হাসপাতাল ছাড়লেন খাদিজা

‘ভালো আছি দোয়া চাই’

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক
ADVERTISEMENT

ছাত্রলীগ নেতার ধারালো অস্ত্রের আঘাত থেকে প্রায় সুস্থ হয়ে ওঠা সিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস প্রথমবারের মতো কথা বলেছেন গণমাধ্যমের সামনে। নিজের সুস্থতার কথা জানানোর পাশাপাশি সংবাদকর্মী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। গতকাল শনিবার রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিচতলায় খাদিজাকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন তার চিকিৎসক। সেখানে হুইলচেয়ারে বসে কথা বলেন তিনি। তিনি সবার কাছে দোয়া ছেয়েছেন। দুই দিন আগে গত বৃহস্পতিবার ভাই শরনান হক শাহীন নিজের ফেসবুক পাতায় খাদিজার একটি ছবি প্রকাশ করে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির কথা জানিয়েছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে খাদিজা বলেন, ‘আপনাদের দোয়ায় সুস্থ আছি, ভালো আছি। দোয়া করবেন যেন ভালো থাকি। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারি। মিডিয়ার ভাইদের ধন্যবাদ, আপনারা আমার জন্য অনেক করেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও ধন্যবাদ।’

খাদিজার চিকিৎসক জানান, গতকাল শনিবারই খাদিজাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা হবে, তবে তিনি হাসপাতাল ছাড়বেন আজ রোববার। আঘাতের কারণে এখনো অবশ হয়ে থাকা বাম হাত ও পায়ের চিকিৎসার জন্য সোমবার তাকে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর কথা রয়েছে। গত ৩ অক্টোবর সিলেটের এমসি কলেজ কেন্দ্রে স্নাতক পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে হামলার শিকার হন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক (পাস কোর্স) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী খাদিজা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলমের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার মাথার খুলি ভেদ করে মস্তিষ্কও জখম হয়। ঘটনার পর রাজধানীতে এনে প্রথম দিকে খাদিজাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। তিন দফা অস্ত্রোপচার হয়। অবস্থার উন্নতি হওয়ায় গত ১৩ অক্টোবর তার লাইফ সাপোর্ট খোলা হয়। এর সাত দিনের মাথায় খাদিজাকে হুইলচেয়ারে করে কিছুক্ষণ ঘোরানো হলেও সে সময় তিনি কাউকে চিনতে পারছিলেন না বলে তার স্বজন ও চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন। হামলার দেড় মাসের বেশি সময় পর গত বৃহস্পতিবার খাদিজার সুস্থতার কথা জানা যায় তার ভাই শাহীনের ফেসবুক পাতা থেকে, যেখানে হাসপাতালের বিছানায় বসা বোনের একটি ছবিও দেওয়া হয়।

খাদিজাকে হাসপাতালে আনার পর থেকে তার চিকিৎসার আদ্যোপান্ত সংবাদ সম্মেলনে জানান স্কয়ার হাসপাতালের পরিচালক (মেডিক্যাল সার্ভিসেস) মির্জা নাজিমউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ইমার্জেন্সিতে খাদিজার জিসিএস ছিল মাত্র ৫, সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় এবং বাঁচার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হওয়ায় ইমার্জেন্সিতে তাকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (সিসিইউ) পাঠানো হয়। সেখানে সিটি স্ক্যান করে দেখা যায় যে, তার স্কাল বোন বিস্তৃতভাবে থ্যাঁতলানো এবং ব্রেনের অন্যান্য অংশ গুরুতরভাবে আক্রান্ত এবং মিডলাইন থেকে সরে গেছে। কালক্ষেপণ না করে সেদিনই তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। সেখানে নিউরোসার্জারি বিভাগের কনসালট্যান্ট এ এম রেজাউস সাত্তারের নেতৃত্বে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি জেনেও মস্তিষ্কে ডিকমপ্রেসিভ সার্জারি করা হয়।’

এরপর থেকে খুব ধীরে হলেও তার তার উন্নতি পরিলক্ষিত হয় বলে চিকিৎসক মির্জা নাজিম বলেন, ‘১৭ অক্টোবর অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে খাদিজার ডান হাতে মাল্টিপল ফেক্সর টেন্ডর রিপেয়ার করা হয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকার সময় একপর্যায়ে তার ট্রাকেসটমি করা হয়, যা ১৯ অক্টোবর বন্ধ করে এইচডিইউতে স্থানান্তর করা হলেও আশঙ্কামুক্ত ছিলেন না এই কলেজছাত্রী।’

এরপর ৭ নভেম্বর অর্থোপেডিক এবং নিউরোসার্জারি বিভাগ একসঙ্গে মস্তিষ্কের হাড় পুনঃস্থাপন ও হাতে সার্জারি করে। সে এখন নিজে খেতে পারে, কোনো লেখা পড়তে পারে, ধরে ধরে হাঁটতে পারে। মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেহেতু তার জেনারেল ও নিউরাল অবস্থা এখন ভালো, তাই তাকে ডিসচার্জ দেওয়া এবং ভালো কোথাও রিহ্যাব ফিজিওথেরাপি দেওয়া দরকার। ডা. নাজিম বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে যে খাদিজা অমানবিকতার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল, সেই খাদিজাই এখন বাংলাদেশে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’

 

 

"