চুক্তি স্বাক্ষরের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে হাসিনা-ওরবান

বাংলাদেশ-হাঙ্গেরি সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যয়

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক
ADVERTISEMENT

বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরি পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পররাষ্ট্র ইস্যুতে পরামর্শ ও কৃষিক্ষেত্রে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে। গতকাল মঙ্গলবার হাঙ্গেরির পার্লামেন্ট ভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে এই চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের পর যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে অংশ নেন দুই প্রধানমন্ত্রী। দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন দুজনই। এ সময় শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বের প্রসংশা করেন ভিক্টর ওরবান। তিনি জানান, বাংলাদেশর উন্নয়ন ও অগ্রগতি আজ বিশ্ব নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ওরবান বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে যে সহযোগিতার সম্পর্ক আমরা স্থাপন করতে যাচ্ছি তা নতুন মাত্রা পাবে। জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে এর মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে থাকার ঘোষণা দেন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের ডিজিটাল ইকোনমির অগ্রগতির বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার যে অবস্থান ও অ্যাকশন তারও প্রশংসা করেন ভিক্টর ওরবান। তিনি বলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হাঙ্গেরি ও বাংলাদেশ উভয়ই একই অবস্থানে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের পাঁচ হাজার সেনা পাঠানোর প্রশংসা করেন তিনি।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠক : হাঙ্গেরির সঙ্গে বাংলাদেশের এটাই ছিল প্রথম দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। যা অনুষ্ঠিত হলো দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভিক্টর ওরবানের মধ্যে। ওরবান শেখ হাসিনাকে এ সময়ের সাহসী নেতৃত্ব বলে উল্লখ করলেন। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সন্ত্রাসসহ নানা সংকটের বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের কৌশলগুলোর প্রশংসা করলেন। শেখ হাসিনা তাকে নিয়ে এমন মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে আরো বিস্তৃত আঙ্গিকে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে শত বছরের ঐতিহ্যমন্ডিত পার্লামেন্ট স্কয়ারে পৌঁছালে তাকে দেওয়া হয় বিশেষ গার্ড অব অনার। সেখানে যন্ত্রে দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। গার্ড রেজিমেন্টের চৌকস দল মার্চ পাস্ট করার সময় দুই প্রধানমন্ত্রী তাদের দেওয়া সম্মান গ্রহণ করেন। পরে গার্ড পরিদর্শন করেন। আড়ম্বরপূর্ণ এই গার্ড অব অনার শেষে দুই নেতা এগিয়ে যান তেত-এ-তেতে, যা ছিল দুই নেতার একান্ত বৈঠক। এরপর ছিল আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্কে নতুন নতুন দিক নিয়ে কথা হয়েছে তাতে। অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে দুই নেতার মধ্যে এই বৈঠক বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরির মধ্যে সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবেÑএমনটাই জানালেন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। বৈঠক সম্পর্কে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, বৈঠকের শুরুতেই শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী। তিনি কেবল হাসিনারই নয়, তার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করে তার পুরো পরিবারকেই সাহসী বলে উল্লেখ করেন। দুই নেতা নতুন সহযোগিতার অন্তত পাঁচটি দিক নিয়ে কথা বলেন। পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও এসডিজি ২০৩০-এ পানিবিষয়ক তহবিল।

সমঝোতা স্মারক সই : পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই করেন বাংলাদেশের পক্ষে পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও হাঙ্গেরির পক্ষে অভ্যন্তরীণবিষয়ক মন্ত্রী সানদোর পিন্তার। পররাষ্ট্র ইস্যুতে পরামর্শবিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক ও হাঙ্গেরির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক কূটনীতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লেভেন্তে মাগায়ার। আর কৃষিবিষয়ক সমঝোতা স্মারকে সই করেন বাংলাদেশের কৃষিসচিব মইনুদ্দীন আবদুল্লাহ ও হাঙ্গেরির পরিবেশবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জোল্ট ভি নিমেথ।

প্রেস ব্রিফিং : চুক্তি স্বাক্ষরের পর যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে অংশ নেন দুই প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে তাকে নিয়ে যেসব কথা হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সেজন্য ধন্যবাদ জানান। এ ছাড়াও তিনি প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ তৈরি করায় হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। দুই পক্ষের সম্পর্ক বৃহত্তর আঙ্গিক দেওয়ায়ও ওরবানকে ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা। বুদাপেস্টে চলমান বিশ্ব পানি শীর্ষ সম্মেলনকে পানি সম্পর্কিত বিষয়ে একটি বৈশ্বিক ঐকমত্য গড়ে তোলার প্লাটফর্ম হিসেবেই ব্যক্ত করেন তিনি। হাঙ্গেরির অর্থনীতিক অগ্রগতি ও সাফল্যের দিকে বাংলাদেশ গভীরভাবে দৃষ্টি রাখছে এ কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, হাঙ্গেরিই আজ মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে বাণিজ্য ও তৈরিখাতের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, ইউরোপে এই দেশ অর্থনৈতিক শক্তির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, গত ২৫ বছরে হাঙ্গেরি নিজেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে যে উন্নতির পথে নিয়ে গেছে, এই সুযোগে আমি তার প্রশংসা করতে চাই।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা ও পরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্মের পরপরই হাঙ্গেরি যেভাবে বাংলাদেশের পাশে থাকা আর প্রথম দিককার ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। আমি আশা করি এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক তার পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে পুনর্স্থাপিত হবে, বলেন তিনি।

সমঝোতা স্মারকগুলোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মধ্য দিয়ে পানি ব্যবস্থাপনায় হাঙ্গেরির দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ব্যবহারে বাংলাদেশ সক্ষম হবে। এ সময় তিনি আবারো পানি বিষয়ে একটি বৈশ্বিক তহবিল গঠনের কথা বলেন এবং এ লক্ষ্যে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের সমর্থন চান। পানি বিষয়ে একটি বৈশ্বিক ঐকমত্য সৃষ্টির লক্ষেও উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। দুই পক্ষের বৈঠকে সন্ত্রাস, সহিংস মৌলবাদ, অভিবাস ও শরণার্থী সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি সংক্রান্ত বৈশ্বিক বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে বলে প্রেস স্টেটমেন্টে জানান শেখ হাসিনা। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

আগামী মাসে ঢাকায় অভিবাসন ও উন্নয়ন বিষয়ে নবম বিশ্বফোরাম অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশা করি এ নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের যে বিতর্ক ঢাকায় হতে যাচ্ছে তাতে হাঙ্গেরিও অংশ নেবে। বিশ্বকে দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত, অন্যায্যতা ও অসমতা মুক্ত হিসেবে দেখতে চাই, আমাদের সন্তানদের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব রেখে যেতে চাই, আমরা বিশ্ববাসীর সাধারণ সংকটগুলো নিরসনে একসঙ্গে কাজ করতে চাই, ঘোষণা করেন শেখ হাসিনা।

হাঙ্গেরির সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার হবে, দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মানুষ উপকৃত হবে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। এ সময় বাংলাদেশ সফরে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমি শিগগিরই আপনাকে বাংলাদেশে স্বাগত জানাতে চাই।

"