হবিগঞ্জে চা-বাগানে বালু উত্তোলন হুমকির মুখে পরিবেশ

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

মো. মামুন চৌধুরী হবিগঞ্জ
ADVERTISEMENT

সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে হবিগঞ্জের আটটি উপজেলার মধ্যে চারটি উপজেলায় প্রায় ৩০টি বাগানে চা-পাতার চাষ হচ্ছে। ১৫,৭০৩.২৪ হেক্টর জমিতে প্রায় ১ কোটি কেজি চা-পাতা উৎপাদন হয়। বিভিন্ন বাগান এলাকা থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে সংঘবদ্ধ চক্র। যার ফলে জেলার দক্ষিণাঞ্চলের চা-বাগান ও বনাঞ্চলসহ টিলা ধসে পড়ছে।

রাজস্ব আদায়ের নামে পাহাড় কাটা আর নদীনালা থেকে বালু মাটি উত্তোলনের নামে লীজ বলা হচ্ছে। কতিপয় প্রভাবশালীচক্র লীজের নাম ভাঙ্গীয়ে প্রতিযোগীতামূলকভাবে অবৈধ উপায়ে চা-বাগানের পাহাড় কেটে আর ছড়া থেকে বালু ও মাটি উত্তোলন করে বিক্রি করে যাচ্ছে। এতে কতিপয় ব্যক্তি লাখ লাখ টাকার মালিক হলেও, পরিবেশ হচ্ছে ভারসাম্যহীন। এর সাথে চলছে বাগান থেকে চা-গাছের ছায়া বৃক্ষ নিধন। একদিকে পাহাড় কাটা। অন্যদিকে ছায়া বৃক্ষ চুরি না থামায় চা-উৎপাদনে আরাত্মক বাধা সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তিরা জানান, পুরাতন মহাসড়ক দিয়ে শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজ থেকে তেলিয়াপাড়া যাওয়ার পথে দেখা যাবে বালু উত্তোলনে দৃশ্য। যার কারণে এ সড়কের কয়েকটি ব্রিজ হুমকির মুখে রয়েছে।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে জানা গেছে, হবিগঞ্জের পাহাড়ী অঞ্চলে গড়ে উঠা চা-বাগানগুলোর ভেতর থেকে বালু উত্তোলন প্রতিযোগীতামূলকভাবে চলছে। দাপট কাটিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নাম বিক্রি করে প্রভাবশালী নেতারা বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছেন। তাদের লোভের কারণে বাগানগুলো দিন দিন হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। অবৈধভাবে বালুগুলো বাগানের ছড়া অথবা পাহাড় কেটে অপরিকল্পিতভাবে উত্তোলন করে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়। এগুলো ট্রাক, ট্রাক্টর, ট্রলিযোগে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকার স্বার্থে বাগান রক্ষার জন্য ২০১১ সালের ২৩ এপ্রিল সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে একসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভূমি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব এর উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত হয় চা-বাগানগুলোর ভেতর থেকে বালু নেয়া বন্ধ থাকবে। কিন্তু এরপর এনিয়ে আর কোন অগ্রগতি হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের দাপটি নেতারা বালু উত্তোলন ও বিক্রি করছে।

সবচেয়ে বেশি বালু উত্তোলন করা হচ্ছে চন্ডিছড়া, চাঁন্দপুর, দারাগাঁও, বৈকন্ঠপুর, সুরমা, জগদীশপুর চা-বাগানের বিভিন্ন স্থান থেকে। বাগানের ছড়া থেকে বালুগুলো উত্তোলন করে সাজিয়ে রাখা হয় বিক্রির জন্য। সাজানো স্তুপ থেকে বিভিন্ন যানবাহনযোগে বালু বোঝাই করে হবিগঞ্জ জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রশাসন এগুলো দেখেও না দেখার বান করে থাকছে।

এক সময়ে হবিগঞ্জ জেলার চা-বাগানগুলোর ভেতরে ৭টি বালু মহাল রয়েছে। এগুলো অবস্থিত মাধবপুর উপজেলা জগদীশপুর চা-বাগান ছড়া, তেলিয়াপাড়া চা-বাগানছড়া, কিবরিয়াবাদ বালু মহাল, চুনারুঘাট উপজেলার রামগঙ্গা-চন্ডিছড়া বালু মহাল, বাহুবল উপজেলার আমতলী চা-বাগানছড়া, লাউছড়া-দেওছড়া, কামাইছড়া ‘খ’ অংশ। বাগান রক্ষার জন্য এ মহালগুলো থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপরও প্রতিযোগীতামূলকভাবে বালু উত্তোলন করায় চা-বাগানগুলোর পাশাপাশি বনাঞ্চল হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। বনাঞ্চল ও বাগান রক্ষার স্বার্থে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে পরিবেশবাদীরা।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম বলেন, জেলা প্রশাসন পরিবেশ রক্ষায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ পালন করছেন। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন(বাপা) হবিগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, হবিগঞ্জের চা-বাগান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল পরিবেশ রক্ষায় বিরাট ভূমিকা পালন করছে। এসব রক্ষায় অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। তা না হলে পরিবেশ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে। এখনই পদক্ষেপ নিতে তিনি প্রশাসনের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। সেই সাথে দাবী জানিয়েছেন হবিগঞ্জে পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিস চালু করার।

সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তর পরিচালক মোঃ ছালাহ্ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন হচ্ছে অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

"