আদালতে নির্দোষ দাবি খালেদার

৯ জানুয়ারি হাজির না হলে জামিন বাতিল

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

আদালত প্রতিবেদক
ADVERTISEMENT

জিয়া দাতব্য ট্রাস্টের টাকা আত্মসাতের মামলায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে সুবিচার চেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ঢাকার তিন নম্বর বিশেষ জজ আদালতে হাজির হয়ে আদালতের কাছে এ দাবি করেন। এদিকে রাষ্ট্রদ্রোহের ও নাশকতার নয় মামলায় তাকে ৯ জানুয়ারি আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। খালেদা জিয়া ওইদিন হাজির না থাকলে তার জামিন বাতিল করা হবে বলে আদালত আদেশে জানিয়েছেন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লার আদালত গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় দেন।

জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলা : গতকাল বৃহস্পতিবার আত্মপক্ষ সমর্থনের আগে এ মামলার ৩২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি তাকে পড়ে শোনানো হয়। পরে খালেদা প্রায় ১৫ মিনিট তার যুক্তি বিচারকের সামনে তুলে ধরে বলেন, ওইসব সাক্ষ্যে যে বক্তব্য এসেছে তা সঠিক নয়। আমি নির্দোষ।

এদিন শুনানিতে একটি লিখিত বক্তব?্যও নিয়ে এসেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা। দিনের শুনানি শেষে বিচারক আবু আহমেদ জমাদার ৮ ডিসেম্বর এ মামলার পরবর্তী দিন ঠিক করে দেন। ওইদিন খালেদা জিয়া তার আত্মপক্ষ সমর্থনে আরো বক্তব?্য দেবেন।

পুরান ঢাকার বকশিবাজারে কারা অধিদফতরের মাঠে এ আদালতেই জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার চলছে। খালেদার পাশাপাশি তার ছেলে তারেক রহমানও এ মামলার আসামি। এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় এদিন তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক হারুন অর রশিদকে জেরা করেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেকের আইনজীবীরা।

বিচারের শেষ পর্যায়ে থাকা এ মামলাতেও ৮ ডিসেম্বর পরবর্তী তারিখ রাখা হয়েছে। এ দুটি মামলায় এর আগে শুনানি হয় গত ২১ নভেম্বর। সেদিন খালেদার পক্ষে তার আইনজীবী সময়ের আবেদন করলে দাতব্য ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের আত্মপক্ষ সমর্থন পিছিয়ে যায়।

আর এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় খালেদার ছেলে তারেক রহমানের পক্ষে তার আইনজীবী বোরহান উদ্দিন সেদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক হারুন অর রশিদকে আংশিক জেরা করেন। সেদিনই বিচারক আবু আহমেদ জমাদার মামলা দুটির শুনানির জন?্য ১ ডিসেম্বর দিন ঠিক করে দেন। সে অনুযায়ী বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় খালেদা গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’ থেকে আদালতের পথে রওনা হন বলে তার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া জানান। এদিকে খালেদার হাজিরার দিন থাকায় সকাল থেকেই আদালত এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও আদালত প্রাঙ্গণে হাজির হন।

দাতব?্য ট্রাস্ট মামলা : জিয়া দাতব?্য ট্রাস্টের নামে আসা ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় এ মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। খালেদা জিয়া ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলেনÑতার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদা জিয়াসহ চারজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। পরের বছরের ১৯ মার্চ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আসামিদের বিচার শুরু হয়।

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলা : এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলা করে দুদক। ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলাটি করা হয়। ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট দুদক আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

অভিযোগপত্রে খালেদা জিয়া, তার বড় ছেলে তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে আসামি করা হয়। তারেক রহমান দেশের বাইরে আছেন। কাজী সালিমুল হক কামাল, শরফুদ্দিন আহমেদ জামিনে আছেন। ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

১০ মামলা : রাষ্ট্রদ্রোহের একটি ও নাশকতার নয় মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার খালেদার অনুপস্থিতিতে তার আইনজীবী জয়নাল আবেদীন মেজবাহ সময়ের আবেদন করলে বিচারক তা মঞ্জুর করে শুনানির জন?্য ৯ জানুয়ারি দিন ঠিক করে দেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত কৌঁসুলি তাপস পাল জানান। তিনি বলেন, ওইদিন খালেদা জিয়া আদালতে না গেলে জামিন বাতিল করা হবে বলে বিচারক হুশিয়ার করে দিয়েছেন।

খালেদার বিরুদ্ধে মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে দারুসসালাম থানার নাশতার আট মামলা, রাষ্ট্রদ্রোহের একটি এবং যাত্রাবাড়ী থানার বিস্ফোরক আইনের একটি মামলা।

গত বছর ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের এক আলোচনা সভায় খালেদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ‘আজকে বলা হয়, এত লক্ষ লোক শহীদ হয়েছেন। এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে যে, আসলে কত লক্ষ লোক মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। নানা বই-কিতাবে নানা রকম তথ্য আছে।’

ওই বক্তব্যে ‘দেশদ্রোহী’ মনোভাবের পরিচয় রয়েছে অভিযোগ করে গত ২৫ জানুয়ারি ঢাকার হাকিম আদালতে খালেদার বিরুদ্ধে মামলা করেন আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মমতাজ উদ্দিন আহমদ মেহেদী। ওই মামলা করার আগে তিনি নিয়ম অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতিও নেন।

ওই মামলায় পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা ১০ আগস্ট অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ১০ অক্টোবর দিন ঠিক করে দেন। হাকিম আদালতে এ মামলায় জামিন পাওয়া খালেদা এ আদালত থেকেও জামিন পান।

আট মামলা : দশম সংসদ নির্বাচনের বছরপূর্তিতে গত বছরের ৫ জানুয়ারি সমাবেশ করতে বাধা পেয়ে দলীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকে সারা দেশে লাগাতার অবরোধ ডাকেন খালেদা জিয়া। ৯০ দিনের এ কর্মসূচিতে বহু গাড়ি পোড়ানো হয়, অগ্নিসংযোগ হয় বিভিন্ন স্থাপনায়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান প্রায় দেড়শ মানুষ। তখন নাশকতার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে অসংখ্য মামলা করে। তার মধ্যে দারুসসালাম থানায় করা নয়টি মামলায় খালেদাকে হুকুমের আসামি করা হয়, যার মধ্যে আটটি মামলা বিশেষ ক্ষমতা আইনের। গত মে ও জুন মাসে খালেদাসহ বিএনপি নেতাকর্মীদের আসামি করে এসব মামলায় অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। গত ১০ আগস্ট ঢাকার ১নং মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আট মামলায় জামিন পান খালেদা জিয়া। সবগুলো মামলাই অভিযোগ গঠনের শুনানির পর্যায়ে রয়েছে।

বিস্ফোরক মামলা : গত বছর বিএনপির লাগাতার অবরোধ-হরতালের মধে?্য ২৩ জানুয়ারি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাঠের পুল এলাকায় গ্লোরি পরিবহনের একটি বাসে পেট্রল বোমা ছোড়া হলে অগ্নিদগ্ধ ও আহত হন ৩০ জন। এর মধ্যে নূর আলম নামে এক ঠিকাদার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানার এস আই কেএম নুরুজ্জামান দুটি মামলা করেন, যাতে অবরোধ আহ্বানকারী বিএনপি চেয়ারপারসনকে করা হয় হুকুমের আসামি। তদন্ত শেষে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এস আই বশির উদ্দিন গত বছরের ৬ মে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের (সিএমএম) আদালতে খালেদাসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে পৃথক দুটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

"