রোহিঙ্গাদের শত্রু?

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম ব্যুরো
ADVERTISEMENT

অসিন উইরাথু। একজন বৌদ্ধভিক্ষু। মুসলিমবিরোধী আন্দোলনের আধ্যাত্মিক নেতা। বক্তৃতা দিয়ে মুসলিম নিপীড়নে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কিন্তু তিনি নিজেকে দাবি করেনÑ বৌদ্ধধর্মের শান্তিপূর্ণ প্রচারক হিসেবে। তবে তিনি মুসলমানদের ‘শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করে বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে বক্তৃতা করেন।

মৌলবাদী, সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাকে নিয়ে ইতিমধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২০০৩ সালের জুন মাসের টাইম ম্যাগাজিনের কভার পেজে তাকে নিয়ে ‘দ্য ফেস অব বুদ্ধিস্ট টেরর!’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি তাকে নিয়ে ‘অসিন উইরাথু : মিয়ানমার অ্যান্ড ইটস ভিট্রিওলিক মার্নক’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি।

১৯৬৮ সালের ১০ জুলাই মিয়ানমারের মান্দালয় রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন অসিন উইরাথু। তিনি ১৪ বছর বয়সে স্কুল ত্যাগ করেন এবং সন্ন্যাসী জীবনে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে তিনি বৌদ্ধদের মধ্যে সুপরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে ২০০১ সালে এসে প্রভাবশালী ভিক্ষু অসিন উইরাথু মুসলিমবিদ্বেষী সংগঠন ৯৬৯ গ্রুপের সঙ্গে জড়িত হয়ে ধর্মীয় উসকানি ছড়াতে শুরু করেন। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন পক্ষের চাপে ২০০৩ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

এ সময় তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২৫ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। এরপর ২০১০ সালে অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দিদের সঙ্গে কারাগার থেকে তিনিও মুক্তি পান। এরপর নিজেকে মিয়ানমারের ‘ওসামা বিন লাদেন’ বলে দাবি করেন অসিন উইরাথু। অভিযোগ রয়েছেÑ বর্তমান মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় তিনি ও তার সংগঠন ৯৬৯ গ্রুপ মুসলিম নিধনে উঠে পড়ে লেগেছে।

গতকাল শনিবার উইরাথুর ফেসবুক ওয়ালে গিয়ে দেখা গেছে, ‘দ্য ভয়েস মিয়ানমার ডটকম’ নামের একটি সাইটের নিউজ শেয়ার করেছেন তিনি। ওই নিউজটাতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনের তথ্য বার্মিজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। ফেসবুকে সক্রিয় উইরাথু, তার ধর্মীয় নানা কার্যক্রমের ছবি ও তথ্য শেয়ার করছেন। তার এসব ফেসবুক পোস্ট অসংখ্য অনুসারী লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করছেন।

বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছেন উইরাথু। তার এ রকম কিছু উক্তি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ ‘তুমি দয়ামায়া ভালোবাসাই পরিপূর্ণ হতে পারো কিন্তু মুসলিমদের মতো পাগলা কুকুরদের সঙ্গে ঘুমাতে পারো না!’, ‘আমরা যদি দুর্বল হয়ে যাই, তাহলে আমাদের ভূমি একদিন মুসলিমদের হয়ে যাবে!’, ‘পাগলা কুকুরদের সঙ্গ ছাড়ো, যেখানে পাও সেখানে মারো!’ ‘ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক শুধু বৌদ্ধদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে’।

শান্তিকামী বলেই সারা বিশ্বে গৌতমবুদ্ধের প্রচারিত আদর্শ জনপ্রিয়তা লাভ করে। জীব হত্যাকে গুরুতর পাপ মনে করতেন গৌতমবুদ্ধ। অনুসারীদের জীব হত্যা থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোর আদেশ দিয়েছেন তিনি। কিন্তু তার উত্তরসূরিদের অনেকেই এখন মানুষের হত্যাকারীতে পরিণত হয়েছে।

ইতিহাসবিদরা বলছেন, ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করার পর পার্লামেন্টের উল্লেখযোগ্য আসন দখল করে রোহিঙ্গা মুসলিমরা। এরপর ১৯৬২ সালে ক্ষমতা দখল করে চরম মুসলিমবিদ্বেষী জেনারেল নে উঈন। এরপর থেকে মিয়ানমারের মুসলমানদের ওপর নেমে আসে অত্যাচার-নির্যাতন। ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, সেদিন পর্যন্ত মিয়ানমারে ২ লাখ ৪০ হাজার মুসলমান হত্যা করা হয়।

দেশে দেশে প্রতিবাদ : মিয়ানমারে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও এর জেরে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানের বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হওয়ার ঘটনায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হচ্ছে, গত শুক্রবার মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তারা চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানানোর জন্য অচিরেই কুয়ালালামপুরে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করবে। তবে কবে এটা করা হবে তার সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।

মিয়ানমারে সহিংসতার প্রতিবাদে একটি আঞ্চলিক টুর্নামেন্ট থেকে দল প্রত্যাহারের কথাও ভাবছিল মালয়েশিয়া, কিন্তু পরে সেই চিন্তা থেকে সরে আসে তারা। শুক্রবার কুয়ালালামপুরে শত শত রোহিঙ্গা মুসলমান একটি বিক্ষোভে যোগ দেয়। কুয়ালালামপুরে মিয়ানমার দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভরত একদল রোহিঙ্গাকে দেখা যায় অং সান সু চির ছবিতে জুতা দিয়ে আঘাত করতে। প্রতিবাদ হয়েছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক এবং ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায়। জাকার্তার বিক্ষোভকারীরা মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেতা অং সান সু চির নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, অং সান সু চির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ডেভিড ম্যাথিয়েনসন বলছেন, রোহিঙ্গাদের পক্ষে কথা বলতে সুচির ব্যর্থতার কারণে যারা তাকে মানবাধিকারের প্রতীক বলে মনে করত, তারা বিভ্রান্ত হচ্ছে। তবে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সু চি মুখে কুলুপ এঁটে থাকায় কেউ কেউ বলছেন, এতে প্রমাণ হচ্ছে সেনাবাহিনীর ওপর অং সান সু চির কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। সূত্র : বিবিসি বাংলা।

 

 

"