রোহিঙ্গা গণহত্যার বৈধতা দিচ্ছেন সু চি

‘বয়স ১০-এর ওপরে হলেই হত্যা করছে মিয়ানমারের সেনারা’

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক
ADVERTISEMENT

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি তার দেশে রোহিঙ্গা গণহত্যাকে বৈধতা দিচ্ছেন এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন তীব্রতর করছেন বলে অভিযোগ করেছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক একদল রাষ্ট্রীয় অপরাধবিষয়ক বিশেষজ্ঞ। লন্ডনের কুইনমেরি বিশ্ববিদ্যালয়-কিউএমইউএলের আইন স্কুলের ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টেট ক্রাইম ইনিশিয়েটিভের (আইএসসিআই) গবেষকরা এ অভিযোগ করেন। তারা বছর কয়েক মাস ধরে মিয়ানমারের আরাকানে সরেজমিন চালানো এক গবেষণায় রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছেন। দ্য ডেইলি মেইল গতকাল প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। এদিকে লালু বেগম নামে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এক রোহিঙ্গা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে মিয়ানমারের সেনাদের নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘১০ বছরের অধিক বয়সের কোনো বালককে পেলেই তারা তাদের হত্যা করে।

পুরুষদের সেনাবাহিনীর গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।’ তিনি জানান, তার গ্রামের বহু নারী সরকারি সেনাদের হাতে ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। তাদের সম্প্রদায়ের নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হচ্ছে। ছফুরা বেগম নামের আরেক বৃদ্ধ নারী বাংলাদেশের সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘মিয়ানমারের আগের (জান্তা সরকার) সরকারের সময়ও অত্যাচার ছিল। তবে এবারের মতো এত ভয়াবহতা আর কখনো দেখিনি। হঠাৎ করেই সেনাবাহিনী একেকটি গ্রাম ঘিরে ফেলে। একের পর এক বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পালানোর সময় মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। মেয়েদের ধরে ধরে নির্যাতন করেই চলছে। এদের (সেনাবাহিনীর) হাতে মরতে চাই না। মৃত্যু হলে বাংলাদেশে মুসলিমদের হাতেই হোক। এখানে (বাংলাদেশে) অন্তত জানাজার পড়ার মানুষ তো পাব!’

আইএসসিআইয়ের গবেষণায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহত্যা, দাসত্বমূলক শ্রম, অত্যাচার, যৌন সহিংসতা, বিনা বিচারে বন্দি করে রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য এবং পুরো জাতিটিকে ধ্বংস করে ফেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব অপরাধের ঘটনা থেকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় দাবি করা হয়েছে।

কিউএমইউএলের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং আইএসসিআইয়ের পরিচালক পেনি গ্রিন বলেছেন, ২০১৫ সালের নির্বাচনে অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির বিজয়ও রোহিঙ্গা নিপীড়নের অবসান ঘটাতে পারেনি। তিনি বলেন, চলতি বছরের অক্টোবরে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নতুন রাজত্ব শুরু হয়েছে, যা ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে। আমি ধারাবাহিকভাবে দেখছি হত্যা, গণগ্রেপ্তার, দলবদ্ধধর্ষণ, গণনির্যাতন, অগ্নিসংযোগ এবং গ্রামের পর গ্রাম গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ভয়াবহভাবে বেড়েই চলেছে। গবেষকরা বলেছেন, তারা রাখাইনে পরিস্থিতির যে খবর পেয়েছেন তাতে করে তারা একটি অবরুদ্ধ-আতঙ্কগ্রস্ত এবং বাঁচার জন্য মরিয়া জনগোষ্ঠীর চিত্র উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন।

লালু বেগম : সিএনএনকে লালু বেগম বলেন, ‘সেনাবাহিনী যখন আসে তখন আমরা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাই। আমি জানি না আমার স্বামী জীবিত আছেন নাকি তিনি মৃত।’ লালু বেগম বলেন, ‘তারা যখন কোনও সুন্দর নারী দেখে তখন তারা তাদের কাছে পানি চায়। এরপর তারা ঘরে ঢুকে তাদের ধর্ষণ করে।’ লালু বেগম আরো বলেন, ‘আমাদের গ্রাম যখন জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তখন আমরা অন্য গ্রামে চলে যাই। অব্যাহতভাবে অবস্থান বদলাতে থাকি। এভাবে আসতে আসতে আমরা নদীতীরে আসি।’ তিনি বলেন, এই আসার পথে অনেকেই তাদের পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন। লালু বেগমের ভাবি নাসিমা খাতুন সিএনএনকে বলেন, ‘যাত্রা শুরু করার সময়ে আমরা ছয়জন ছিলাম। আমরা পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়েছি। আমার স্বামী ও এক পুত্রকে হত্যা করা হয়েছে। আরেক পুত্র নিখোঁজ রয়েছে।’

ছফুরা বেগম : মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারী ছফুরা বেগম (বয়স আনুমানিক ৬০ বছর) বাংলাদেশের সাংবাদিকদের কাছে বলেন, তার বাড়ি মিয়ানমারের আকিয়াব জেলার মংডু উপজেলার কেয়ারিপাড়া গ্রামে। ওই গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে ৪৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন তিনি। দুদিন আগে আশ্রয় নিয়েছেন উখিয়া উপজেলার কুতুপালং আন-রেজিস্টার্ড শরণার্থী ক্যাম্পে। দেশ ছেড়ে নিঃস্ব হয়ে বাংলাদেশে আসা ছফুরা বেগম বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে বাড়ি ছেড়ে বের হই। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে লুকিয়ে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছি।’ তিনি জানান, পাঁচ ছেলে এক মেয়ে আছে তার। স্বামী মারা গেছেন সাত বছর আগে। মিয়ানমারের নাগরিকতার স্বীকৃতি না পেলেও আরও অনেকের মতো ভালোই চলছিল তার সংসার। প্রায় এক সপ্তাহ আগে ওই সংসারে নেমে আসে কালো ছায়া। ওইদিন দুপুরে মিয়ানমারের সেনা বাহিনীর একটি দল বাড়িতে ঢুকে তার একমাত্র মেয়েকে নির্যাতন করে। পরে বাড়িতে থাকা আসবাবপত্র তছনছ করে আগুন ধরিয়ে দেয়। চলে যাওয়ার সময় সেনাবাহিনী তার দুই ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তারা আর বাড়ি ফিরে আসেনি। কোনও উপায় না দেখে অন্যান্যদের মতো বাংলাদেশে চলে আসার সিন্ধান্ত নেন, জানিয়ে কেঁদে ফেলেন ছফুরা। তিনি জানান, ‘তিনি তার তিন ছেলে ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন।’ তিনি বলেন, ‘জীবনে ৬০টি বছর পার করলেও কখনও বাংলাদেশে আসিনি। আমাদের কোনো আত্মীয়স্বজনও এখানে আসেনি। মেয়েটার ওপর সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতনের কথা মনে হলে শরীর এখনও শিউরে ওঠে। এ কারণে প্রাণ বাঁচাতে ছুটে এসেছি এই দেশে।’

বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করতেই আরেক বিপদে পড়েন বলে জানান ছফুরা। নাফ নদীতে ঘাট মাঝিকে মাথাপিছু মিয়ানমারের মুদ্রায় ১২ হাজার টাকা দিয়ে এপারে আসেন তারা। নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশের তীরে ভেড়ার পর স্থানীয় দালালদের খপ্পরে পড়েন। কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে বাংলাদেশি এক হাজার টাকা করে হাতিয়ে নেয় দালালরা। শরণার্থী ক্যাম্পে আসা পর্যন্ত সব হারিয়ে ছফুরা এখন নিঃস্ব। প্রাণে বেঁচে আছেন সান্তনা এতটুকুই।

গত এক সপ্তাহে ছফুরার মতো হাজারো রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং আন-রেজিস্টার্ড শরণার্থী ক্যাম্পে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতনের কথা। ছফুরা বেগমের সঙ্গে আসা ও ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া কবির আহম্মদ (৩৫), ফজল করিম (৪২), শফিক আহম্মদ (২৮), আব্দুর রশিদ (৩২), ছেমন বাহার (২০), আনোয়ারা বেগম (১৮), গোলবাহার (৭৫) জানান, মিয়ানমার সরকার যেভাবে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যাকা-ের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে, তাতে আরাকান রাজ্য শিগগিরই মুসলিমশূন্য হয়ে পড়বে।

রাখাইন রাজ্যে আনুমানিক ১০ লাখ রোহিঙ্গার বাস। জাতিসংঘের ভাষায় এরা বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। এমনকি বংশ পরম্পরায় হাজার বছর ধরে সেখান বসবাস করে আসা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পর্যন্ত প্রদান করে না মিয়ানমার সরকার।

জাতিসংঘ শরণার্থী-বিষয়ক সংস্থার কর্মকর্তা জন ম্যাককেসিক বলেছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশ রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর ‘যৌথ নিপীড়ন’ চালাচ্ছে। জাতিসংঘের হিসেবে সাম্প্রতিক সহিংসতায় ৮৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ।

 

 

"