ইসির তিন চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ
ADVERTISEMENT

আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ‘নাসিক’ ইস্যুতে তিন চ্যালেঞ্জের মুখে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চ্যালেঞ্জসমূহ হচ্ছেÑ ভোটগ্রহণে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা, ভোটকেন্দ্র পাহারায় ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা স্থাপন না করা এবং ক্ষমতাসীন সমর্থিত প্রার্থী-কর্মীদের সামলে অন্য প্রার্থীদের নির্বাচনে প্রচারের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ রাখা।

এই তিনটি পদক্ষেপ গ্রহণে শৈথিলতা দেখালে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠানে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্তরায় হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কমিশনও দ্বিমত পোষণ করছে না সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমতে। তারা বলছেন, নানা কারণে বিতর্কিত নাসিক নির্বাচন তাদের জন্যও চ্যালেঞ্জ। আগামী ২২ ডিসেম্বর এ সিটিতে ভোটগ্রহণ হবে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, নানা কারণে বিতর্কিত হয়ে আছে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনটি। তবে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশবাসীকে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে তারা বদ্ধপরিকর। এর জন্য যা যা করণীয় সবই করতে প্রস্তুত কমিশন। গত নির্বাচনে ইভিএম ও সিসি ক্যামেরার ব্যবহার হয়েছিল এবারো তা রাখা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কতগুলো ইভিএম ত্রুটিমুক্ত রয়েছে জানি না এবং এত ক্যামেরা কোথায় পাব, এ প্রতিবেদকের উদ্দেশে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ ছহুল হোসাইন বলেন, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে সেসব চ্যালেঞ্জ উতরে যাওয়া তাদের জন্য সহজ হয়েছিল। এর মধ্যে অতি-ঝুঁকিপূর্ণ কিছু কেন্দ্রে ইভিএম রাখা এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার সিদ্ধান্ত ছিল অন্যতম। তিনি বলেন, সেদিনের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ভোটের আগের রাতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন, ফলে এ নির্বাচনে তাদের ওপর থেকে চাপ কিছুটা কমে এসেছিল। এবার ইভিএম না রাখা, সিসি ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা এবং বিএনপির প্রার্থীর মাঠে থাকাতে আরো কঠিন হবে এই ইসির জন্য সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ। তবে এসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে তারা সামলাবেন তা তাদের ব্যাপার বলে জানান সাবেক নির্বাচন কমিশনার।

আর সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নাসিকের সব কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। আর সুষ্ঠু ভোট গ্রহণের জন্য যেসব অনুষঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোকে উপেক্ষা করছে কমিশন; এটা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, ভোটারদের নির্বিঘেœ ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করবে ইসিÑ এটাই সবার কাম্য। কারণ এ নির্বাচনে রাষ্ট্রের প্রধান দুই শক্তি আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচনের মাঠে লড়ছেন। তাই সব দলের জন্য সমান সুযোগ রেখে নির্বাচনে প্রচারের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতা প্রমাণ করবে এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। তিনি বলেন, বিদায়ের আগে কমিশনের জন্য এটা সবচেয়ে বড় নির্বাচন। তাই নিরপেক্ষতা বজায় রেখে নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়া তাদের জন্যও চ্যালেঞ্জ। কারণ ক্ষমতাসীন দলের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি বরাবরই এই কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এটি তাদের জন্য সব দলকে আস্থায় রেখে শান্তিপূর্ণ বিদায় নেওয়ার শেষ সুযোগ।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে এখনো পর্যন্ত ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এমনকি কেন্দ্র দখল কিংবা ব্যালট বাক্স ছিনতাই প্রতিরোধে কেন্দ্রওয়ারি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের খবরও তাদের জানা নেই। তবে গত নির্বাচনে এ দুটি প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে নানা শঙ্কা সত্ত্বেও কোনো ঝক্কি ছাড়াই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছিল। এগুলোর ব্যবহার সিটি নির্বাচনে প্রয়োগ করা না হলে পেশিশক্তির ব্যবহার বেড়ে যেতে পারে। কারণ হিসেবে তারা বলেন, গত নির্বাচনে অতিঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার হওয়ায় দ্রুত ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছিল। ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের কোনো সুযোগ ছিল না। এ ছাড়া ইভিএম ছিনিয়ে নিলেও টেকনিক্যাল এক্সপার্ট ছাড়া এই যন্ত্রে সংরক্ষিত ভোট নয়-ছয় করা অসম্ভব। আর সিসি ক্যামেরা কেন্দ্রে বসানো হলে বহিরাগত ও সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করা সহজ হতো।

ইসি তথ্যমতে, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৯টি ওয়ার্ডে ইভিএম ব্যবহার এবং অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ২৫টি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এ ছাড়াও কেন্দ্রের বাইরেও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল।

গত নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করা ইসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত নির্বাচনে ক্ষমতাসীন সমর্থিত প্রার্থী দুপুরের দিকে ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা থাকায় পরাজয় নিশ্চিত হয়ে কেন্দ্রের বাইরে উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এমনকি আইভীর সমর্থিত যুবলীগের একজন কর্মীকে মারপিট করারও অভিযোগ উঠেছিল। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল নারায়গঞ্জজুড়ে। পরে অবশ্য র‌্যাব-পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং রক্ষা হয়েছিল ভোটকেন্দ্রও।

এ ছাড়া আগামী ৫ ডিসেম্বর চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেবেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। ওই দিনই থেকেই শুরু হয়ে যাবে নির্বাচনের প্রচার। ইতিমধ্যে বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে। তবে কমিশন সরাসরি তা নাকচ করেছে।

প্রসঙ্গত, সাবেক শামসুল হুদা কমিশন ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু করতে নারায়ণগঞ্জে সেনা মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে সরকার সেনা মোতায়েনে অপারগতা দেখালে সাবেক কমিশন পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে কমিশনের চাহিদানুযায়ী অন্যান্য র্ফোস (র‌্যাব-বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন) নিয়োগে সর্বোচ্চ সহায়তার প্রতিশ্রুতিতে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন সাবেক কমিশনাররা।

এদিকে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচনের মাঠে থাকায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে থাকবে বলে অকপটে স্বীকার করেছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলেন, এগুলো মোকাবিলা করার জন্য দল নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে নির্বাচনের কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। এটা করা সম্ভব না হলে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলতে থাকবে। একপর্যায়ে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ ইসির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

কারণ স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সমর্থিত প্রার্থী উপেক্ষিত হওয়ায় দল মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ দানা বেঁধেছে। আর আইভীর এক খুদেবার্তা ইস্যুতে নারায়ণগঞ্জ ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ এখন। এসব নানা বিতর্কিত কর্মকা-ের কারণে নৌকার প্রার্থী আইভী শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সংসদ সদস্যকে পাশে পাবেন কি না এ নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন খোদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। কারণ গত নির্বাচনে শামীম ওসমানকে ঠেকাতে বিএনপির প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করিয়েছিল দল। এবার শামীম ওসমান সমর্থিতরা দলীয় মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ এবং খুদেবার্তা ইস্যুতে আইভীকে ঠেকাতে প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে কৌশলে সমর্থন দিলে নাসিক নির্বাচন পুরো মাত্রায় জমে উঠবে। তখন সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ কমিশনের জন্য কঠিন হবে। এর জন্য সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি এখন থেকেই নিয়ে রাখা কমিশনের জন্য মঙ্গলজনক হবে বলে অভিমত নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

নাসিকে সাধারণ ওয়ার্ড ২৭ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড নয়টি। মোট ভোটার ৪ লাখ তিন হাজার ৭০৬। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ তিন হাজার ৯৬ জন ও নারী দুই লাখ ৬১০ জন। গত ১৪ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২২ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

"