গল্প

ডায়েরি

আব্দুস সালাম

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

দরজায় ঠক ঠক শব্দে ঘুমটা ভাঙ গেল। তড়িঘড়ি উঠে পড়লাম। চোখ মুছতে মুছতে জানতে চাইলাম,

: কে?

: আমি।

দরজার ওপার থেকে কে যেন উত্তর দিল।

আবারো বললাম, আমি কে?

: প্লিজ একটু খুলুন। আমি মৌসুমী।

নারীকণ্ঠ শুনে পরনের অগোছালো পোশাকটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঠিক করে নিলাম। তারপর দরজাটি খুললাম। মেয়েটি আমাকে দেখে বলল,

: আপনি কি আসাদ ভাই?

: জি, বলুন।

: আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল।

আমার রুমে আসার জন্য সে মৌন অনুমতি প্রার্থনা করছিল তা বুঝতে পারলাম। বললাম, ‘ভিতরে আসুন।’ মেয়েটি রুমের ভেতরে প্রবেশ করল। আমার মেসে একটি ভাঙা টেবিল, একটি চেয়ার আর ছোট একটি চৌকি ছিল। আমি মেয়েটিকে চেয়ারে বসতে দিলাম।

দুই-তিন মিনিটেই আমাদের প্রাথমিক পরিচয়পর্ব শেষে হলো। তারপর আকস্মিকভাবেই মৌসুমী আমার ডান হাতটি ধরে বলল, ‘ভাই, আমাকে একটি উপকার করতে হবে।’

: ছি! ছি! কী করছেন। বলুন না আমাকে কী উপকার করতে হবে?

: আগে বলেন, করবেন কি না?

: অবশ্যই করব। বলুন কী উপকার?

হাতটি ছেড়ে দিয়ে সে বলল, ‘আপনি যোগদান না করলে চাকরিটা আমার হবে।’

: তা কীভাবে বুঝলেন?

: এই যে পত্রিকায় প্রকাশিত ফলাফল দেখুন। আপনি প্রথম হয়েছেন। আর আমি দ্বিতীয়। কোম্পানির এমডি স্যারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনি বলেছেন, আসাদ সাহেব যোগদান না করলে চাকরিটা আপনাকে দেওয়া হবে। জানি এটা খুব অন্যায় আবদার। তারপরও করলাম। কী করব বলুন? অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু একটা চাকরিও জোগাড় করতে পারিনি। বাড়িতে বাবা অসুস্থ। টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা পর্যন্ত করতে পারছেন না। ধারদেনা করে কোনো রকমে সংসারটা চলছে। আর আপনিতো ভালো ছাত্র। চেষ্টা করলে আপনি এর চেয়ে অনেক ভালো চাকরি পাবেন।

মৌসুমীর হাতের স্পর্শ, মায়াবি চোখ, বিনীত অনুরোধ আমার বুকের ভেতরটা তছনছ করে দিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুবোধ বালকের মতো বললাম, ‘ঠিক আছে আমি চাকরিতে যোগদান করব না।’ তারপর ড্রয়ার থেকে নিয়োগপত্রটি বের করে তার সামনেই ছিঁড়ে ফেললাম। আমি চাকরিতে যোগদান করছি না নিশ্চিত হয়ে মৌসুমী যে কত খুশি হয়েছিল তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। সজল চোখে আমাকে বলল, ‘আপনি আমাকে এত বড় উপকার করলেন, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আপনার ঋণ আমি কোনো দিন শোধ করতে পারব না।’ ওড়না দিয়ে তার চোখ দুটি মুছতে মুছতে আমার রুম থেকে বের হয়ে গেল। মৌসুমী চলে যাওয়ার পর আমি লক্ষ করলাম, ভুলে তার হাতে থাকা ছোট ডায়েরিটা টেবিলের ওপর রেখে গেছে। ডায়েরিটার মলাট খুলতেই চোখে পড়ল মৌসুমীর পাসপোর্ট সাইজের সুন্দর একটি ছবি। আর ডায়েরির কয়েকটি পাতাতে তার লেখা কয়েকটি কবিতা।

এক সপ্তাহ পর আমাকে মেসটি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। আমি মিরপুর থেকে মোহাম্মদপুরে এক বন্ধুর মেসে উঠলাম। এর মধ্যে আমার কম দামের মোবাইল সেটটি হারিয়ে ফেলি। কয়েক দিন পর নতুন আরেকটি মোবাইল কিনি। মোবাইলের সিমটাও নতুন ছিল। চাকরি খোঁজার জন্য আমাকে আরও কিছুদিন ঢাকায় থাকতে হলো। বন্ধুর মেসে থেকে আমি চাকরি খুঁজতে থাকলাম। অবসর সময়ে মাঝে মাঝে ডায়েরিটা খুলে মৌসুমীর ছবিটা দেখতাম। মায়াবি চোখ। ঘনকালো চুল। খুব ভালো লাগত দেখতে। তাই বারবার দেখতাম। অনেকবার ভেবেছিলাম মৌসুমীর সঙ্গে দেখা করতে যাব। আবার পরক্ষণেই মনে মনে বলতাম, একটা চাকরি জোগাড় না করে মৌসুমীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি চাকরি পাইনি জানলে সে কষ্ট পাবে। চাকরি না পাওয়ার কারণে তার সঙ্গে আমার আর দেখা করতে যাওয়া হয়নি।

হঠাৎ একদিন মিরপুর মেসের এক রুমমেটের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দুই একটি কথা বলতে না বলতেই সে বলল, ‘ও হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য মৌসুমী নামে এক মেয়ে মেসে বেশ কয়েক দিন এসেছিল। তোমার মোবাইল নম্বরটি বন্ধ থাকায় জানাতে পারিনি। মেয়েটি বলেছিল তোমার সঙ্গে নাকি তার জরুরি একটা কথা আছে।’.... যা হোক, আমি আর কথা না বাড়িয়ে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সরাসরি মেসে ফিরে গেলাম। মৌসুমীর সঙ্গে দেখা করার জন্য তখন আমার মনটা আনচান করছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আগামীকালই মৌসুমির সঙ্গে দেখা করতে যাব। তার ছবিটা দেখার জন্য ডায়েরিটা আবার বের করলাম। আর সারা রাত তাকে নিয়ে নানান সুখের স্বপ্ন দেখলাম।

পর দিন সকালে মৌসুমীর অফিসে গেলাম। পকেটের মধ্যে ছিল তার সেই ডায়েরিটা। দারোয়ানের কাছে জেনে নিলাম তার অফিসটা কোন পাশে। সঙ্গে সঙ্গে আরো জানা হলো যে, সে কয়েক দিন আগে পদোন্নতি পেয়েছে। শুনে ভালোই লাগল। অফিসে গিয়ে তার সহকারীর কাছ থেকে জানতে পারলাম, মৌসুমী ছুটিতে রয়েছে। আসতে বেশ কয়েক দিন দেরি হবে। কারণ আগামী শুক্রবার তার বিয়ে।

বিয়ের সংবাদটি শুনে আমার হৃদয়ে যেন রক্তক্ষরণ শুরু হলো। মুখে কোনো কথা বলতে পারলাম না। শুধু পকেট থেকে ডায়েরিটা বের করে তার সহকারীকে বললাম, ম্যাডাম এলে ডায়েরিটা দিয়ে দেবেন। তারপর ভগ্ন হৃদয় নিয়ে অফিস থেকে মেসে ফিরে এলাম। এরপর আর কখনো মৌসুমীর সঙ্গে দেখা হয়নি।

"