শুক্রবারের প্রতিবেদন

নকশিকাঁথায় জীবন সংগ্রাম

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
ADVERTISEMENT

একসময়ের প্রসিদ্ধ মসলিনশিল্পের পীঠস্থান ছিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ। এখানেই রয়েছে লোক ও কারুপল্লী ফাউন্ডেশন। সেই সোনারগাঁ যেন এখনো বাংলাদেশের কারুশিল্পের রাজধানী। সেই ঐতিহ্যকে যারা ধরে রেখেছেন, হোসনে আরা বেগম তাদেরই একজন। বিয়াল্লিশ বছর বয়সী হোসনে আরা একজন নকশিকাঁথা শিল্পী। সুঁই-সুতোর এফোঁড়-ওফোঁড় করে নিরলস বুনে চলেছেন অন্য রকম এক জীবনের গল্প।

হোসনে আরা জানান, স্বামী কাহার উদ্দিন ছিলেন আদমজী জুট মিলের একজন শ্রমিক। সে সময় স্বামীর আয়ে তাদের ৬ সদস্যের পরিবার খুবই কষ্টে চলত। স্বামী-স্ত্রী ছাড়াও পরিবারে ছিল দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মিলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবনের কূলকিনারা হারিয়ে ফেলে পুরো পরিবারটি। এ সময় বাঁচার লড়াইয়ে হাতে তুলে নেন সুঁই-সুতোর ‘হাতিয়ার’। অনেক কষ্টের মাঝেও এ কাজ বন্ধ করেননি হোসনে আরা। মনে ছিল তার প্রবল ইচ্ছাশক্তি। হোসনে আরা বেগম প্রথমে খেলাচ্ছলে শুরু করেছিলেন এই সুঁই-সুতোর কাজ। জীবনসংগ্রামের একপর্যায়ে সেই সুঁই-সুতোই তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে বেঁচে থাকার লড়াই, অপরদিকে শিল্পের সাধনা। এই দুই প্রত্যয়ই হোসনে আরার জীবনে একাকার হয়ে গেছে।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ইছাপাড়া গ্রামে কাহার উদ্দিন মিয়ার বাড়ি। সে বাড়িতে স্বামীর সঙ্গে থাকেন এই নকশিকাঁথা শিল্পী। নিজ হাতে তৈরি করেন সুনিপুণ কারুকার্য খচিত শিল্পকর্ম। বিক্রি করে আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি দেশব্যাপী ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন তিনি। প্রতিবছরই সোনারগাঁয়ের বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের মাসব্যাপী মেলায় অংশ নেন। কারুপল্লী গ্রামে নকশিকাঁথা ওয়ালমেট প্যাভিলিয়নে এখন তার ব্যস্ত সময় কাটে।

গভীর মনোযোগের সঙ্গে সেলাইয়ের কাজ শিখেছেন। কাজ শিখেছেন ‘নকশিকাঁথার মাঠ’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় একটি নকশিকাঁথা তৈরি করেন। পরে সেটি ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। সেই থেকে হোসনে আরা বেগম সবার নজর কাড়েন। নতুন যাত্রা শুরু হয় তার। এরপর যোগাযোগ হয় ঢাকার বারিধারার একটি হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনার লাইনের সঙ্গে। ডিজাইনার লাইন থেকে নিয়মিত কাজ এনে নিজের ঘরে বসে কাঁথা, শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, কুশনসহ বিভিন্ন কাপড়ে সুতায় নকশি কাজ করেন। হোসনে আরার পাশে দাঁড়িয়েছেন তার তিন মেয়ে। নাম আসমা, ইভা ও দিপা। তারাও মাকে সেলাইয়ের কাজে সহযোগিতা করে থাকেন। সেলাইয়ের পাশাপাশি তার মেয়েরা মাটির তৈরি গহনার কাজও শিখেছেন। সোনারগাঁয়ে মাসব্যাপী লোক ও কারুশিল্প মেলায় নকশিকাঁথার পসরা সাজানো হয়। এজন্য প্রতিবছর ডাক পড়ে হোসনে আরার। এই শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয় সেখানে।

মেয়ে আসমা আক্তারের দাবি সহজ শর্তে ঋণ, সরকারি আনুকূল্য। কোনো কারুশিল্প প্রতিষ্ঠানে মায়ের চাকরি চান তিনি।

বর্তমানে হোসনে আরা বেগম তার স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে গুছিয়ে নিয়েছেন সংসার। কেটে গেছে অভাব-অনটনের কালো মেঘ। এখন সচ্ছলতার মুখ দেখছেন তিনি। স্বামী কাহার উদ্দিন নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন এখন। তবে বেশি পরিশ্রম করতে পারেন না। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগবালাই। এত কিছুর মধ্যেও জীবন থেমে থাকছে না হোসনে আরার। আপন মনে বুনে চলেছেন নানা রঙের ডিজাইনের নকশিকাঁথা। শাড়িতে ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পের ছোঁয়া।

"