লোকসানের আশঙ্কায় চামড়া শিল্প

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ
ADVERTISEMENT

দ্বিমুখী সংকটে দেশের চামড়া শিল্প। একদিকে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর নিয়ে জটিলতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কমে যাওয়া- এই দুই কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজারে। বিশেষ করে চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম কোরবানির ঈদের আগে ট্যানারি স্থানান্তর নিয়ে জটিলতার অবসান না হলে চামড়া বাণিজ্যে বড় অংকের অর্থ লোকসান গুনতে হতে পারে সরকার ও ব্যবসায়ীদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্যানারি স্থানান্তরের বিষয়ে সরকার হার্ডলাইনে থাকলেও মালিকদের ধারণা ছিল কোরবানির পর পর্যন্ত সময় পাবেন। কিন্তু তা না হওয়ায় ট্যানারি মালিকরা রয়েছেন দুচিন্তায়। ঈদুল আজহায় চাহিদার সিংহভাগ চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু ঈদ আসন্ন হওয়ার পরেও অনেকগুলো ট্যানারি স্থানান্তর প্রক্রিয়াধীন। এমন অবস্থায় চামড়া সংগ্রহে যাতে বিঘœ না ঘটে সে ব্যাপারে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন ব্যবসায়ীরা।

কিন্তু সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয় চাইছে কোরবানি ঈদের আগেই অন্তত ২৫-৩০টি বড় কারখানা সাভারে স্থানান্তরের। স্থানান্তর না হলে ঈদের সমস্ত চামড়া সাভারে নেওয়ার মতো নির্দেশনাও জারি হতে পারে। সে সঙ্গে চামড়া কিনতে ঋণ সুবিধা বাতিলের কথাও ভাবছে সরকার। আর চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার সাভারে কারখানা স্থানান্তরের জন্য চাপ দিলেও অবকাঠামো সম্পন্ন করতে পারেনি। ঈদের আগে জোরপূর্বক সেখানে স্থানান্তরে বাধ্য করা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে চামড়ার বাজারে। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে না পারলে কাঁচা চামড়া দেশের বাইরে চলে যাবে। এমনিতেই হাজারিবাগে ১ এপ্রিল থেকে চামড়া ঢুকতে না দেওয়ায় হাতছাড়া হয়ে গেছে হংকংসহ বড় কয়েকটি দেশে বড় কয়েকটি বাণিজ্য মেলা। অন্যদিকে, নানা কারণে বিশ্ব বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের দাম ২০ শতাংশ নেমে যাওয়ায় দেশের বাজারেও দাম কমতে শুরু করেছে এসব পণ্যের। ফলে এসব কারণে এবার ঈদে চামড়া বাণিজ্যে লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ট্যানারি মালিক, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মনে রাখতে হবে পরিবেশের কারণ দেখিয়ে চামড়া খাতে একবার নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে তা প্রত্যাহার করতে অনেক শর্তপূরণের বেড়াজালে পড়তে হবে। কারণ পরিবেশ দূষণের অজুহাতে ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারের ক্রেতারা হাজারিবাগে উৎপাদিত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় নিজেদের স্বার্থেই হাজারীবাগ থেকে দ্রুত ট্যানারি স্থানান্তর করতে হবে মালিকদের। একই সঙ্গে এটিও ভাবতে হবে, কোরবানি ঈদ চামড়া সংগ্রহের বড় মৌসুম। সুতরাং এই মুহূর্তে তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে সমাধান করতে হবে। নতুবা লোকসানে পড়তে হবে সরকারকেও।

জানা গেছে, সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরে সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা পার হয়েছে ২০১৩ সালেই। এর মধ্যে ২৮ বার নোটিস ও কয়েকবার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত হাজারীবাগের ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে মাত্র একটি ট্যানারি সাভারে কাজ শুরু করেছে। ২৫-৩০টি ট্যানারি স্থানান্তর প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অবশিষ্ট ১২৩টি ট্যানারি কবে নাগাদ স্থানান্তর হতে পারে সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। ট্যানারি স্থানান্তরে বাধ্য করতে আদালত ১৮ জুলাই দৈনিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। ট্যানারির মালিকদের কাছ থেকে দৈনিক ১০ হাজার টাকা গ্রহণ করতে শিল্পসচিবের তত্ত্বাবধানে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। প্রতি পাঁচ দিন পর পর কোন কোন ট্যানারি মালিক আদালতের নির্দেশমতো অর্থ জমা দিচ্ছেন। কারা নির্দেশ অমান্য করে জমা দিচ্ছেন না, তার তালিকা করছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। সেটি শিল্পসচিবের কাছে পাঠানো হবে। ওই তালিকা এবং ট্যানারি স্থানান্তরের অগ্রগতি সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে পাঠানো হবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। বিসিক সাভারের হেমায়েতপুরে ২০০ একর জমিতে ২০৫টি প্লটে ‘চামড়া শিল্পনগরী’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

এ ব্যাপারে বিসিকের চেয়ারম্যান মো. হজরত আলী বলেন, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) ও বিদ্যুৎ লাইনসহ যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। সিইটিপির ৪টি মডিউলের মধ্যে ২টি মডিউল চালুর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। ২টি মডিউল চালু করতে কমপক্ষে ৪৮টি ট্যানারির বর্জ্য প্রয়োজন। বর্জ্যরে অভাবে সেগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন ট্যানারি মালিকরা সেখানে গেলেই হয়। এ প্রকল্পের পাশেই ট্যানারি শ্রমিকদের জন্য আবাসন, মসজিদ, স্কুল, হাসপাতাল ও বিনোদনের ব্যবস্থা করার জন্য আমরা কাজ করছি।

কিন্তু বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও কোহিনূর ট্যানার্স লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী শাহীন আহমেদ বলেন, কোরবানি ঈদের আগে হাজারীবাগের সব ট্যানারির পক্ষে সাভারে যাওয়া সম্ভব নয়। বড়জোর ২০-৩০টি ট্যানারি যেতে পারবে। যারা যাবে তাদেরও হাজারীবাগেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। কারণ সেখানে বর্জ্য শোধানাগারের যে অবস্থা, তা ঠিক হতে আরো দু মাস লাগবে।

বাংলাদেশ র্ফিনিশড লেদার গুডস এন্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও বেঙ্গল লেদার কমপ্লেক্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ টিপু সুলতান বলেন, চামড়া শিল্প নগরীর প্রধান যে তিন অংশ- সেন্টার ইফুয়েল ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি), সেন্ট্রাল ক্রমরিকভারি প্ল্যান্ট ও ডাম্পিং প্ল্যান্ট এখনো সম্পন্ন হয়নি। এর মধ্যে কেবল সিইটিপির কাজ ৯০ শতাংশ হয়েছে। অবশিষ্ট দুটি প্ল্যান্টের ৮০ শতাংশ কাজ বাকি। ফলে এই মুহূর্তে সেখানে গেলে বুড়িগঙ্গার মতো সেখানকার নদনদীর পানিও দূষিত হবে। ফলে সেখানে কাঁচা চামড়া উৎপাদন করা যাবে না। আর করলেও মানসম্মত হবে না। বিশেষ করে সবার পক্ষে এই মুহূর্তে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। যাদের ব্যবসা ভালো সে রকম ৩০-৩৫টি ট্যানারি স্থানান্তর হতে পারে। বাকি ১১৫টির মতো ট্যানারি যেতে পারে কিন্তু মানসম্মত উৎপাদন করতে পারবে না।

চামড়া ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, দেশে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার রয়েছে। গেল অর্থবছরের শেষ পাঁচ মাসে চামড়া খাতে রফতানি হয়েছে ৪৬৩ মিলিয়ন ডলার। তার আগের বছর একই সময়ে রফতানি হয়েছে ৪৪৪ মিলিয়ন ডলার। এ শিল্পের বড় বাজার হলো র্জামানি, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, রাশিয়া, ব্রাজিল, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ। এ দেশের গরু, ছাগল, মহিষসহ অন্যান্য প্রাণীর চামড়া প্রাকৃতিক কারণেই পুরু, তৈলাক্ত এবং উজ্জ্বল। এসব চামড়া দিয়ে তৈরি পণ্য দীর্ঘস্থায়ী ও দৃষ্টিনন্দন হয়। প্রক্রিয়াজাত চামড়ার মানও ভালো। প্রতিবছর গড়ে ২২০ মিলিয়ন বর্গফুট পশুর চামড়া সংগ্রহ সম্ভব হয় দেশের ট্যানারিগুলোতে।

কিন্তু ট্যানারি স্থানান্তরের জটিলতা আসন্ন কোরবানি ঈদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না- জানতে চাইলে মোহাম্মদ টিপু সুলতান বলেন, দেশের মোট চামড়ার ৪০ শতাংশই সংগৃহীত হয় হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোতে। এর মধ্যে সাত-আট লাখ গরু ও ১২ লাখ ছাগলের চামড়া থাকে। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় সব ট্যানারির পক্ষে এই মুহূর্তে সাভারে মানসম্পন্ন কারখানা স্থাপন সম্ভব নয়। তাই সরকার জোর করে ট্যানারি নিয়ে গেলে সংগৃহীত চামড়ার ৩০ শতাংশই গরমে নষ্ট হবে। ফলে অধিকাংশ কাঁচা চামড়া দেশের বাইরে চলে যাবে। অবশিষ্ট ১০ শতাংশের মধ্যে বেশির ভাগই দেশের বাইরে চলে যাবে।

অনুরূপ মত দেন শাহীন আহমেদও। চামড়া শিল্পের এই নেতা বলেন, এবারের চামড়ার বাজার অবস্থা এমনিতেই খারাপ। বাজার সংকটের কারণে গত রোজার ঈদ থেকে শুরু করে পর্যন্ত সংগৃহীত ৬০ শতাংশ চামড়াই রয়ে গেছে। সেগুলো বিক্রি করতে পারছি না। তারওপর গত ১ এপ্রিল থেকে হাজারীবাগে চামড়া ঢুকতে না দেওয়ায় সম্প্রতি হংকং এ অনুষ্ঠিত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার কোনো অর্ডারই নিতে পারিনি। এতে কমপক্ষে ৪-৫ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

তা হলে সমাধান কি- জানতে চাইলে এই ব্যবসায়ীরা বলেন, আমরা ৩০-৩৫টি ট্যানারি ঈদের আগেই সাভারে যেতে পারবো। কিন্তু মান সম্মত চামড়ার জন্য সরকারের উচিত হবে সব ট্যানারিগুলোকে এই ঈদে অন্তত হাজারীবাগে থাকতে দেওয়া।

এ ব্যাপারে হাজারীবাগের এম এস এলিট লেদার এক্সপোর্ট এর স্বত্বাধিকারী মোজাফফর আহমেদ বলেন, সাভারে এখনো ট্যানারি উপযুক্ত পানি শোধনাগার হয়নি। সেখানকার পানিতে আইরন বেশি। সুতরাং সেখানে প্রক্রিয়াজাত করতে গেলে চামড়া লাল হয়ে যাবে। অথচ পুরো বছর জুড়ে আমাদের চামড়া সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করে রাখতে হয়। সুতরাং সরকারের ট্যানারি স্থানান্তরের ব্যাপারে বিবেচনা করা উচিত।

এ ব্যাপারে বিসিক চেয়ারম্যান হজরত আলী এ কথাও বলেন, সামর্থ্য আছে এমন ২৫-৩০টি ট্যানারি ঈদের আগেই সাভারে যাবে। বাকিরা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে যারা পারছে না তাদের বিষয়টিও ভাবতে হবে। কারণ লাখ লাখ চামড়া নষ্ট হোক, সেটা আমরাও চাই না। তবে ব্যবসায়ীদের বোঝা উচিত, পরিবেশ দূষণের কারণ দেখিয়ে অনেক দেশ হাজারীবাগের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য নিতে চাইছে না। সেটারও সমাধান হওয়া উচিত।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় এবার কোরবানি ঈদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের দরপতন হয়েছে। যে সব দেশে এসব পণ্য সেখানেই দাম কমেছে ২০ শতাংশ। দাম কমার এ হার দেশীয় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ দেশে মোট চামড়ার প্রায় ৬০ শতাংশই আসে কোরবানি ঈদে। অথচ এখন প্রতিদিনই প্রায় বিদেশের বাজারে চামড়ার দাম পরে যাচ্ছে।

এই চামড়া ব্যবসায়ী নেতা আরো বলেন, চামড়া শিল্পের পরিবেশগত কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা গত দুই মাসে ৩০-৪০ লাখ বর্গফুট কাঁচা চামড়ার এলসি বাতিল করেছে। একই সময়ে রফতানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। তারওপর গত রমজানের ঈদে যেসব চামড়া সংগ্রহে রাখা ছিলো সেগুলো এখনও বিক্রি হয়নি। ফলে আসছে কোরবানির ঈদে চামড়া বাজার কি হবে তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

"