যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন আ.লীগের চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ
ADVERTISEMENT

রাজনৈতিক অঙ্গনে জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো উত্তাপ নেই। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি অংশ না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচন রূপ নিয়েছে একদলীয় নির্বাচনে। আওয়ামী লীগকে লড়তে হচ্ছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই। মাঠ ফাঁকা। দলীয় মনোনয়ন পেলেই বিজয় নিশ্চিত। তাই মনোনয়ন পেতে শাসকদলের নেতাকর্মীরা এখন ছুটছেন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা, স্থানীয় সংসদ সদস্য, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত। কোনোমতে মনোনয়ন বাগিয়ে নিতে পারলেই বাজিমাত। তাই প্রয়োগ করছেন সর্বশক্তি। ফলে এবার অনেকটা নিরুত্তাপই থেকে যাবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনী আমেজ। কারণ এ নির্বাচনে স্থানীয় মানুষেরও ভোটাধিকার নেই। ভোট দেবেন কেবল নির্বাচিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

নিরুত্তাপ হলেও নির্বাচনকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তোড়জোর চলছে দলীয় প্রার্থী বাছাই নিয়ে। নির্বাচন নিয়ে নিজেদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, নজর রাখা হচ্ছে সেদিকেও। নির্বাচনকে কিছুটা হলেও চাঙ্গা রাখতে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারেও কোনো কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে না। সরকার চাইছে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকারের সবগুলো কাঠামোকে সচল করতে। শক্ত করতে স্থানীয় রাজনীতিতে শাসকদলের সাংগঠনিক ভিত্তি। এর মধ্য দিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ফল আসবে বলেও মনে করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্য নির্বাচনের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের প্রার্থীদের কার কী অবস্থান তা জানতে একাধিক সমীক্ষা চালিয়েছেন। এসব সমীক্ষার প্রতিবেদন তার হাতে আছে। এসব রিপোর্টের ভিত্তিতে জনপ্রিয় ও যোগ্য নেতাদের সমর্থন দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড জেলা পরিষদ নির্বাচনের দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। সৎ, যোগ্য, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা আছে, কোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত নয়Ñ প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা হয়েছে। দলের প্রতি আনুগত্য ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে এ নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশের স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সরকারের উচিত ছিল জেলা পরিষদ আইন এমনভাবে সংশোধন করা, যেন নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয় এবং স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটের মাধ্যমে যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। কিন্তু সেটি হয়নি। ফলে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার কতটা লাভবান হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তা ছাড়া যেসব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভোটার করা হয়েছে, তারা কিন্তু জেলা পরিষদের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করার জন্য প্রতিনিধি হননি। এমনকি বিচ্ছিন্নভাবে জেলা পরিষদ আইন করা হলো। উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে জেলা পরিষদের কর্মকান্ডেরও কোনো সমন্বয় রইল না।

তার পরও এ নির্বাচন ‘মন্দের ভালো’ বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবেÑ যোগ্য ও সৎ প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া। প্রার্থী বাছাইয়ে কেন্দ্রের চেয়ে স্থানীয় মতামতকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। নতুবা দীর্ঘদিন পর সক্রিয় হতে যাওয়া জেলা পরিষদ ব্যবস্থা কার্যকর হবে না। এমনকি বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো না গেলে নির্বাচনে সহিংসতারও আশঙ্কা করছেন তারা। তিন পার্বত্য জেলা বাদে দেশের ৬১টি জেলায় আগামী ২৮ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। গত ২০ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন আগামী ১ ডিসেম্বর, যাচাই-বাছাই ৩ ও ৪ ডিসেম্বর, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১১ ডিসেম্বর। প্রত্যেক জেলায় একজন করে চেয়ারম্যান এবং ১৫ জন সাধারণ ও পাঁচজন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য থাকবেন। নির্বাচনে প্রথমবারের মতো অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। স্থানীয় সরকারের চার ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬৭ হাজার নির্বাচিত প্রতিনিধি এ নির্বাচনে ভোট দেবেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার ইউনিয়ন পরিষদে।

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ : প্রথমবারের মতো হতে যাওয়া জেলা পরিষদ নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন না। কেবল স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ভোট দেবেন। আর এসব প্রতিনিধির অধিকাংশই আওয়ামী লীগ দলীয়। এমন পরিস্থিতিতে পরাজয়ের কথা ভেবেই বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে এ ভোট অনেকটা ‘একদলীয় নির্বাচনের’ মতোই হবে। তা ছাড়া দলীয় প্রতীকে ভোট না হওয়ায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি হবে। ফলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে মাঠে থাকবে আওয়ামী লীগই। নির্বাচন নির্দলীয় হলেও আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবেই প্রার্থী মনোনয়ন দিচ্ছে।

আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রমতে, ইতিমধ্যেই দলীয় মনোনয়ন বোর্ড পাঁচ বিভাগের ৩০ জেলার প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। বাকি দুটি বিভাগের অবশিষ্ট জেলার প্রার্থিতা গতকাল চূড়ান্ত হলেও আজ তাদের নাম ঘোষণা করা হবে। ৬১ জেলায় চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পেতে আবেদন করেছেন ৮ শতাধিক নেতা। এ কারণে দল-সমর্থিত একক চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাই করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে দলকে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের দলীয় সমর্থন পেতে চান বিএনপি নেতারাও। এ জন্য তারা কেবল তৎপরই নন; কৌশলে আওয়ামী লীগদলীয় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। অনেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে কেন্দ্রে আবেদনপত্রও জমা দিয়েছেন। উড়ে এসে জুড়ে বসা সুবিধাবাদীরাও দলীয় মনোনয়ন পেতে তৎপরতা চালাচ্ছেন।

অন্যদিকে, দুই প্রধান বিরোধী দল অংশ না নেওয়ায় এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীও দেখা যেতে পারে। তা ছাড়া নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে এসব বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না-ও নেওয়া হতে পারে। বিগত পৌর ও উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ একাধিকবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবেÑ এমন ঘোষণা দেওয়া হয় সংবাদ সম্মেলন করে। কিন্তু কার্যত তা হুমকিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কেন্দ্র থেকে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং সর্বশেষ অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনের আগে বিদ্রোহী প্রার্থীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে তাদের প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বিভিন্ন জেলার বিদ্রোহী প্রার্থীরা কাউন্সিলর হিসেবে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। সংশ্লিষ্টদের দাবিÑ জেলা পরিষদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরো বেশি সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা : স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ বলেন, বর্তমান জেলা পরিষদ নির্বাচনের পদ্ধতিকে বিএনপিসহ অনেক দল সংবিধানবিরোধী বলছেন। কিন্তু এটা সঠিক নয়। তবে নির্বাচন পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে। অবশ্য নির্বাচনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। জেলা পরিষদ নির্বাচনে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য এবং প্রশাসনিকভাবে দক্ষ লোককেই মনোনয়ন দিতে হবে। কারণ, প্রশাসকরা ডিসি, এমপি, মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করেই সবকিছু করবেন। একই সঙ্গে নির্বাচিত হওয়ার পর জেলা পরিষদের প্রশাসকসহ পরিষদের সদস্যদেরও সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

‘প্রার্থী মনোনয়নে শৃঙ্খলা আনতে না পারলে প্রথমবারের মতো হতে যাওয়া এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করতে পারা আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে’Ñ বলেও মন্তব্য করেন এই বিশেষজ্ঞ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক আখতার হোসেন বলেন, নির্বাচন সর্বদলীয় না হলে ফল আসবে না। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ না হওয়ায় এ নির্বাচনের কোনো আবেদনও থাকবে না। একই দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। বিশেষ করে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে সহিংসতার আশঙ্কাও রয়েছে।

এই বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জেলা পরিষদের আইনে অনেক ত্রুটি রয়েছে। এই ত্রুটি সংশোধনযোগ্য। সময়ের ব্যবধানে তা সংশোধন হবে বলেই আশা করি। তবে চেয়ারম্যান হিসেবে ভালো লোক মনোনয়ন দিতে হবে। বিশেষ করে জনগণের জন্য যাদের কাজ করার আগ্রহ আছে তাদেরকেই নির্বাচিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব হতে হবে জনভিত্তিক। এ জন্য প্রার্থী মনোনয়নের কেন্দ্রের চেয়ে স্থানীয় নেতৃত্বের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দলের সমর্থন পাওয়া এক কথা, আর যোগ্য হওয়া আরেক কথা। সেই সংশয়টা দূর করতে হবে।

নির্বাচিত হওয়ার পর জেলা পরিষদের কাজ হবে জেলার উন্নয়ন কাজের সমন্বয় করা। বিশেষ করে জেলার সকল শ্রেণির মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের সরকারি কাজে সুযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলেও জেলা পরিষদকে কার্যকর করতে হবেÑ বলেও মত দেন তিনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকÑ সুজনের সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জেলা পরিষদে কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য অনেক কিছু করা যায়। এসব মানুষ ভাগ্য উন্নয়নের একটা পন্থা বের করতে পারে। জেলা পরিষদকে কার্যকর করলে এবং আইন অনুযায়ী সকল ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দিলে গ্রামীণ পর্যায়ে এসব মানুষের অবস্থা কিছুটা হলেও ফিরবে। তবে এ জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যোগ্য লোকদের জেলার পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী করতে হবে।

তবে এখন যারা অনির্বাচিত প্রতিনিধি আছেন, নির্বাচন হলে সেটার চেয়ে ভালো হবে। কারণ এখন প্রশাসকদের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নির্বাচন হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতা আসবে। তবে নির্বাচনই শেষ কথা নয়। সরকার নির্বাচন দিক এটা যেমন আমরা চাই, তেমনি সরকারকে স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হবেÑ বলেও মন্তব্য করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার।

 

 

"