সমতল ভূমিতে চা চাষে সাফল্য আগ্রহী হচ্ছে তামাকচাষিরাও

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

ওয়ালি মাহমুদ সুমন নীলফামারী
ADVERTISEMENT

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরের পতিত সমতল ভূমিতে চা চাষে সাফল্য পেয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। গোটা চত্বরের পতিত জায়গাগুলো পরিণত হয়েছে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির ফসল চা বাগানে। স্থানীয়রা এ চায়ের নাম দিয়েছেন কাইজেন টি। এ নামে তারা স্থানীয়ভাবে চা বাজারজাত করছেন। এদিকে চা চাষের সাফল্যে এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এর ফলে স্থানীয় তামাক চাষিদের মাঝে চা চাষে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।

উপজেলা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বর প্রায় ২২ একর পতিত জমি ছিল। জমিগুলো ব্যবহারের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে পঞ্চগড় চা বোর্ডের কর্মরত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুনর্বাসিত ভিক্ষুক-দরিদ্র মানুষদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উপজেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে ১ বিঘা জমিতে প্রায় ২ হাজার চা চারা রোপণ করেন। চারা রোপণের অল্প দিনে চা গাছ গজাতে শুরু করে। পরবর্তীতে উপজেলা পরিষদের পতিত প্রায় সাড়ে ৪ একর জমিতে চায়ের চারা রোপণ করা হয়। এদিকে সিনহা কোম্পানি তাদের পতিত প্রায় ৯ একর জমিতে চা চাষ শুরু করে। এছাড়া উপজেলার কেশবা গুচ্ছগ্রামসংলগ্ন পতিত প্রায় ৩ একর জমিতে চা চাষ করা হয়। তাছাড়া মাগুড়া ইউনিয়নে তহশিল অফিসের ১ বিঘা ও উপজেলা ভূমি অফিসের পতিত ১৫ শতাংশ জমিতে চা চাষ করা হয়। সব মিলিয়ে উপজেলার প্রায় ১৭ একর পতিত জমিতে চা চাষ হচ্ছে। আর এসব চা বাগানে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ জন কাজ করছেন। ফলে ওই পরিবারগুলোতে লেগেছে অর্থনৈতিক ছোঁয়া।

কাইজেন টি গার্ডেনে কর্মরত ভেড়ভেড়ী গ্রামের পুনর্বাসিত ভিক্ষুক ফাতেমা বলেন, চা বাগানে কাজ করে ঘণ্টা প্রতি ২০ টাকা দরে কাজ করে দিনে ১৬০ টাকা পাচ্ছি। এ অর্থ দিয়ে পরিবারের ছেলে-মেয়েকে নিয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছি।

কেশবা গ্রামের পুনর্বাসিত ভিক্ষুক শাহিনা বলেন, কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই দেখে দেখে চা বাগানে কাজ করা শিখেছি। বর্তমানে পরিবারে কোনো অভাব নেই।

কাইজেন টি গার্ডেনের তদারককারী মো. রমজান আলী জানান, কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই প্রথমে ১ বিঘা জমিতে চা চাষ শুরু করা হয়। এরপর বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পঞ্চগড়ে কর্মরত সিনিয়র ফার্ম এসিস্টেন্ট মো. জায়েদ ঈমাম সিদ্দিকী স্যারের পরামর্শে অবশিষ্ট জমিতে চা চাষ করা হয়। বাগান থেকে কাঁচা পাতা উত্তোলন করার পর প্রথমে বাছাই করা হয়। এসব পাতা ঢেঁকিতে পিষে তা ভাজা হয়। ভাজা চা পাতার গুঁড়োগুলো পরিষ্কার করে চা তৈরি করা হয়। পরে চা প্যাকেটজাত করে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি ৩ শ’ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের নর্দান বাংলাদেশ প্রজেক্টের কিশোরগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত প্রকল্প প্রকৌশলী আবু হেনা মো. ময়নুল ইসলাম জানান, চা চাষের জন্য এ এলাকার মাটি খুবই উপযোগী। পাহাড়ী অঞ্চলে যেখানে ৩ বছরে পাতা উত্তোলন শুরু হয়। সেখানে এ এলাকায় দেড় বছরে পাতা উত্তোলন হচ্ছে। চলতি বছরে কিশোরগঞ্জ উপজেলায় কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে ১ লাখ চা চারা বিতরণ ও রোপণ করার টার্গেট নেয়া হয়েছে। উপজেলা পরিষদে সরকারিভাবে চা নার্সারি তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। এছাড়া আগামী ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ চা বোর্ড নীলফামারী জেলায় ২৫ হেক্টর জমি চা চাষের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম মেহেদী হাসান জানান, চা চাষের ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আনুমানিক ৫০ জন পুনর্বাসিত ভিক্ষুকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া তামাক চাষের বিকল্প হিসেবে চা চাষে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চলছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন তামাক চাষি চা চাষের অভিমত ব্যক্ত করেছে নিবন্ধনও করেছেন।

চা বাগানের নাম কাইজেন টি গার্ডেন রাখার উদ্দেশ্য জানতে চাইলে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বর্তমানে নড়াইল অতিরিক্ত জেলা প্রসাসক মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, কাইজেন জাপানি শব্দ। কাই শব্দের অর্থ ছোট আকারে পরিবর্তন আর জেন শব্দের অর্থ ভালো। আর কাইজেন শব্দের অর্থ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারে ভালোর জন্য পরিবর্তন।

"