খেয়াল খুশি

হাসির রেখা

সাইদুল ইসলাম

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

‘এই তোরা কি কিছু লক্ষ্য করেছিস! গত দুই দিন ধরে প্রায় সাত-আটবার টিনে বল পড়ল কিন্তু একবার-ও নানু আসল না কেন?-রুম্মান বলল।

বন্ধুদের মধ্যে রুম্মান বেশ দুরন্ত ও চঞ্চল। প্রতিদিন সে কোন না কোন কা- ঘটাবেই। হয়ত বন্ধুদের সাথে খেলায় না হয় অন্য কোথাও। দুষ্ট হলেও কারো সাথেই সে খারাপ ব্যবহার করে না, তাই সবাই তাকে পছন্দ করে। বন্ধুদের মধ্যে বয়সে সে সবার বড় না হলেও বুদ্ধির কারণে রুম্মানকে সবাই দলনেতা হিসেবে একবাক্যে মেনে নিয়েছে।

উঁচু উঁচু দালান আর ঘনবসতির কারণে অন্যান্য ছেলেমেয়েদের মতো রুম্মানদের দলটিরও খেলার জন্য ভাল মাঠ নেই। তাই সব ছেলেরা অন্য একজনের বাড়ির সামনের ছোট্ট একটা জায়গায় খেলে। সেটাও অন্যের জায়গা। ছোট্ট জায়গাটার সামনে একটি টিনের ঘর। সেই ঘরে থাকেন একটা বৃদ্ধ নারী, সবাই তাকে নানু বলে ডাকে। নানুর স্বামী মারা গেছে কয়েক বছর হল। একটা ছেলে এবং একটা মেয়ে আছে। তারাও থাকে দূরে। মেয়েটার বিয়ে গিয়েছে আর ছেলেটা কাজের জন্য অন্য শহরে থাকে। অনেক কষ্ট করে তিনি থাকেন এই দুচালা ঘরে। নানু অনেক ভাল মানুষ। ছেলেদের সঙ্গে সবসময় ভাল ব্যবহার করেন, উপদেশ দেন।

সেদিন রুম্মান ও তার বন্ধুরা নানুর বাড়ির সামনের খালি জায়গাটাতে খেলছিল। হঠাৎ একটি বল গিয়ে পড়ল নানুদের টিনের চালে। সাথে সাথে সবাই গায়েব। কারণ বল পড়ার সাথে সাথে নানু বাইরে চলে আসেন। তারপর সবাইকে বকা দেন। কিন্তু ৫ মিনিট হয়ে গেল এখনও নানু আসেনি, তখন সবাই ভাবল মনে হয় নানু ঘরে নাই তাই হয়ত আজ বের হয়নি। তারপর তারা আবার খেলা শুরু করল। কিছুক্ষণ পর আবার টিনের চালে বল পড়ল কিন্তু এবারও কেউ আসেনি । তখন তারা নিশ্চিত হল যে, নানু বাসায় নেই। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবু ডুবু তাই সবাই খেলা শেষ করে ঘরে চলে গেল।

পরদিন শুক্রবার। সবার স্কুল বন্ধ । তাই সবাই সকাল থেকে খেলা শুরু করেছিল। রুম্মান সবাইকে সতর্ক করে বলল, ‘গতকাল হয়ত নানু ছিল না তাই আমাদের কিছু হয়নি। কিন্তু আজকে নানু থাকুক বা না থাকুক আমরা সবাই সতর্কতার সাথে খেলব। কারণ যখন বর্ষাকাল আসবে তখন নানুর অনেক কষ্ট হবে, টিন দিয়ে বৃষ্টি পরবে। নানুর তো আর কেউ নেই । তাই আমাদের সবাইকে সতর্ক হয়ে খেলতে হবে।’ তখন সবাই রুম্মানের কথায় সমর্থন জানাল।

খেলা চলছে এখনো একবারও বল টিনে পড়েনি। সবাই অনেক সতর্ক। কিন্তু এই সতর্কতার মধ্যেই হঠাৎ একটা বল গিয়ে পড়ল টিনের ওপর। এবারও বল পড়ার সাথে সাথে সবাই লুকিয়ে গেল। অনেক্ষণ হয়ে গেল কিন্তু এখনো কেউ আসেনি। তখন সবাই বের হয়ে আবার খেলা শুরু করল। কিছুক্ষণ পরপর পাঁচÑছয়বার বল পড়েছে কিন্তু একবারও নানু বের হল না। তখনই রুম্মান কথাগুলো বলল। ‘এই তোরা কি কিছু লক্ষ্য করেছিস! দুই দিন ধরে প্রায় সাত-আটবার টিনে বল পড়ল কিন্তু একবারও নানু আসল না।’ তখন সবাই একসাথে বলল, ‘হ্যাঁ, এতবার বল পড়ল কিন্তু একবারও নানু আসেনি।’ ‘চলতো দেখে আসি নানুর কোন সমস্যা হয়েছে কিনা।’

তারপর সবাই নানুর ঘরের জানলা দিয়ে দেখল ঘরের ভিতর অন্ধকার। ভিতরের রুমে একটা মোমবাতি জ্বলছে। নানুর ছেলে মাসে একবার না হয় দুইবার আসে বাসায়। তাছাড়া নানু একাই থাকে। রুম্মান জানালার আরেকটু কাছে গিয়ে দেখল বিছানায় নানু শুয়ে আছে । নড়াচড়াও করছেন না। তখন রুম্মান মাঠে এসে সবাইকে বলল, ‘নানুর মনে হয় বেশি অসুখ, বাসায় ওনার ছেলেটাও নেই। চলো আমরা সবাই মিলে নানুর জন্য একটা ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসি।’ সবাই একমত হল। রুম্মান ও তার দল ফার্মেসিতে গিয়ে ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে আসল।

ডাক্তার নিয়ে ফিরে রুম্মানরা দেখল নানু অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছেন। ডাক্তার বললেন, ‘ওনার খুব জ্বর তাই অজ্ঞান হয়ে আছে। আমি কিছু ওষুধ দিচ্ছি ,কিছুক্ষণের মধ্যে জ্ঞান ফিরে আসবে। এখন ওষুধের জন্য ৫০০ টাকা দরকার। তোমরা জোগাড় কর।’ তখন রুম্মান তার বন্ধুদের বলল, ‘ আমরা যে সপ্তাহে ৫ টাকা করে জমাই ওখানে এক হাজার টাকা জমা হয়েছে। তোমরা যদি সবাই রাজি থাকো, তাহলে ওখান থেকে পাঁচশ টাকা দিতে পারি। রন্ধুরা সবাই তার কথায় সমর্থন জানাল । রুম্মান পাঁচশ টাকা এনে ডাক্তারকে দিল। ডাক্তার একটা কাগজে কিছু ওষুধ ও ইনজেকশন লিখে দিল। কাগজটা রুম্মান নিয়ে ওমরকে দিল ওষুধগুলো নিয়ে আসার জন্য।

কিছুক্ষণ পর ওমর ওষুধ নিয়ে আসল। নানুকে ইনজেকশনটা দেওয়ার পর জ্ঞান ফিরে এলো। নানু কোন কথা বলতে পারছে না। কিন্তু রুম্মানদের দেখে কষ্টের মধ্যেও তার মুখে একটি হাসির রেখা ফুটে উঠল।

"