যে জীবন মাথা নোয়াবার নয়

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক
ADVERTISEMENT

কিউবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ওরিয়েন্তে প্রদেশে ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করা ফিদেল কাস্ত্রো। বিরান শহরের কাছে ধনী চিনিকল মালিক অ্যাঞ্জেল কাস্ত্রো রুস ও লিনা রুস গঞ্জালেসের ঘরে জন্ম ফিদেলের। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় ফিদেল ভাই রাউল ও র‌্যামন ছাড়াও বড় হয়েছেন বোন অ্যাঞ্জেলা, এমা ও অগাস্টিনার সাহচর্যে।

ফিদেলের পড়াশোনা শুরু হয় প্রাইভেট জেসুইট বোর্ডিং স্কুলে; এরপর সান্তিয়াগোর ডলোরস কলেজ এবং হাভানার

বেলেন কলেজ পেরিয়ে কাস্ত্রো ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব হাভানার ল’ স্কুলে। ১৯৪৭ সালে ডমিনিকান রিপাবলিকে তখনকার স্বৈরশাসক রাফায়েল ত্রুজিলোকে উৎখাতে এক বিদ্রোহে অংশ নেন ফিদেল। তাতে ব্যর্থ হলেও দমে যাননি তিনি। পরের বছর চলে যান কলম্বিয়ার বোগোতায়। সেখানে তাকে দেখা যায় সরকারবিরোধী দাঙ্গায়।

একই বছর কাস্ত্রো যোগ দেন সংস্কারপন্থি দল ‘পার্টি দো অর্তোদক্সো’তে (অর্থোডেক্স)। কমিউনিস্টবিরোধী ওই দলের প্রার্থী এদুয়ার্দো চিবা ১৯৪৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও ফিদেল তাকে পুনরায় নির্বাচন করতে প্রেরণা জোগান।

ওই সময়ই মার্কসবাদে আকৃষ্ট হন ফিদেল; একই সঙ্গে কিউবান কংগ্রেস নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ১৯৫২ সালে জেনারেল বাতিস্তা নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে পরবর্তী নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করলে কাস্ত্রো ও তার দলের কয়েক সদস্য মার্কিন মদদপুষ্ট স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাতে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন।

এজন্য তারা ‘দ্য মুভমেন্ট’ নামে একটি গ্রুপ গঠন করেন। ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই দ্য ?মুভমেন্টের ১৫০ সদস্য কিউবার সান্তিয়াগোতে থাকা মানকাদা মিলিটারি ব্যারাকে আক্রমণ করে।

ওই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে বাতিস্তা সরকার কাস্ত্রোকে বন্দি করে। এরপর এক ‘প্রহসনের’ বিচারে তাকে ১৫ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। বিচারকালে ফিদেলের ভাষণ তাকে তুমুল জনপ্রিয় করে তোলে। ওই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে অপরাধী বানাতে পারো, কিন্তু ইতিহাস আমাকে মুক্তি দেবে।’

জেলে থাকার সময় ফিদেল তার দলের নাম বদলে রাখেন ‘টুয়েন্টি সিক্সথ অব জুলাই মুভমেন্ট’। দুই বছর পর এক ?চুক্তির বলে মুক্তি পেয়ে সহযোগীদের নিয়ে মেক্সিকোয় পাড়ি জমান ফিদেল। মেক্সিকোতেই ফিদেল, রাউল ও চে পরিকল্পনা করেন কিউবায় পুনরায় ফিরে গিয়ে বাতিস্তা সরকার উৎখাত করবেন। ১৯৫৬ সালের ২ ডিসেম্বর ফিদেল আর তার ৮১ জন সহযোগী অস্ত্রশস্ত্রসহ ছোট্ট নৌকা ‘গ্রানমা’য় চেপে কিউবার উত্তরাঞ্চলের মানজানিলোতে নামার পরিকল্পনা করেন।

চূড়ান্ত লড়াইয়ে ১৯৫৯-এর জানুয়ারিতে কিউবা দখলে নেয় ‘টুয়েন্টি সিক্সথ অব জুলাই মুভমেন্ট’; বাতিস্তা পালিয়ে আশ্রয় নেন ডমিনিকান রিপাবলিকে। ফিদেল কাস্ত্রোর সমর্থন নিয়ে ওই বছরই প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ম্যানুয়েল উরুতিয়া; হোসে মিরো কর্দোনা হন প্রধানমন্ত্রী। ফিদেলকে দেওয়া হয় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব। পরের মাসেই মিরো পদত্যাগ করলে প্রধানমন্ত্রী হন ফিদেল। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কারখানা এবং খামারগুলোকে জাতীয়করণ করেন তিনি, করেন ভূমি সংস্কার।

দীর্ঘদিনের দেশ পরিচালনা : প্রায় ৫ দশক ধরে কিউবা শাসন করেছেন ফিদেল কাস্ত্রো। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকা বিশ্বনেতাদের নামের তালিকায় তার অবস্থান তৃতীয়। তার আগে নাম রয়েছে ব্রিটিশ রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং থাই রাজা ভুমিবলের। ২০০৬ সালে অন্ত্রে অস্ত্রোপাচারের পর সাময়িকভাবে ছোটভাই রাউল কাস্ত্রোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি। আর ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ফিদেল।

দীর্ঘ ভাষণ : জাতিসংঘে দীর্ঘ ভাষণ দেওয়ারও রেকর্ড রয়েছে ফিদেল কাস্ত্রোর। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ৪ ঘণ্টা ২৯ মিনিট ধরে ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৯৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশের জাতীয় পরিষদ তাকে পরবর্তী ৫ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট পুনর্র্নির্বাচিত করার পর ৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের ভাষণ দিয়েছিলেন ফিদেল।

হত্যাচেষ্টা থেকে প্রাণে রক্ষা : কাস্ত্রোর দাবি অনুযায়ী, তিনি ৬৩৪টি হত্যা পরিকল্পনা এবং চেষ্টা থেকে রেহাই পেয়েছেন। এগুলোর বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহিষ্কৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর ষড়যন্ত্র ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। বিষাক্ত ওষুধ, বিষাক্ত চুরুট কিংবা বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত সাঁতারের পোশাকসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছিল। আরেকটি পরিকল্পনার অভিযোগ করা হয়ে থাকে। সেটি হলোÑ ফিদেলকে এমন পাউডার দেওয়া যাতে তার দাড়ি পড়ে গিয়ে জনপ্রিয়তা কমে যায়। বিভিন্ন হত্যাচেষ্টার পরও নিজের ক্ষমতাকালীন নয়জন প্রেসিডেন্টকে বদল হতে দেখেছেন তিনি। ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার থেকে বিল ক্লিনটন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রেসিডেন্টকে দেখেছেন তিনি। জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ক্ষমতায়, তখন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ফিদেল।

শেষ দিকের বছরগুলো : জীবনের শেষ দিকের বছরগুলোতে জনসমক্ষে খুব কমই এসেছেন ফিদেল। মাঝে মাঝে ভিডিও কিংবা ছবিতে দেখা যেত তিনি অতিথিদের সঙ্গে দেখা করেছেন। অফিশিয়াল মিডিয়ায় তিনি শত শত কলাম লিখেছেন। দুর্বল হয়ে পড়া এবং হাঁটতে কষ্ট হওয়া ফিদেলকে ২০১২ সালে দুইবার এবং ২০১৩ সালে দুইবার জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। ২০১৪ সালের ৮ জানুয়ারি একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্বোধনীতে আবারো তাকে দেখা যায়। গত এপ্রিলে দেশের কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশের শেষ দিনে তার ভাষণটিও তেমনই একটি বিরল ঘটনা ছিল।

 

 

"