বুদাপেস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের লক্ষ্য পানির সুব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্য বৃদ্ধি

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক
ADVERTISEMENT

হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে আজ থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্ব পানি সম্মেলন। তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষ নেতারা উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় বসবেন। বুদাপেস্ট সম্মেলনের মূল লক্ষ?্য জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পানি ও পয়োনিষ্কাশন-সংক্রান্ত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে করণীয় নির্ধারণ এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত পানি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ।

সম্মেলনে যোগ দিতে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল রোববার সকাল নয়টার দিকে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ একটি ফ্লাইটে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টের উদ্দেশে রওনা হন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, তিন বাহিনীর প্রধান, আইজিপি এবং সংশ্লিষ্ট বেসামরিক-সামরিক কর্মকর্তারা ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান। তবে তাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তুর্কমেনিস্তানের আশখাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কিছু সময়ের জন্য জরুরি অবতরণ করে এবং মেরামত বিমানটি হাঙ্গেরির উদ্দেশে আবার যাত্রা করে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে স্থানীয় সরকার ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররাফ হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল রয়েছে। আগামী বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

হাঙ্গেরিতে এটাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। দেশটির প্রেসিডেন্ট জানোস এডারের আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে তিনি পানি সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। এর আগে গত এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন পানিবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বিশ্ব প্যানেলের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেন শেখ হাসিনাকে। ১০ সদস্যের এ প্যানেল গঠিত হয়েছে রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধানদের নিয়েই। ওয়ার্ল্ড ওয়াটার কাউন্সিলের সদস্যদের নিয়েই তারা বসবেন আলোচনায়। সব দেশে সবকালের জন্য পানিকেই সহযোগিতা, শান্তি ও উন্নয়নের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে টানা তিন দিন কথা বলে তারা একটি বুদাপেস্ট ঘোষণায়ও উপনীত হবেন। আর সেই ঘোষণায় অবধারিতভাবে পানি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) মধ্যে টানা হবে এক সংযোগ রেখা।

পানি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি শেখ হাসিনার এটি দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরও বটে। সম্মেলনের প্রধান উপজীব্য পানি হলেও দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য বৃদ্ধিই মূল লক্ষ্য। সফরে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চারটি বাণিজ্য স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

পানিবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বিশ্ব প্যানেলের সদস্য হিসেবে শেখ হাসিনার সঙ্গে আরো রয়েছেন মরিসাসের প্রেসিডেন্ট আমিনা গারিব, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিয়েতো (এরা দুজন প্যানেলের কো-চেয়ার), অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম ট্রানবুল, হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট জ্যানোস আদের, জর্ডানের প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ এনসুর, নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রাট, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা, সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সল ও তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালিরাহমোন। দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হ্যান সিউং-সু এবং পেরুর পরিবেশমন্ত্রী ম্যানুয়েল পালগার ভিদাল এই প্যানেলের উপদেষ্টা। তাদের পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড ওয়াটার কাউন্সিলের ৩৫০ সদস্য সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা থাকবেন এই বিশ্ব পানি সম্মেলনে। মূলত বিশ্ব ওয়াটার কাউন্সিলের উদ্যোগেই এ শীর্ষ সম্মেলন হচ্ছে, যার পৃষ্ঠপোষকতা করছেন হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট জ্যানোস আদের।

পানি নিয়ে বাংলাদেশের এজেন্ডা : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের ৭০০ কোটি জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বাস এশিয়ায়। কিন্তু ২০৩০ সাল নাগাদ এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পানির চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান দাঁড়াবে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মারাকেশ সম্মেলনে কিছু বিষয়ে জরুরি নজর দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি পানি বিষয়ে টেকসই উন্নয়ন অর্জনে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে সহায়তা করতে একটি বৈশ্বিক তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য এই তহবিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তারা মনে করছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সম্মেলনে পানি নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব কিছু এজেন্ডা রয়েছে। দেশের। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। লবণাক্ত পানির পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে ও সুপেয় পানির আকাল বাড়ছে। পাতালে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। নদীগুলো নাব্যতা হারাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে বাংলাদেশের বড় একটি অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসবই হবে সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এজেন্ডা। সম্মেলনে পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, টেকসই ব্যবস্থাপনা ও সবার জন্য বিশুদ্ধ সুপেয় পানির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, পরিবেশবান্ধব কৃষিসেচ ব্যবস্থাপনা ও পানিদূষণ সহনশীল মাত্রায় নামিয়ে আনার বিষয়ে বর্তমান সরকারের কর্মকা- ও সাফল্য বুদাপেস্ট সম্মেলনে তুলে ধরা হবে।

মূল লক্ষ্য বাণিজ্য বৃদ্ধি : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, হাঙ্গেরি ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধিই হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাঙ্গেরি সফরে মূল লক্ষ্য। হাঙ্গেরির বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করা। বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরির মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১৬ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে দুদেশের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর হাঙ্গেরি সফরের মূল্য লক্ষ্য হবে দুদেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমনÑবাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কৃষি ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার প্রসার এবং হাঙ্গেরির বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করা।

সম্মেলনে যা যা থাকছে : শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি থাকবে অন্তত আরো ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট। ২৯ নভেম্বর থাকবে বিশ্ব পানি সম্মেলন এক্সপোইনোভেশন ডে। তিন দিন ধরেই পাশাপাশি চলতে থাকবে সিভিল ফোরামের কার্যক্রম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফোরামের কার্যক্রম চলবে ২৮-২৯ নভেম্বর, এক্সপো এডুকেশন ডে হিসেবে পালিত হবে ৩০ নভেম্বর দিনটি, উইমেন ফোরামের কার্যক্রম ২৮ ও ২৯ নভেম্বর এবং ইয়ুথ ফোরামের আলোচনা চলবে সম্মেলনের তিন দিন ধরেই।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর পরই বিশ্বনেতারা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে পানির সম্পর্ক টানতে প্যানেল আলোচনায় বসবেন। আর পরের দিকে থাকবে সবার জন্য নিরাপদ ও সামর্থ্যরে মধ্যে সুপেয় পানির সুব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা। আলোচনায় দেশগুলোতে পান করার মতো কী পরিমাণ পর্যাপ্ত পানি রয়েছে, পয়োনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতা এবং উন্নত জনস্বাস্থ্যের জন্য পানির সমাধান স্থান পাবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফোরামে মানবতা ও প্রকৃতির জন্য পানির ভারসাম্য রক্ষা করে এসডিজি অর্জন, আর লবণাক্ত সমুদ্রের স্তর বৃদ্ধি ও নদীর অবক্ষয়Ñএই দুই প্রতিপাদ্যে চলবে আলোচনা। জলবায়ু পরিবর্তনের সাম্প্রতিক প্রভাবগুলো এতে গুরুত্ব পাবে। সিভিল ফোরামে পানি ঘিরে পাল্টে যাওয়া বিশ্বের নানা দিক উঠে আসবে। আর ইয়ুথ ফোরামে পানি নিয়ে যুবশ্রেণির উদ্যোগগুলো তুলে ধরা হবে।

তবে সম্মেলনে সবার চোখ থাকবে ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় পানিসংক্রান্ত ?উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনার দিকে। তাতেই অংশ নেবেন প্যানেল নেতারা আর তাদের আলোচনার ঘুরপাক খাবে প্রতিটি বিন্দু পানির সুব্যবস্থাপনা নিয়ে। তারা মানুষ ও পৃথিবী উভয়ের জন্য পানির মান উন্নয়ন নিয়েও কথা বলবেন। ভাবনা প্রকাশ করবেন বিশ্বটাকে আরো সবুজ করে কীভাবে গড়ে তোলা যায় সে নিয়েও। এ সম্মেলনে পানি সম্পর্কিত সমস্যার সমাধানে নতুন নতুন উদ্ভাবনগুলো তুলে ধরা হবে আর পাশাপাশি পানি সম্পর্কিত শিক্ষা কার্যক্রমগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাও প্রদর্শিত কিংবা উপস্থাপিত হবে এ আয়োজনে।

প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি : আজ সকালে পানি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পর পরই হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সঙ্গে কসুদ স্কয়ারে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। এরপর বেশ কয়েকটি চুক্তি সই হবে। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রী যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন। হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য সম্মানীয় অতিথির সঙ্গে সাসটেইনেবল ওয়াটার সলিউশন এক্সপো পরিদর্শন করবেন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ-হাঙ্গেরিয়ান বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক ফোরামের উদ্বোধন করবেন বলেও জানা গেছে। রাতে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ফোর সিজন্স হোটেল গ্রিসহাম প্যালেস বুদাপেস্টে থাকবেন।

মঙ্গলবার শীর্ষ সম্মেলনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন শেখ হাসিনা। প্রেসিডেন্ট জানোস এডার আমন্ত্রণে ওয়ার্কিং মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। বিকালে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট জানোস এডার সঙ্গে সান্দর প্রেসিডেনশিয়াল প্রাসাদে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া হাঙ্গেরির শহীদদের স্মৃতির প্রতি হিরোজ স্কয়ারে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন শেখ হাসিনা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা, পানিব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সহযোগী ও কৃষি বিষয়ে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) ও হাঙ্গেরিয়ান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হবে।

"