একান্ত সাক্ষাৎকারে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী

সব বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিতে হবে

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

আনোয়ারা আলপনা
ADVERTISEMENT

অবশেষে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। তিনিই একাত্তরের প্রথম বীরাঙ্গনা যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন সম্পর্কে মুখ খোলেন। অকপটে বলেন সে সময় নারীদের ওপর পাকিস্তানি ঘাতকদের বর্বরোচিত নির্যাতনের কথা। একদিকে যেমন ফেলে দেওয়া, ফুরিয়ে যাওয়া কাঠের টুকরা, শেকড়, গাছের গুঁড়িকে তুলে এনে শিল্পকর্মে ফুটিয়ে তোলেন তার আবিষ্কার। তেমনি একাত্তরের নির্মম ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী তিনি, মুক্তিযুদ্ধ তার জীবনের বড় অহঙ্কার। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। গতকাল জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ৩৫তম

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের এই প্রখ্যাত ভাস্করকে মুক্তিযোদ্ধার (বীরাঙ্গনা) স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে সরকার। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশের পর প্রতিদিনের সংবাদের পক্ষে গতকাল কথা বলা হয় এই সাহসী বীরাঙ্গনার সঙ্গে। দেশ স্বাধীনের ৪৩ বছর পর এই স্বীকৃতিতে রাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি সবিনয়ে বললেন, স্বীকৃতি পেতে দীর্ঘ বিলম্ব হলেও আমি কৃতজ্ঞ রাষ্ট্রের প্রতি। রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিতে দেরি করলেও এই দেশের মানুষ আমাকে যে সম্মান দেখিয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট আমি।

এর আগে গত বছর অক্টোবরে সরকার প্রথম দফায় ৪১ বীরাঙ্গনার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করলে তাতে নিজের নাম না দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। সে সময় তিনি বলেছিলেন, কারো কাছে কখনো কিছু চাইনি, শুধু স্বীকৃতি চেয়েছিলাম। আমার নামটা আসা উচিত ছিল। আমি দুঃখিত নই, অভিযোগ করছি না, আমি ক্ষুব্ধ। অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছি। এর আগে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ২০১০ সালে ‘স্বাধীনতা দিবস’ পদক লাভ করেন।

একাত্তরের সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা তুলে ধরে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, আমি বিজয় দেখেছি। যুদ্ধের ৯টি মাস যে কেমন, কতটা দুঃসহÑসেটা আমি কখনই ভুলতে পারি না। আমি বুঝে পারি না, যেখানে যুদ্ধ হবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সেনাবিহিনীর, সেখানে এই সাধারণ বেসামরিক মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর এই ন্যক্কারজনক আচরণ ও আক্রমণ কেন? চোখের সামনে নারকীয় দৃশ্য দেখেছি। এখানে সেখানে মা-বোনদের ধর্ষণ, কখনো গণধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার নারীদের আর্তচিৎকার। আলোহীন প্রকোষ্ঠে প্রতিনিয়ত অসহায় নারীদের মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। হত্যাসহ সাধারণ মানুষের বাড়িঘর আগুন দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়াÑএসব কিছুই দেখেছি আমি। এ যেন সভ্য পৃথিবীর বাইরের অন্য কোনো জগত।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি প্রসঙ্গে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বলেন, এখনো অনেক কাজ বাকি। অপশক্তির হাতে চলে গিয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জন। সেখান থেকে যে আমরা বের হতে পেরেছি, সেটাও অনেক পাওয়া। আমরা যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রক্রিয়ায় অনেকটা এগিয়েছি।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এই বরেণ্য ভাস্কর বলেন, সব বীরাঙ্গনা নারীকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে জাতিকে দায়মুক্ত করতে হবে। আমাদের মতো এত ত্যাগ স্বীকার করে কোনো জাতি স্বাধীনতা পায়নি। আর এভাবে স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ স্বীকারকারীদের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও কোনো দেশ দিতে পারেনি।

ব্যক্তিগত কষ্টের কথা প্রসঙ্গে বললেন, সংগ্রাম করতে শিখেছি পরিবার থেকেই। আমাদের পুরো পরিবার মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাজ করেছে। স্বাধীনতা পাওয়ার আনন্দের কাছে সব দুঃখ-বঞ্চনা তুচ্ছ হয়ে গেছে।

কথায় কথায় বললেন দেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি ও জঙ্গি দমনে সরকারের প্রসঙ্গ নিয়েও। এর মধ্যে জঙ্গি দমনে শেখ হাসিনার সাফল্যের কথা তুলে ধরে বলেন, তিনি যেভাবে এই সঙ্কট সামাল দিয়েছেন তাতে আমরা আশাবাদী হতেই পারি।

‘কিন্তু বিএনপি যা করছে তা ঠিক নয়’ উল্লেখ করে এই বীরাঙ্গনা বলেন, খালেদা জিয়া কাউকে সম্মান না করতে পারেন, কিন্তু অসম্মান করার অধিকার তো তার নেই। ১৫ আগস্ট জন্মদিনের কেক কেটে তিনি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি, সেদিনের সেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের প্রতি অসম্মান করেছেন। আর তিনিই (খালেদা জিয়া) একদিন মুজাহিদ, নিজামীর গাড়িতে জাতীয় পতাকা বহন করার ধৃষ্টতা দেখানোর সুযোগ দিয়েছেন। তার তো অধিকার নেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে কথা বলার। একই সঙ্গে বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধে রাষ্ট্রের সঙ্গে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সেখান থেকে চাইলেও তারা বেরোতে পারবে না বলেও উল্লেখ করেন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া এই বীর বীরাঙ্গনা।

"