাকায় যে কোন মূহুর্তে বড় ধরনের দূর্ঘটনার ঝুঁকি থাকছে। সেই সাথে সরকারি আদেশ অমান্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উল্লাপাড়ায় বাংলাদেশ পেট্টোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) থেকে জ্বালানী তেল ডিজেল বিক্রিতে লাইসেন্সধারী চারজন ডিলার নিয়োগ আছে। এর মধ্যে যমুনার তিনজন ডিলার হলেন-উপজেলা সদরের মেসার্স ময়েন উদ্দিন সরকার, আল-আমিন কোম্পানি ও লাহিড়ীমোহনপুরে মুমু এন্টারপ্রাইজ এবং মেঘনার একজন ডিলার হলো-লাহিড়ীমোহনপুরের অগ্রদুত বাণিজ্য সংঘ ও সুদেব কু-ু। এছাড়া পেট্টোল বিক্রিতে লাইসেন্সধারী দুইজন ডিলারের হলোÑউপজেলা সদরের আল আমিন কোম্পানী ও লাহিড়ী মোহনপুরের অগ্রদুত বানিজ্য সংঘ। এলপি গ্যাস বিক্রিতে লাইসেন্সধারী ও ডিলারশীপের পাচটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হলো- মেসার্স আলম ট্রেডাস, মেসার্স ময়েন উদ্দিন সরকার, আল আমিন কোম্পানী, অগ্রদুত বাণিজ্য সংঘ, উধুনিয়া বানিজ্য বিতান ও আক্কাস আলী।

নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, জ্বালানী তেল ও এলপি গ্যাস বিক্রিতে সরকারি লাইসেন্স, ডিলারশীপ ছাড়াও অবশ্য অবশ্যই বিস্ফোরক (এক্সক্লুসিভ) লাইসেন্স থাকতে হবে। উল্লাপাড়া উপজেলায় উল্লেখিত প্রতিষ্ঠান বাদে বাকি গুলোর বিস্ফোরক লাইসেন্স নেই বলে জানা যায়।

উল্লাপাড়ার বাখুয়া বাজারে ডিজেল তেলের একজন খুজরা বিক্রেতা মনিরুল ইসলাম জানান, তার কোন লাইসেন্স নেই। দরকারও মনে করেন না। তিনি স্থানীয় ডিলারদের নিকট হতে ডিজেল পাইকারী কিনে এনে খুচরা বিক্রি করেন। মনোহরী দোকানে এভাবে বিক্রিতে ঝুঁকি আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে জানান, ঝুঁকিতো আছেই। তবে সমস্যা নেই।

উল্লাপাড়া শহরে একজন ব্যবসায়ী জয়নাল মিয়া জানান, পেট্টোল বিক্রিতে যে নিয়ম-কানুন আছে তা অবশ্যই মানা হয় না। তবে তিনি সতর্কতার সাথে পেট্টোল বিক্রি করে থাকেন। যাতে কোন দূর্ঘটনা না ঘটে। লাইসেন্স না থাকার বিষয়ে জানান, আবেদন করেছেন, তবে এখনও পাননি।

লাহিড়ীমোহনপুর বাজারে মেঘনার ডিলার অগ্রদুত বানিজ্য সংঘের ইকবাল জানান, গ্রামগঞ্জের এসব খুচরা বিক্রেতারা শুধু ঝুঁকিতেই নয়, ভেজাল মিশিয়ে ডিজেল সহ অন্যান্য জ্বালানী তেল সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে। আর যেভাবে পান দোকান, মুদি দোকানে খোলামেলা ভাবে পেট্টোল কেনা-বেচা হচ্ছে এতে ঝুঁকিতো আছেই সরকারি আইন নীতি অমান্য চরম ভাবে করা হচ্ছে।

অপরদিকে উল্লাপাড়ায় চোরাই জ্বালানী তেলের ব্যবসা সবই খোলামেলা ভাবে হয়ে আসছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়া-নগরবাড়ি মহাসড়কের ধারে উল্লাপাড়া অংশে কমপক্ষে ১৫টি জ্বালানী তেলের অবৈধ দোকান আছে। প্রায় সবকটি দোকান বাজার এলাকা ছেড়ে মহাসড়কের ধারে গ্রাম এলাকায় খোলা হয়েছে। এসব দোকান বলতে ছোট আয়তনে ছাপড়া জাতীয় ঘর তুলে দু-চারটি তেলের ডাম রেখে তেল কেনা-বেচা হয়। এসব দোকান মহাসড়কে চলাচলকারী জ্বালানী তেলবাহি ট্রাংকলড়ি থেকে তেল কেনা আর সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে।

বাঘাবাড়ি ওয়েল ডিপো থেকে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ট্যাংকলড়িতে জ্বালানী তেল ডিজেল, কেরোসিন পরিবহন করে বিভিন্ন গন্তব্য নিয়ে যাওয়া হয়। বিভিন্ন এলাকার জ্বালানী তেলের ডিলার ব্যবসায়ীরা ডিপোটি থেকে তেল নেয়। এই জ্বালানী পরিবহন কালে বেশির ভাগ ট্যাংকলড়িতে মালিক কিংবা তার পক্ষের কেউ থাকে না। এ সুযোগে ট্যাংকলড়ির অনেক অসৎ চালকেরা এসব দোকানে কম দামে চোরাই ভাবে বিক্রি করে থাকে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়। চোরাই তেল বলে দোকানীরাও কায়দা করে এদের কাছ থেকে কম দামে কিনে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বাজার দামের চেয়ে কিছুটা কম দামে বিক্রি করে।

নাম না প্রকাশের শর্তে একাধিক দোকানী জানায়, তারা ব্যবসা করছেন। তবে চোরাই তেল কিনা বিষয়ে অপরাধ হচ্ছে তাও স্বীকার করেন।

উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সন্দ্বীপ কুমার সরকার জানান, স্থানীয় প্রশাসন থেকে মাঝে মধ্যই লাইসেন্সবিহীন জ্বালানী তেল বিক্রি রোধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জরিমানা আদায় এবং সতর্ক করে দেয়া হয়। তিনি আরো বলেন, এদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

 

"