বিশ্বসাম্যের মহানায়কের প্রস্থান

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

রুবাইয়া হাসনাত বর্ণা
ADVERTISEMENT

গালভর্তি দাঁড়ি। হরদম চলছে চুরুট ফোঁকা। সামরিক পোশাকে চলাফেরা। মুখে সেøাগান : ‘হয় সাম্যবাদ, নয় মৃত্যু’। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর নাম শুনলেই এমন ছবি চোখে ভেসে ওঠে। সেই ছবি এখন শুধুই ছবি। বাস্তবে তিনি আর নেই। বিশ্বজুড়ে সাম্যবাদের স্বপ্নচারীদের নায়ক, কিউবার এই মহান বিপ্লবী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে (গ্রীনিচ মান সময় শনিবার ৩:২৯) হাভানায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই রাউল কাস্ত্রো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ঘোষণা করেন, স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ১০টা ২৯ মিনিটে কাস্ত্রো মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর অর্ধশতক কাল দেশ শাসন করে ২০০৮ সালে ক্ষমতা ছোটভাই রাউল কাস্ত্রোকে ছেড়ে দিয়ে অবসরে ছিলেন ফিদেল। যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সমাজতান্ত্রিক কিউবা প্রতিষ্ঠাকারী ফিদেল সারা বিশ্বে সমাজতন্ত্রের আন্দোলনকারীদের চোখে ছিলেন বীর। কিউবার অধিকাংশ মানুষ দেশটি দেশের মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নায়ক হিসেবে দেখেন ফিদেলকে। অন?্যদিকে বিরোধিকারীদের চোখে তিনি হলেন ভিন্নমত দমনকারী। বাংলাদেশসহ স্বাধীনতাকামী বহু দেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকারীদের কাছেও শ্রদ্ধার পাত্র ফিদেল। বাংলাদেশ সরকার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিন বছর আগে তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননায়’ ভূষিত করে। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন এই বিপ্লবী নেতা।

যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় বামপন্থী নেতৃত্বের উত্থান ভালোভাবে নেয়নি সেই দেশটি। কাস্ত্রোকে বহুবার হত্যাচেষ্টা করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। স্বাস্থ্যগত কারণে ২০০৬ সাল থেকে কাস্ত্রোর জনসমক্ষে আসা কমতে থাকে। ভাই রাউল কাস্ত্রোর কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পর থেকেই ফিদেলকে জনসমক্ষে খুবই কম দেখা যেত। তবে বেশ কয়েকবার মৃত্যু রটনার পর প্রকাশ্য হয়ে জানান দিতেন, তিনি এখনো বেঁচে আছেন।

এ বছর দুইবার প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল তাকে। গত এপ্রিলে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে ভাষণে তিনি নিজের শারীরিক অবস্থার কথা তুলে সমর্থকদের প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, ‘কিছুদিনের মধ্যে ৯০ পার করব, এটা আমি ভাবিনি।’ বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্টদের দুর্দিনের মধ্যে কংগ্রেসে ভাষণে তিনি কিউবাবাসীদের উদ্দীপ্ত করে বলেছিলেন, ‘কমিউনিজম এখনো প্রাসঙ্গিক, কিউবা বিজয়ীই থাকবে।’ এরপর আগস্টে নিজের ৯০তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এসে সবাইকে নিয়ে কেক কেটেছিলেন ফিদেল, দিয়েছিলেন বক্তৃতা।

১৯২৬ সালে কিউবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ওরিয়েন্তে প্রদেশে জন্ম ফিদেলের। সমাজতন্ত্রের আদর্শে দীক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একপর্যায়ে ১৯৫৩ সালে কারাগারে যেতে হয়েছিল তাকে। ১৯৫৫ সালে মুক্তির পর বন্ধু আরেক কমিউনিস্ট বিপ্লবী চে গুয়েভারাকে নিয়ে গেরিলাযুদ্ধ শুরু করেন ফিদেল, উদ্দেশ্য বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত। ১৯৫৯ সালে তাতে সফল হওয়ার পর কিউবার প্রধানমন্ত্রী হন ফিদেল কাস্ত্রো; কিউবায় সফল হওয়ার পর চে গুয়েভারা পাড়ি জমান অন্য দেশেও একই ধরনের বিপ্লবে, তবে বলিভিয়ায় মারা পড়েন তিনি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নানা ষড়যন্ত্র রুখে ফিদেল কিউবাকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে মনোযোগী হন। ১৯৭৬ সালে কিউবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তিনি। প্রায় অর্ধশতক বছর দায়িত্ব সামলানোর পর ২০০৮ সালে ভাই রাউল কাস্ত্রোর হাতে প্রেসিডেন্ট পদটি ছেড়ে দিয়ে অবসর কাটাচ্ছিলেন ফিদেল। তবে এর মধ্যেও নিয়মিত লিখতেন তিনি।

কেমন মানুষ ছিলেন : সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি কিউবার প্রধানমন্ত্রী হন ফিদেল কাস্ত্রো। এরপর বহুবার তাকে হত্যা করার চেষ্টা চলে। ১৯৬১ সালে কিউবায় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ব্যর্থ সেনা অভিযান ‘বে অব পিগস’ চলে। যুক্তরাষ্ট্রের একের পর ষড়যন্ত্রের মুখে ১৯৮৮ সালে কাস্ত্রো ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রই আমাকে কিংবদন্তী করে তুলেছে।’ ১৯৬২ সালে কিউবার ভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের (কিউবান মিসাইল ক্রাইসিসের) কেন্দ্রে ছিলেন কাস্ত্রো। ওয়াশিংটনের কর্মকা-ের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কথা সব সময়ই বলতেন কাস্ত্রো। বৃদ্ধ বয়সেও তাকে একই ভূমিকায় দেখা গেছে। ২০০৬ সালে কাস্ত্রোর অস্ত্রোপচার হয়। এরপর অসুস্থতা তাকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে ফেলে।

জীবনভর কাস্ত্রো দেখিয়েছেন, বিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তির বিরুদ্ধেও ক্ষুদ্র জাতি কীভাবে প্রতিবাদ জানাতে পারে। অন্যায়-অত্যাচারকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারে।

১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কাস্ত্রোর জন্ম হয়। তার বাবা ছিলেন অভিবাসী স্প্যানিশ এবং মা কিউবার নাগরিক। ছোটবেলা থেকে খুব দ্রুত সবকিছু শিখতে পারতেন কাস্ত্রো। বেসবল খেলাতেও ছিল উৎসাহ। কথিত আছে, ইউএস বিগ লিগে খেলার স্বপ্ন ছিল কাস্ত্রোর।

যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বাতিস্তা সরকার ১৯৫২ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন কাস্ত্রো। ১৯৫৩ সালে ছোট বিদ্রোহী বাহিনী গঠন করেন তিনি। বাতিস্তা সরকারকে উৎখাতে সেনাবাহিনীর মোংকাদা ব্যারাকে হামলা করে তার নেতৃত্বাধীন ওই বিদ্রোহী বাহিনী। কিন্তু সেটি ব্যর্থ হয়। পরিণামে তাকে কারাগারে যেতে হয়। এতে বিচলিত ছিলেন না কাস্ত্রো। বলতেন, ইতিহাস তাকে গ্লানি থেকে মুক্ত করবে। বাতিস্তা সরকারের সময় দুই বছর কারাগারে থাকার পর কাস্ত্রো মেক্সিকোয় নির্বাসনে যান। ১৯৫৫ সালে বন্ধু আরেক কমিউনিস্ট বিপ্লবী চে গুয়েভারাকে নিয়ে গেরিলাযুদ্ধ শুরু করেন ফিদেল কাস্ত্রো। বাতিস্তা সরকারকে উৎখাতের পর ১৯৫৯ সালে কিউবার প্রধানমন্ত্রী হন কাস্ত্রো। ১৯৭৬ সালে কিউবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবন : ১৯৪৮ সালে মির্তা দিয়াজ বালার্তকে বিয়ে করেন কাস্ত্রো। তাদের সংসারে ফিদেলিতো নামের এক ছেলে রয়েছে। পরে মির্তার সঙ্গে কাস্ত্রোর বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৫২ সালে নেরি রেভুয়েলতা নামের এক চিকিৎসককে বিয়ে করেন কাস্ত্রো। ১৯৫৬ সালে তাদের সংসারে আসে কন্যাসন্তান আলিনা। ১৯৫৭ সালে সেলিয়া সানচেজের সঙ্গে পরিচয় হয় কাস্ত্রোর। তিনি বলতেন, সেলিয়াই তার জীবনের ভালোবাসা। ১৯৮০ সালে মারা যান সেলিয়া। এরপর কাস্ত্রোর জীবনসঙ্গী হন ডালিয়া সোতো ডেল ভাল্লে। তাদের সংসারে পাঁচ সন্তানÑ অ্যাঞ্জেল, অ্যান্তোনিও, আলেজান্দ্রো, অ্যালেক্সিস ও অ্যালেক্স।

 

 

"