আসছে রোহিঙ্গা, বাড়ছে বসতি

‘মেরে ফেল তবু ওপারে যাব না’

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফ প্রতিনিধি
ADVERTISEMENT

সীমান্তরক্ষী বিজিবির কড়া নজরদারি থাকার পরও রাতের আঁধারে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করছে সপরিবারে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, রাখাইন রাজ্যে সেনারা রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ, গলা কেটে, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা ও নির্যাতন চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। এবার রাখাইন সেনারা নতুন করে মংডু শহরের মংলা ও হাতিয়া পাড়ায় তাদের বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছে। নছিমা খাতুন নামের এক বৃদ্ধা রোহিঙ্গা সাংবাদিকদের কাছে সেই বর্বরতার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘আমাকে মেরে ফেল, তবু ওপারে পাঠিয়ে দিও না। ওরা আমার সামনে অনেক নারীকে ধর্ষণ করেছে। এরপর শিশুসহ প্রায় ৫০ জনকে গুলি ও গলা কেটে তারা হত্যা করেছে। এতে তাদের বর্বরতা থামেনি। আমার দুই ছেলে আবদুস সালাম ও লাল মিয়াকে আমার সামনে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। কোনো মতে প্রাণে বেঁচে আমার ছোট সন্তান নূর সালামকে নিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করি।’

স্থানীয় দালালরা টাকার বিনিময়ে এসব রোহিঙ্গাকে পৌঁছে দিচ্ছে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে। প্রতি রাতে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকায় তাদের থাকার জায়গা নেই। ফলে এসব রোহিঙ্গা তৈরি করছে নতুন নতুন ঝুপড়ি ঘর। গতকাল বৃহস্পতিবার কুতুপালং ক্যাম্প ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে। কুতুপালং বস্তির বাসিন্দা ইয়াকুব আলী জানান, ছোট্ট একটি ঝুপড়িতে তারা স্বামী-স্ত্রী, ছেলেমেয়েসহ সাতজনের বসবাস। এ অবস্থায় এক আত্মীয় পরিবারের পাঁচজনকে জায়গা দিতে গিয়ে কোনো রকমে ঠাসাঠাসির মধ্যে রাত কাটাতে হচ্ছে। কুতুপালং বস্তি ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক জানান, যাদের টাকা আছে তারা ঝুপড়ি নির্মাণ করছে। যাদের সহায়-সম্বল নাই তারা অন্যের বাড়িতে মানবেতর দিনযাপন করছেন। কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ আরমান শাকিল বলেন, ক্যাম্পে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা নাগরিক আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।

বুধবার ওপারের দালালের হাত ধরে শিশুসহ ৩০ মিয়ানমারের নাগরিক বাংলাদেশে ঢুকে। তারা গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে কক্সবাজারের টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসে পৌঁছে। এ সময় কথা হয় নছিমা খাতুন (৬০) নামে এক বৃদ্ধা রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে। তখন তার চোখে পানি টলমল করে। তার বাড়ি মিয়ানমারের মংডু শহরের পোয়াংখালী গ্রামে।

নছিমা খাতুনদের সঙ্গে আসা মুমিনা আক্তার বলেন, ‘আমার বড় ছেলে মো. জিন্নাকে গলা কেটে হত্যা করেছে রাখাইনরা। তারা আমাকে ধর্ষণ করতে চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু আমি পাশের এক কুড়ে ঘরে লুকিয়ে ছিলাম। এরপর তারা চলে যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিদিন রাখাইন সেনারা এক গ্লাস পানির কথা বলে বাড়িতে ঢুকে নারীদের ধর্ষণ করে। যাওয়ার সময় স্বর্ণালংকার ও টাকা লুটে নিয়ে যাচ্ছে। এপারে এসেও আমরা ঠিকমতো খেতে পারছি না।’ এদিকে, উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আবুল খায়ের জানান, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে রাত-দিন পরিশ্রম করছে বিজিবি ও পুলিশ । তার পরও ফাঁকফোকর দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে।

কক্সবাজার-৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল ইমরান উল্লাহ সরকার জানান, সীমান্তে বিজিবির কড়া নজরদারি সত্ত্বেও যেসব রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে তাদের আটক করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি নাফ নদী অতিক্রম করাকালেও রোহিঙ্গাবোঝাই নৌকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। টেকনাফ-২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ জানান, সীমান্তজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

"