শিক্ষা

কুটির শিল্প

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

দ্বিতীয় পর্ব

মৃৎশিল্প

১৯৮৫ সালে বিসিক কারুপল্লী নামে একটি সমীক্ষাভিত্তিক বই প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশে ৬৬৬টি কারুপল্লীতে ১৮ হাজার পরিবার প্রায় ৭৬ হাজার মৃৎশিল্পী কারিগর রয়েছে। এই শিল্পে মোট বিনিয়োগ ১০ কোটি ৬০ লাখ, বাৎসরিক পণ্য উৎপাদন ৩৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকার। মৃৎশিল্প পরিবার, পাড়া ও স্থানীয় কাঁচামালভিত্তিক। এ শিল্পের কারিগর প্রায় সবাই হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী, কুম্ভকার হিসেবে পরিচিত এবং এদের উপাধি পাল। এরা বিভিন্ন ধরনের পুতুল, দেবদেবীর মূর্তি, গার্হস্থ্য দ্রব্যাদি, মাটির ভাস্কর্য, টালি, শখের হাঁড়ি, মনশাঘট ও ফুলদানি তৈরি করে। উল্লেখযোগ্য মৃৎশিল্প পল্লী কুমিল্লার বিজয়পুর, পটুয়াখালীর মদনপুরা, ফেনীর চম্পকনগর, শরিয়তপুরের কার্ত্তিকপুর এবং ঢাকার রায়ের বাজার।

বেতের তৈরি আসবাবপত্র

বাঁশ-বেত শিল্প বিসিকের সমীক্ষা (১৯৮৫) অনুযায়ী মোট শিল্প ইউনিট সংখ্যা ৪২ হাজার, নিয়োজিত শ্রমিক সংখ্যা ১ লাখ ২২ হাজার জন। মোট ব্যবহৃত কাঁচামালের বাৎসরিক মূল্য ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। উৎপাদিত সামগ্রীর মূল্য ৫০ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য বাঁশ বেত সামগ্রী, বেড়া, চাটাই, মাছ ধরার ফাঁদ, হাতপাখা, মোড়া, সোফাসেট, টেবিলম্যাট, ওয়ালম্যাট, ট্রে, ফুলদানি, ছাইদানি প্রভৃতি। উৎপাদন এলাকা কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী।

পাটজাত শিল্প পাট দিয়ে বিভিন্ন মোটিভের সিকা, টেবিলম্যাট, শতরঞ্জি, কার্পেট, শৌখিন হ্যান্ডব্যাগ, থলে ইত্যাদি তৈরি হয়। বিসিকের সূত্র মতে, বাংলাদেশে ৪ হাজার কারখানায় ১১ হাজার কারিগর নিয়োজিত। মোট বিনিয়োগ ২ কোটি টাকা, উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা।

বস্ত্রশিল্প

বস্ত্রশিল্পে ১৯৭৮ সালে সমগ্র বাংলাদেশে ১.৯৮ লাখ কারখানায় ৪.৩৭ লাখ খটখটি তাঁত, গর্ত তাঁত ও স্বয়ংক্রিয় তাঁতে ৯ লাখ ৪৭ হাজার ব্যক্তি কর্মরত ছিল। এই সব তাঁতে প্রতিবছর গড়ে ১০৪ কোটি ৫০ লাখ গজ শাড়ি, লুঙ্গি, ধুতি, গামছা, মশারি, তোয়ালে, মসলিন, জামদানি, কাতান, মলমল ও উপজাতীয় বস্ত্র উৎপাদিত হয়। বস্ত্রশিল্পের মধ্যে বাংলাদেশের বিখ্যাত এলাকা হলো : নরসিংদী, রায়পুরা, ডেমরা, টাঙ্গাইল, শাহজাদপুর, বেড়া, মুরাদনগর, কুমারখালী মাগুরা রাজশাহী, খাদিমনগর, মীরগড়, নাসিরনগর প্রভৃতি অঞ্চল। সাম্প্রতিককালে ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় বস্ত্র, মসলিন, জামদানি, মলমল টরোয়ো শাড়ি, পাবনার শাড়ি, টাঙ্গাইলের শাড়ি, রেশমবস্ত্র ও খদ্দর বস্ত্র থেকে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাশন পরিচ্ছদ প্রস্তুত হচ্ছে।

নকশিকাঁথা

বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ সুচিকর্ম হলো নকশিকাঁথা। ১৩ ধরনের নকশিকাঁথা এদেশে তৈরি হয়। এগুলো হলো : চিত্রিত কাঁথা, মাটিকাঁথা ও পাইড়কাঁথা। বাংলাদেশের সর্বত্র কাঁথা প্রস্তুত হলেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, ফরিদপুর ও কুষ্টিয়ার কাঁথা সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট মানের। এসব অঞ্চলে লেপ কাঁথা, দুজনী কাঁথা, দুরনীকাঁথা, আরশীলতা, ওড়কাঁথা, বাতায়নকাঁথা ও দস্তরখানা প্রস্তুত হয়। বিসিকের সূত্রমতে, বাণিজ্যিকভিত্তিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শত কুটির শিল্প কারখানায় ৩ হাজার কর্মী নিয়োজিত, উৎপাদিত পণ্যের বাৎসরিক মূল্য ১৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।

শীতলপাটি

শীতলপাটি এক ধরনের চাটাইÑযা মোরতা নামক গাছের বাকল থেকে তৈরি হয়। পশুপাখি, লতাপাতা এবং পারিপার্শ্বিকতার ডিজাইন ও মোটিভে শীতলপাটি তৈরি করা হয়। এতে লাল, নীল, সবুজ, কালো ও বেগুনি রঙের বাহার থাকে। সিলেটের রাজনগর, বালাগঞ্জ, বড়লেখা ও মোল্লার বাজার নোয়াখালীর সোনাগাজী ও রায়পুর, বরিশালের স্বরূপকাঠি ও নীলগাতি এবং ফরিদপুরের সাতেচে উন্নতমানের শীতলপাটি তৈরি হয়। কারুপাড়াভিত্তিক প্রায় ১৫ হাজার কারিগর শীতলপাটি উৎপাদন করে, যার বাৎসরিক মূল্য ৫ কোটি টাকা। এদেশে এক সময় রৌপ্য ও হাতির দাঁতের পাতি দিয়ে শীতলপাটি তৈরি হতো।

গহনা বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক শিল্পের উল্লেখযোগ্য কুটির শিল্প। অঙ্গের শোভাবর্ধনের জন্য বাঙালি মেয়েরা বিভিন্ন ডিজাইনের গহনা ব্যবহার করে। ডিজাইনের মূল উৎস লতাপাতা, ফলমুল, পশুপাখি, নক্ষত্ররাজির মতো প্রাকৃতিক মোটিভ। এর নামকরণ বৈচিত্র্যময় যেমনÑ সিঁথিতে ঝাপা, কানে কানপাশা, হীরাম মূল কুড়ি, ঝুমকা, নবরতœ ও চক্রবালি, নাকে বেশর নথ, ফুরফুরি, গলায় পুষ্পহার, সীতাহার, সাতনরীহার, চম্পাকলি, মোহনমালা, হাতে তাগা, মাদুলি বাজার মান্তাশা, রতœচূড়া, আঙ্গুলে আঙ্গুষ্ঠার শাহনামী, অ্যানওয়ান, কোমরে বিছা, চন্দ্রহার কিন্ধিনী পায়ে, ঝাঝুরা পায়েল, তোড়া প্রভৃতি। বিসিক সূত্রমতে বাংলাদেশে গহনাশিল্প ইউনিট সংখ্যা ১২ হাজার ২৫০, কারিগর সংখ্যা ২৭ হাজার এবং বিনিয়োগকৃত মূলধন ১৩ কোটি টাকা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট ও ফরিদপুর অঞ্চল গহনা শিল্পে উল্লেখযোগ্য।

কাঁসা-পিতল শিল্প

কাঁসা-পিতলজাত শিল্প এ দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঢাকার ধামরাই, সাভার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জামালপুরের ইসলামপুর, রংপুর, টাঙ্গাইল ও শরিয়তপুরে পারিবারিক শিল্প হিসেবে বংশ পরম্পরায় তৈরি হয়ে আসছে। কাঁসা-পিতলের কুটির শিল্প সংখ্যা প্রায় ৩৯০ এবং কারিগর প্রায় ২ হাজার। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা মূল্যের কাঁসা-পিতল সামগ্রী তৈরি হয়।

কুটির শিল্পের উন্নয়নে বিসিক, যুব ও ক্রীড়া দফতর, যুব উন্নয়ন অধিদফতর, মহিলা ও সমাজ সেবা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি সাহায্য সংস্থা শ্রমিকদের আর্থিক, কারিগরি এবং বিপণনে সহায়তা করে থাকে। এ খাতে অর্থ প্রবাহ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সরকার ১৯৮৯ সালে বেসিক ব্যাংক লিমিটেড নামে একটি বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে।

সূত্র : বাংলাপিডিয়া

"