ভেজাল প্যারাসিটামল মামলায় আসামিরা খালাস

গাফিলতি কোথায়

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ
ADVERTISEMENT

বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে শিশুমৃত্যুর আরেকটি ঘটনা প্রমাণে ব্যর্থ হলো সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। সে ব্যর্থতার কারণেই ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ পানে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় রিড ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিকসহ পাঁচজনকে বেকসুর খালাস দেন আদালত। গতকাল সে মামলার রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। তদন্তে গাফিলতি ছিল। তাই আসামিদের খালাস দেওয়া হলো। এর ফলে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর দেশে এখন পর্যন্ত ভেজাল প্যারাসিটামল সেবনে শিশুমৃত্যুর বড় দুটি ঘটনা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলো। ২৩ বছর আগে জীবন রক্ষাকরী প্যারাসিটামল সেবন করে ৭৬ শিশুর করুণ মৃত্যু হয়। সর্বশেষ রিড ফার্মাসিউটিক্যালস নামে একটি ওষুধ কোম্পানির উৎপাদিত প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে ২০০৯ সালের জুন-জুলাই মাসে কিডনি বিকল হয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৮ শিশুর করুণ মৃত্যু হয়।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, ১৯৮৩ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ভেজার ওষুধ খেয়ে দেশে প্রায় ২ হাজার ৭০০ শিশু মারা যায়। এসব ঘটনায় ১৯৯২ সালে পাঁচটি মামলা করা হয়। কিন্তু কোনোটাতেই শক্তভাবে ভেজাল প্রমাণ করতে না পারায় কয়েক বছরের কারাদ-ের মতো লঘু শাস্তির মধ্য দিয়েই শেষ হয় এতগুলো শিশুমৃত্যুর ঘটনা।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের এ গাফিলতির তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশের জনস্বাস্থ্য ও ওষুধ বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন সংগঠনগুলো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা প্রচ- ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের কাছে শিশুর প্রাণের মূল্য নেই। তারা বারবার ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর পক্ষ নেবে আর আমাদের শিশুরা মারা যাবে। যদি ভেজাল ওষুধ চিহ্নিত করার যোগ্যতা না থাকে, তাহলে এমন প্রশাসন রাখার দরকার কী বলেও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তারা এ কথাও বলেছেন, যাদের গাফিলতির কারণে এতগুলো শিশুর প্রাণহন্তারকরা বেকসুর খালাস পেয়ে গেল, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ তৈরির অভিযোগ এনে ২০০৯ সালের ১০ আগস্ট ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে রিড ফার্মাসিউটিক্যালসের বিরুদ্ধে আদালতে এ মামলা করেছিলেন। সাত বছর পর গতকাল সে মামলার রায়ে সবাই খালাস পান। খালাস পাওয়া পাঁচ আসামি হলেন রিড ফার্মার মালিক মিজানুর রহমান, তার স্ত্রী পরিচালক শিউলি রহমান, পরিচালক আবদুল গণি, ফার্মাসিস্ট মাহবুবুল ইসলাম ও এনামুল হক। আদালতে উপস্থিত ছিলেন মিজানুর ও শিউলি। বাকি তিনজন পলাতক।

গাফিলতি কোথায় : রিড ফার্মাসিউটিক্যালসের প্যারাসিটামল সেবন করে শিশুমৃত্যুর মামলার এজাহারে বলা হয়েছিল, রিড ফার্মার প্যারাসিটামলে বিষাক্ত উপাদানের কারণে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলেন, ওই প্যারাসিটামলে বিষাক্ত ডাই ইথিলিন গ্লাইকল পাওয়া যায়নি। তবে ওই ওষুধ ছিল নিম্নমানের।

অভিযোগ প্রমাণের ব্যর্থতার কারণ উল্লেখ করে ড্রাগ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি নাদিম মিয়া বলেন, আদালত রায়ে বলেছেন, এ মামলার আলামত আইনসম্মতভাবে জব্দ করা হয়নি। মামলার বাদী ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে আদালত রায়ে বলেছেন, বাদীর অদক্ষতা ও অযোগ্যতা রয়েছে। তিনি আলামত যথাযথভাবে জব্দ করেননি। জব্দ করার স্থানটাও সঠিক নয়। সঠিক নিয়ম মেনে জব্দ তালিকা ও পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেননি।

সরকারি এই কৌঁসুলি আরো বলেন, ‘মামলার আলামত জব্দ করা হয়েছে ঢাকার শিশু হাসপাতাল থেকে। হাসপাতাল থেকে জব্দ করা হয়েছে যে ওষুধ, তা রিড ফার্মার বলে প্রমাণিত হয়নি। আমরা যেটুকু বুঝেছি, মামলার আলামত হিসেবে ওষুধ যদি কারখানা থেকে করা জব্দ করা হতো, তাহলে হয়তো সঠিক হতো।

কৌঁসুলি নাদিম বলেন, জব্দ করার নিয়ম হলো, মামলার আলামত চার ভাগে বিভক্ত করতে হবে। জব্দ করা আলামতের একটা অংশ দিতে হবে আসামিপক্ষকে, আরেকটি অংশ পাঠাতে হবে আদালতে। আলামত নিজের দখলেও রাখবে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। আরেকটা নমুনা পাঠাতে হবে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে। রিড ফার্মার বিরুদ্ধে করা মামলার আলামত জব্দে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। আদালতেও কোনো নমুনা পাঠানো হয়নি।

অধিদফতরের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, তাহলে তো যারা ভেজাল প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলো, তাদের গাফিলতির জন্য শাস্তি হওয়া উচিত। যেহেতু ওষুধে ভেজাল ছিল না, তার মানে শিশুরা অন্য কারণে মারা গেছে। কিন্তু সেটি তো নয়। এতগুলো শিশুর মৃত্যু হলো। অথচ সেই ওষুধ ভেজাল প্রমাণ করতে পারল না, এটি অবিশ্বাস্য।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ভেজাল বের করার দায়িত্ব ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের। বাজার থেকে সংগ্রহ করে তারা সেটি করতে পারত। তা ছাড়া কীভাবে এসব মামলা করতে হয়, তদন্ত করতে হয়, সেটিও যদি না জানে তাহলে এমন অধিদফতর রেখে লাভ কী। তার মানে স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার জন্য যে সুশাসন দরকার, দেশে সেটি নেই। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এভাবে একের পর এক ভেজাল ওষুধ খেয়ে শিশুরা মারা যাবে, আর ওষুধ প্রশাসন সেটি প্রমাণ করতে পারবে না। এটা হতে পারে না। তার মানে হয় ওষুধ প্রশাসন দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে; নতুবা সেখানে অযোগ্য লোকজন কাজ করছে। সরকারের বিষয়টি তদন্ত করা উচিত। এই গাফিলতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভেজাল প্যারাসিটামল প্রমাণে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের ব্যর্থতাকে ‘খুবই দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক। তিনি বলেন, এতগুলো শিশু মারা গেল, অথচ সেটি প্রমাণ করতে পারল না অধিদফতর। এই প্রায়শ্চিত্ত সবাইকে করতে হবে।

শুধু এবারই নয়, এর আগেও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ওষুধের ভেজাল প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে এই ওষুধ বিশেষজ্ঞ বলেন, আশির দশকে ভেজাল ওষুধ সেবন করে দুই হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়। তখনো সে ভেজাল প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। ৯৪ সালে শেষ পর্যন্ত ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. হানিফ ভেজাল বের করেন। এমনকি অধিদফতরের গাফিলতির কারণে সে মামলার রায় হয় ২১ বছর পর ২০১৫ সালে। এখানে আদালতের কোনো দোষ নেই। পরে জানতে পারলাম, অধিদফতর তদন্ত প্রতিবেদন দিতে গড়িমসি করছিল। শেষ পর্যন্ত দায়সারা গোছের একটি হালকা তদন্ত প্রতিবেদন দেয়; যাতে ভেজাল প্রমাণে ব্যর্থ হয় তারা। ফলে আট শ শিশুর হত্যার বিপরীতে মাত্র ১০ বছরের কারাদ- হয় আসামিদের। এতে আদালতের কোনো দোষ নেই। তারা যে রিপোর্ট পেয়েছেন, সে অনুযায়ী রায় দিয়েছেন। শেষে গতকাল আরেকবার ব্যর্থ হলো ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর।

ক্ষোভ প্রকাশ করে আ ব ম ফারুক বলেন, তারা কতবার ব্যর্থ হবে। আসলে তারা ভেজালে সাহায্য করে। এভাবে এই প্রতিষ্ঠানকে চলতে দেওয়া যায় না। তারা যদি তাদের ভূমিকা পালন না করে, তাহলে আমরা কোথায় যাব। যারা নি¤œমানের ভেজাল ওষুধ তৈরি করে, এরা সব সময় তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। সরকারের উচিত তদন্ত করে এসব দোষী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করা ও শাস্তি দেওয়া। তাদের গাফিলতির কারণে শিশুর মৃত্যু কাম্য নয়।

এই ওষুধ বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, সাধারণ ভেজাল প্যারাসিটামল খেলেও শিশুদের মারা যাওয়ার কথা নয়। বড়জোর পেট ব্যথা বা বমি হতে পারে। মারা যাওয়ার অর্থই হলো সেই প্যারাসিটামল সিরাপে বিষাক্ত রাসায়নিক ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকোল মেশানো হয়েছে। এটি প্রধানত টেক্সটাইল মিলে কাপড় তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয় ও ট্যানারিতে ব্যবহৃত। এই বিষাক্ত রাসায়নিক ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকোল শিশুদের কিডনি বিকল করে দেয়, ফলে তাদের মৃত্যু হয়। অথচ তারা পরীক্ষা করে পেল না। এটি অবিশ্বাস্য। তার মানে তারা প্রতারণা করেছে।

বিভিন্ন সময় সাজা : দুবছর আগে ভেজাল প্যারাসিটামল ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করার অপরাধে দীর্ঘ ২১ বছর পর ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডফ্লেম ফার্মাসিউটিক্যালসের অন্যতম মালিক, ব্যবস্থাপকসহ তিনজনকে ১০ বছর কারাদ- দেন এ আদালত। একই আদালত ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে ১৯৯২ সালে ৭৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ওষুধ আইনে করা আরেকটি মামলায় বিসিআই ফার্মার ছয় কর্তাব্যক্তিকে ১০ বছর করে কারাদ- দেন। গত বছরের মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে ‘ব্যর্থ’ ২০ কোম্পানির সব ওষুধ এবং ১৪টি কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহ, বিক্রি বন্ধ ও বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

বাজারে ভেজাল ওষুধ : এ বছরের শুরুর দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি তৃতীয়বারের মতো ছোট-বড় ৮৪টি ওষুধ কোম্পানি সরেজমিনে পরিদর্শন করে অধিকাংশগুলোতেই তথৈবচ অবস্থা দেখে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দেশে অর্ধশতাধিক কোম্পানিতে এখনো নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন হচ্ছে। তারা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুসারে যেকোনো ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি) গাইডলাইন অনুসরণের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করে দিলেও এখনো বহুসংখ্যক কোম্পানিতে জিএমপি গাইডলাইন অনুসরণের বালাই নেই। তবে কিছু কিছু কোম্পানি উদ্যোগী হয়ে আগের তুলনায় উন্নতি করেছে। সে সংখ্যা খুবই কম বলে ওই কর্মকর্তারা জানান। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটির সুপারিশে গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা দেখতে পান ট্যানারিশিল্পে রং হিসেবে ব্যবহৃত ডায়াথেলিন গ্লাইকল কেমিক্যালমিশ্রিত প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়েই শিশুদের মৃত্যু হয়। এ ব্যাপারে আ ব ম ফারুক বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ নিয়ে কোনো গবেষণা করা হয়নি। দেশের ১০ শতাংশ ভেজাল ওষুধ বিক্রি হয়। যার মূল্য ১ হাজার কোটি টাকার বেশি।

"