শিক্ষা

কুটির শিল্প

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

প্রথম পর্ব

কুটির শিল্প বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্প। এ শিল্পে বাংলার আবহমান সংস্কৃতির প্রতিভাস ফুটে ওঠে, যার নির্মাতা পল্লী অঞ্চলের মানুষ। নিজেদের জীবিকা এবং নিজস্ব ব্যবহারের জন্য তারা এ সকল পণ্য উৎপাদন করে। বাংলার প্রকৃতি, মানুষ, পশুপাখি, লতাপাতা, গাছপালা, নদ-নদী ও আকাশ কুটির শিল্পের ডিজাইনে বা মোটিভে দেখা যায়। কুটির শিল্পকে অনেকে হস্তশিল্প, কারুশিল্প, সৌখিন শিল্পকর্ম, গ্রামীণ শিল্পও বলেন। বর্তমানে শহর এলাকায়ও কুটির শিল্পের প্রসার ঘটছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) মতে, ‘যে শিল্প কারখানা একই পরিবারের সদস্য দতারা পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচালিত এবং পারিবারিক কারিগর খ-কালীন বা পূর্ণ সময়ের জন্য উৎপাদন কার্যে নিয়োজিত থাকেন এবং যে শিল্পে শক্তিচালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হলে ১০ জনের বেশি এবং শক্তি চালিত যন্ত্র ব্যবহৃত না হলে ২০ জনের বেশি কারিগর উৎপাদন কার্যে নিয়োজিত থাকে না, তা-ই ‘কুটির শিল্প’। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড শক্তিচালিত যন্ত্রপাতি ব্যতিরেকে অনূর্ধ্ব ৫০ শ্রমিক নিয়োজিত কারখানাকে কুটির শিল্প হিসেবে গণ্য করেন। কৃষিশুমারি (১৯৮৩-৮৪) কুটির শিল্পকে গার্হস্থ্য স্তরের উৎপাদন শিল্প বলে আখ্যায়িত করেছে। শিল্পনীতি ২০১০-এ বলা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে জমি এবং কারখানা ব্যতিরেকে স্থায়ী সম্পদের মূল্য প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ ৫ লক্ষ টাকার নিচে এবং পারিবারিক সদস্য সমন্বয়ে সর্বোচ্চ জনবল ১০-এর অধিক নয় এরূপ শিল্প প্রতিষ্ঠান হচ্ছে কুটির শিল্প।

কুটির শিল্পের ইতিহাস খুবই প্রাচীন। পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণ বিবরণী থেকে জানা যায়, তৎকালে বাংলায় পৃথিবীখ্যাত মসলিন উৎপাদিত হতো। প্রাক-ব্রিটিশ বাংলায় সুতিবস্ত্র উৎপাদন বিশুদ্ধ কারুশিল্পরীতি বা গৃহে উৎপাদনের ব্যবস্থা দ্বারা সুসংগঠিত ছিল। মুঘল যুগে কুটির শিল্প সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। ইংরেজ ও ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকরা প্রথমদিকে বাংলার কুটির শিল্পে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রফতানির জন্য তাঁত ও অন্যান্য হস্তশিল্পকে অর্থ জোগান দিত। পরবর্তীকালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা তাঁতবস্ত্র, বয়নশিল্প ও অন্যান্য কুটির শিল্পে নির্যাতন চালায়। যেখানে ১৮১৫ সালে এদেশ থেকে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার কাপড় রফতানি হয়েছে সেখানে ১৮৩২ সালে কমে গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ১০ লাখ টাকায়, পরের বছর তা শূন্যের কোঠায়। উল্টো ১৮৩২ সালে ইংল্যান্ড থেকে ৪০ লাখ টাকার বিদেশি কাপড় আমদানি করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে এ দেশের কুটির শিল্পজাত পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ শিল্পের ব্যবসা প্রধানত হিন্দু মহাজন ও ব্যবসায়ীদের হাতে ছিল। দেশ বিভাগের ফলে তাদের অধিকাংশ দেশত্যাগ করে। ফলে কুটির শিল্পজাত ব্যবসায় বড় শূন্যতার সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান আমলের গোড়ার দিক কুটির শিল্পে বৃহৎ বিনিয়োগ ছিল না বললেই চলে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫% ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। প্রায় ১ হাজার ৬শ’ পেশাজীবী কারিগর নিয়োজিত ছিল। তাঁত শিল্পে নিয়োজিত ছিল প্রায় ৪ লাখ লোক। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত এ শিল্প বস্ত্রের চাহিদা মিটিয়েছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার এদেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৫৭ সালে সরকারি আইনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (ইপসিক) প্রতিষ্ঠা করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের কুটির শিল্পসহ সমগ্র শিল্প খাত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বাংলাদেশ সরকার কুটির শিল্পকে পুনর্গঠন এবং কর্মসংস্থানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থাকে পুনর্গঠন করে নতুন নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। এই প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী নৈপুণ্যভিত্তিক প্রযুক্তির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ, সমীক্ষা প্রণয়ন, বিপণন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে নিয়োজিত কারুশিল্পীদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। ১৯৮১ সালে বিসিকের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৬০ ধরনের দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদনে ৩ কোটি ২২ লাখ কুটির শিল্পের কারখানা বিদ্যমান রয়েছে।

২০০৫ সালে বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, দেশে প্রায় ৭ লাখ শিল্প ইউনিট রয়েছে যার মধ্যে ৬০০০ বৃহৎ, ৫০০০ মাঝারি, ৭৬,০০০ ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্প প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার রয়েছে। ১৯৯৯-২০০০ সালে বিসিকে মোট ৪,০৮৫টি শিল্প প্রতিষ্ঠান নিবন্ধীকৃত হয়। এর মধ্যে ৩,২৪০টি কুটির শিল্প। এ সময়ে কুটির শিল্পে মোট বিনিয়োগ ছিল ৫০ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে ৪০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়।

কুটির শিল্পের শ্রেণিকরণ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কুটির শিল্প আট শ্রেণিভুক্ত। এগুলো হলো ক) খাদ্য, পানীয়, তামাক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প : দুগ্ধজাত, ফল প্রক্রিয়া ও টিনজাতকরণ, মৎস্য প্রক্রিয়া ও টিনজাতকরণ, আদা শুষ্ককরণ, ডালমিল, আটামিল, ময়দামিল, অন্যান্য শস্য কারখানা, তেলকল, চালকল, মসলা চূর্ণকরণ, বেকারি, গুড় তৈরি, পশুখাদ্য, মুরগির খাদ্য, বরফ, খয়ের, লবণ তৈরি, মিষ্টান্ন, মধু প্রক্রিয়াকরণ, পানীয়, বিড়ি, হুক্কা, তামাক, জর্দা, মৌমাছি পালন, মৎস্য চাষ, ঘানির তৈল, হাঁস, মুরগি পালন, চিড়া ও মুড়ি তৈরি। খ) বস্ত্র ও চামড়া শিল্প : সুতা কাটা, রেশমজাত দ্রব্য, হস্তচালিত তাঁত, বস্ত্র মুদ্রণ, জামদানি, সুচিকর্ম, হোসিয়ারি, মোজা তৈরি, উলজাত দ্রব্য, নারিকেলের ছোবড়াজাত দ্রব্য, পাটের সুতা, সিকা, মাছ ধরার জাল, পোশাক শিল্প, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়াজাত দ্রব্য, বাটিক, শতরঞ্জি, কার্পেট। গ) কাঠজাত শিল্প : নৌকা তৈরি, খেলনা, কাঠের আসবাবপত্র, বেত ও বাঁশজাত দ্রব্যাদি ও আসবাবপত্র, খেলাধুলার সামান, হুকা তৈরি, বাদ্যযন্ত্র, মাদুর শিল্প, কাঠ খোদাই, কাঠের কৃষি সরঞ্জামাদি, ঘর সাজানোর দ্রব্যাদি এবং কাঠের উপজাত। ঘ) মুদ্রণ ও মোড়কসহ কাগজ শিল্প : পুরনো কাগজজাত দ্রব্য, মুদ্রণালয়, বই বাঁধাই, কাগজের হস্তশিল্প, কাগজের ব্যাগ, কাগজের ফুল ইত্যাদি। ঙ) রাসায়নিক, পেট্রোলিয়াম ও রসায়নজাত শিল্প : অ্যালোপ্যাথিক, ইউনানী আয়ুর্বেদীয় ওষুধ, ছাপা ও রঞ্জন শিল্প, রং এবং বাণিজ্য, আগরবাতি, প্রসাধনী সামগ্রী, সাবান তৈরি, বুট পলিশ, মোম তৈরি, চিরুনি ও বোতাম, মৃৎ শিল্প, কাঁচ শিল্প, চুনজাত দ্রব্যাদি, শিল-পাটা, চক তৈরি, শ্লেট ও পেন্সিল, প্লাস্টিকের খেলনা ও ফুল ব্যাগ ইত্যাদি। চ) অধাতব খনিজ শিল্প : চুনাপাথর ও শামুকজাত চুন, রঙিন চক, খড়ি মাটি, শঙ্খজাত দ্রব্য, বোতাম ও চুড়ি ইত্যাদি। ছ) মেশিনারি ও যন্ত্রপাতিসহ ধাতব শিল্প : লৌহজাত আসবাবপত্র, ইলেকট্রোপ্লেটিং, তারের জাল, ধাতব পাত ও মুদ্রণ, তারকাটা, কাঁসা ও পিতল, স্টিল ট্যাঙ্ক, মেশিনারি সামগ্রী, কৃষি যন্ত্রপাতি, চুলের ক্লিপ, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, জুয়েলারি, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং, কামার শিল্প প্রভৃতি। জ) হস্তশিল্পসহ অন্যান্য শিল্প।

 

সূত্র : বাংলাপিডিয়া

"