গৃহবিবাদ মেটাতে ব্যস্ত দুই প্রার্থী

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ
ADVERTISEMENT

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচন নিয়ে মুখর জেলার রাজনীতি। দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি শিবিরে চলছে জোর নির্বাচনী তৎপরতা। নানা হিসেব-নিকেশ করছেন সমর্থক-সাধারণ ভোটাররাও। দুই দলই চাইছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল কাটিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে নির্বাচনী প্রচারণায় নামাতে। কিন্তু বেগ পেতে হচ্ছে দুই প্রার্থীকেই। অবশ্য সেদিক থেকে কিছুটা এগিয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী সদ্য বিদায়ী মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কড়া নির্দেশ থাকায় ইতোমধ্যেই দলের মধ্যে ঐক্যের সুর বাজতে শুরু করেছে। তবে বিপাকে পড়েছেন বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন। দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা থাকায় নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করতে ঘাম ছুটছে তার।

অন্যদিকে, এ নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদায় নেওয়ার আগে এটিই তাদের শেষ নির্বাচন। সুতরাং ইসিও চাইবে না এ নির্বাচনকে ঘিরে তাদের বিদায়টাও বিতর্কের হোক।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপিকে আপাতত কিছুটা দুর্বল ও অগোছালো মনে হলেও দলটি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবে। কারণ এ নির্বাচন এই দলের জন্য ভাবমূর্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে দলের মধ্যে ঐক্য আনতে না পারলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে জিততে বেগ পেতে হবে। তারা এ নির্বাচনকে কেন্দ্র যেকোনো ধরনের সহিংসতা বন্ধে সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

নাসিক নির্বাচনের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে সর্বশেষ এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ২২ ডিসেম্বর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

নৌকার পক্ষে ঐক্য : নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের মধ্যে দুই পক্ষ স্পষ্ট। স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান ও সাবেক মেয়র আইভীপন্থির মধ্যেকার এই দ্বন্দ্বও অনেক পুরনো। দুই পক্ষের মধ্যেকার এ দ্বন্দ্ব সারা দেশের মানুষও কমবেশি জানেন। শেষ নাসিক নির্বাচনেও এ দ্বন্দ্বকে চ্যালেঞ্জ করেই দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া সত্ত্বেও মেয়র নির্বাচিত হন আইভী। এমনকি এবারো প্রথম দিকে স্থানীয়ভাবে যে তিন প্রার্থীর নাম সুপারিশ করেছিলেন শামীম ওসমান প্রভাবিত জেলা কমিটি, সেখানে আইভীর নাম ছিল না। পরে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে আইভীকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন। এ নিয়ে দেখা দেওয়া দ্বন্দ্ব মেটাতে গণভবনে দুই পন্থিদের নিয়ে বৈঠকও করেন তিনি।

স্থানীয় দলীয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী আইভীর পক্ষে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন গত বুধবার। সেখানে শামীম ওসমান ঘোষণাও দিয়েছেন কাজ করার। গতকাল পর্যন্ত এ নিয়ে ভিন্ন কোনো মত শোনা না গেলেও ঠিক কতটা ঐক্য তা বোঝা যাচ্ছে না। শামীম ওসমান গতকাল পর্যন্ত নির্বাচনের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে স্থানীয় নেতারা বলছেন, তারা নৌকার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ।

এ ব্যাপারে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, আইভীর জন্য নয়, দলীয় প্রার্থীর জন্য কাজ করব। আনোয়ার গত নির্বাচনে আইভীর পক্ষে থেকে তার প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে এখন তার অবস্থান আইভীর প্রতিপক্ষ শামীম শিবিরে। মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহাও বলেছেন ব্যক্তি আইভী নয়, নৌকা প্রতীকের পক্ষে কাজ করব। সিদ্ধিরঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান বলেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা আইভীকে মনোনয়ন দিয়েছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবেই কাজ করব। সিদ্ধিরগঞ্জের নেতাকর্মীদের ডেকে আইভীর পক্ষে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

মাঠে থাকতে চায় বিএনপি : জয়-পরাজয় যাই হোক, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে থাকতে চায় বিএনপি। আইভীর তুলনায় সাখাওয়াত অনেকটা দুর্বল হলেও বিএনপি চাইছে না ফাঁকা মাঠে আওয়ামী লীগকে ছেড়ে দিতে। বিশেষ করে ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রগুলোকে কড়া নজরদারির মধ্যে রাখতে চাইছে দলটি। এ জন্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়ভাবে মনিটরিং টিম গঠনসহ নানা প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম যেমন থাকবে, তেমনি স্থানীয়ভাবে প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিটি গঠন করা হবে। কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম স্থানীয় টিমকে নির্বাচনী প্রচারে নানা পরামর্শ দেবে। দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গত নাসিক নির্বাচন থেকে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়িয়েছিল বিএনপি। এবার সেটি না করে নির্বাচনে থাকার ইচ্ছে রয়েছে।

এ ব্যাপারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচনে জয়ের জন্যই অংশ নিচ্ছি। নারায়ণগঞ্জের মানুষ ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা চাই নির্বাচন কমিশন নির্বিঘেœ ভোটারদের তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দেবে।

দলীয় সূত্র জানায়, প্রথমে বিএনপির পছন্দের তালিকায় ছিলেন তৈমূর আলম খন্দকার। কিন্তু তার অনীহার কারণে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও ক্লিন ইমেজের অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। নির্বাচনে জয়-পরাজয় যাই হোক, তাকে কাজে লাগাতে চায় বিএনপি। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে দুইভাবে লাভবান হবে বিএনপি। একদিকে তারা জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলকে বোঝাতে সক্ষম হবে সরকারের জনপ্রিয়তা নিম্নমুখী এবং গায়ের জোরে তারা ক্ষমতায় রয়েছে। একইভাবে ইসি পুনর্গঠনে খালেদা জিয়ার প্রস্তাবের পক্ষে জনমত বা আন্দোলন গড়ে তোলা দলটির জন্য সহজ হবে।

তবে দলের স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে দলীয় প্রার্থী সাখাওয়াতকে। মনোনয়ন নেওয়া ও জমা দেওয়ার দিন সবাইকে দেখা গেলেও গত দুই দিনে এসব নেতাদের খোঁজ পাচ্ছেন না তিনি। আনুষ্ঠানিকভাবে তার পক্ষে এখন পর্যন্ত কেউ নামেননি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলা ও মহানগর কমিটি নিয়ে দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব এখনো কাটেনি। অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থী ছিলেন। এ নিয়ে স্থানীয় দুই গ্রুপের সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা ছিল। ফলে দলের নেতারা চাইছেন তিনি তাদের কাছে সহযোগিতার জন্য ধরনা দিক।

এ ব্যাপারে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, দলীয় মনোনয়ন পেয়েছি। দলের চেয়ারপারসনের নির্দেশ রয়েছে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার। আমরা সেভাবেই করছি। প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নামব।

জনপ্রিয়তার পাল্লা কার ভারী : আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকে নিজ নিজ প্রার্থীর জনপ্রিয়তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে। আইভীর পক্ষ নিয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জে ব্যক্তি আইভীর এবং তাদের পরিবারের ইতিবাচক ভাবমূর্তি আছে। গত পাঁচ বছর মেয়র থাকাকালে তিনি অনেক উন্নয়নকাজ করেছেন। আর বর্তমান সরকার সারা দেশে উন্নয়নকাজ করছে। আইভীর ভাবমূর্তি আর নৌকা প্রতীক এখানে এবার আওয়ামী লীগকে বড় জয় এনে দেবে। অন্যদিকে, বিএনপি মনে করছে, মানুষ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ। আর নারায়ণগঞ্জে সাত খুনসহ নানা ঘটনায় নানাভাবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা সমালোচিত। কাজেই নারায়ণগঞ্জে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তবে বিএনপির প্রার্থীই জয়ী হবেন।

তবে স্থানীয়দের অভিমত হলোÑ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বরাবরই নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। ২০১১ সালে সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভী এক লাখের বেশি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। নৌকা প্রতীক পাওয়ায় এবার আগের চেয়েও বেশি ভোট পাবেন। এ ব্যাপারে সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, আমি এলাকার মেয়ে। এখানে আমাকে সবাই চুনকার (আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা আলী আহমেদ চুনকা) মেয়ে হিসেবে ছোটবেলা থেকেই চেনেন। মেয়র হিসেবে আমাকে দেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার আমাকে নৌকা দিয়েছেন। তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও খুশি। আমি বিশ্বাস করি, আগামী ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জবাসী আইভীকে ও নৌকাকে তাদের রায় দেবেন।

অবশ্য পরিচিতি ও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে আইভীর তুলনায় অনেক পিছিয়ে বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত। বিএনপির রাজনীতিতে সরাসরি তার তেমন ভূমিকা নেই। তবে আইনজীবী হিসেবে সাত খুনের ঘটনার পর সক্রিয় ভূমিকা সাখাওয়াতকে পরিচিত করেছে। আর দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় বড় সমর্থন পাবেন তিনি বিএনপির।

এ ব্যাপারে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, মানুষ ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে ধানের শীষ জয় পাবে।

প্রধান দুটি দল ছাড়াও ছোট ছয়টি দলের প্রার্থীরা মেয়র পদে নির্বাচন করছেন। তারা হলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রার্থী মোসলেম উদ্দিন আহম্মেদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) কামাল প্রধান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির রাশেদ ফেরদৌস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাসুম বিল্লাহ ও ইসলামী ঐক্যজোট বাংলাদেশের ইজহারুল হক। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন সুলতান মাহমুদ। তিনি নিজেকে বিএনপির কর্মী দাবি করেছেন।

ইসির জন্য অ্যাসিড টেস্ট : নাসিক নির্বাচনকে নিজেদের জন্য অ্যাসিড টেস্ট মনে করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ফেব্রুয়ারিতে বিদায়ের আগে এটিই তাদের অধীনে অনুষ্ঠেয় শেষ নির্বাচন। ফলে ইসি চাইছেÑ উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের মতো এ নির্বাচনও যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। আর সে জন্যই নির্বাচনকে সামনে রেখে ওই এলাকার শীর্ষ ও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে চিরুনি অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করছে ইসি।

ইসি সূত্র জানিয়েছে, নাসিক নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে ওই এলাকার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাস্তান, অস্ত্রবাজ ও অপরাধীদের ধরতে আগেভাগেই কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে ইসি। পাশাপাশি নির্বাচনের দিন নির্বাচনী এলাকাকে বহিরাগতমুক্ত রাখতেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় কিছু বিশেষ নির্দেশনাও দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আবু হাফিজ বলেন, নির্বাচনে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসীদের নজরদারির বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পরিস্থিতি বুঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া কার্যপত্র নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। সে খসড়া কার্যপত্রে মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের নির্বাচনী এলাকায় সফরে যাওয়ার বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপ করার কথা বলা হয়েছে।

 

 

"