শিক্ষা

কর্ণফুলী পেপার মিল

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

কর্ণফুলী পেপার মিল বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কাগজের কল। ১৯৫১ সালে পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের অধীনে ৬৭.৫৭ মিলিয়ন রুপি ব্যয়ে চট্টগ্রাম চন্দ্রঘোনায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে ৩১টি হাতে তৈরি কাগজের এন্টারপ্রাইজ এবং ১২২ শ্রমিকসহ একটি কার্বন কাগজ তৈরির ইউনিট ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করত ৫৫ জন পুরুষ, ৫১ জন মহিলা ও ১৬ জন শিশুশ্রমিক। কর্ণফুলী পেপার মিলটি শিল্প আইনের অধীনে নিবন্ধিত প্রথম কাগজশিল্প যা ত্রিশ হাজার শ্রমিক নিয়ে এশিয়ার সর্ববৃহৎ কাগজ-কল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মিলটি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, সুইডেন এবং ইতালির সহযোগিতায় ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় স্থাপিত হয়। বার্ষিক ৩০,০০০ টন ধারণক্ষমতা নিয়ে ১৯৫৩ সালে মিলটিতে উৎপাদন আরম্ভ হয়। মিলটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অল্প কয়েক বছরের মধ্যে এর ধারণক্ষমতা কমে আসে। পরবর্তী সময়ে এটি দাউদ গ্রুপ অব পাকিস্তানের নিকট ভর্তুকি মূল্যে খুবই সস্তায় বিক্রয় করা হয়। ১৯৬৪ সালে দাউদ গ্রুপ অব পাকিস্তান মিলটির সুষম আধুনিকায়ন ও যৌক্তিক উৎপাদনের লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

কর্ণফুলী পেপার মিল, চন্দ্রঘোনা

কেপিএমের উৎপাদিত কাগজ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান দুই প্রদেশেই বিক্রয় করা হতো এবং উভয় অঞ্চলেই এর মূল্য ছিল সমান। এ উদ্দেশ্যে উভয় প্রদেশের পরিবহন খরচের তারতম্যে সমতা বিধানের জন্য কেপিএমের উৎপাদিত কাগজ পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে ভর্তুকিতে বিক্রয় করা হতো। কিন্তু এ প্রদেশে শিক্ষা সুবিধা এবং প্রকাশনা শিল্পের বিকাশ মন্থর ছিল বলে স্থানীয় বাজার সম্প্রসারিত হয়নি। ১৯৬৯-৭০ সালে কাগজ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩১,৩৭৮ টন। পূর্ব পাকিস্তানে দাউদের কেপিএম কাগজের ৫০টি সরবরাহকারী ডিলার ছিল।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কেপিএম একটি পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। তবে খুব শিগগিরই বাংলাদেশ শিল্প উন্নয়ন সংস্থার (বিআইডিসি) নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে এবং এর উৎপাদিত পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টির জন্য প্রয়াসী হয়। বিআইডিসি বাংলাদেশে বিশেষায়িত পণ্য বিক্রয়ের জন্য ৪০৭টি নতুন প্রান্তিক বা অনভিজ্ঞ ডিলার নির্বাচন করে। কেপিএম ১৯৭৩-৭৪ সালে ১৯,০৪৪ টন কাগজ উৎপাদন করে এবং এর অবিক্রীত কাগজ স্তূপ করে রাখা হতো। কাগজ তৈরির কাঁচামাল সরবরাহ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ায় বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশন কেপিএম-কে চালু রাখার জন্য বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন থেকে নিয়মিত কাঠের কাঁচামাল সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে এগিয়ে আসে। খুব অল্পসময়ে বিভিন্ন সংবাদপত্র-সাময়িকীর দ্রুত বিস্তার দেশে কাগজের চাহিদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং এ চাহিদা মেটাতে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল কেপিএমের চেয়ে কম মূল্যে প্রচুর কাগজ উৎপাদন ও বিক্রয় করে।

১৯৭৬ সালে সরকার কেপিএমের সমস্যা শনাক্তের জন্য একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং ১৯৭৯-৮০ সালে ২৪০ মিলিয়ন টাকার একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনা অনুমোদন করে। এ কাজের জন্য ভারত, সুইডেন, আমেরিকা এবং জাপান থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হয়। ১৯৮৪ সালে কাগজের মান উন্নতকরণ, ব্যবহৃত ধারণক্ষমতার উন্নতিসাধন ও কেপিএমের উৎপাদন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে ১৯৭২-৭৩ এবং ১৯৭৯-৮০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে প্রতিবছর গড়ে ১৬১.৭৪ মিলিয়ন টাকার ক্ষতি কমানোর জন্য এর দক্ষতা বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৮৩-৮৪ সালে কেপিএম ২৮.৩৯ টন কাগজ ৭৩১ মিলিয়ন টাকায় বিক্রি করে।

১৯৯১ সালে কেপিএম নিজের রুগ্নতা কাটিয়ে উৎপাদন ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে বৈদেশিক বাজারে কাগজ রফতানি করতে সক্ষম হয় এবং ওই বছরে ৪,১০২ জন শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। ১৯৯০-৯১ সালে কেপিএমের সংস্থাপিত ধারণক্ষমতা ছিল ৩৩,০০০ টন, প্রাক্কলিত উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৮,৪৩৮ টন ও প্রকৃত উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০,২১৬ টন। কেপিএমের উৎপাদিত কাগজের মধ্যে রয়েছে লেখার কাগজ, ছাপা ও মুদ্রণের কাগজ, করোগেটেড বোর্ড, মোমের প্রলেপযুক্ত কাগজ, আঠাযুক্ত ফিতা এবং বিটুমিন কাগজ। ২০০৯-১০ সালে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৪,২০১ টন। বর্তমানে কর্ণফুলী পেপার মিলস প্রতিটন কাগজ ৭৯,০০০ টাকায় বিক্রি করে। কাগজ বিক্রির জন্য কেপিএমের ২,০৪৬ জন ডিলার রয়েছে।

কেপিএমে কাগজ তৈরির জন্য যে মন্ড ব্যবহার করা হয় তা বিশেষত চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সংগৃহীত কাঠ ও বাঁশ থেকে প্রাপ্ত আঁশজাতীয় কাঁচামাল। তাছাড়া সিলেট পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলে উৎপাদিত এবং বিদেশ থেকে আমদানিকৃত মন্ডও এ মিলে ব্যবহার করা হয়। সৌরশক্তিকে গ্যাসে রূপান্তরের উপযোগী বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি শোধনাগার প্লান্ট, গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র, একটি পুনরুদ্ধার শাখা এবং কাগজ জাতীয় বিভিন্ন সামগ্রীর একটি কনভার্টিং প্লান্ট দ্বারা কারখানাটি সজ্জিত। কর্ণফুলী রেয়ন অ্যান্ড কেমিক্যাল লিমিটেড এবং দুটি কারখানা একই স্থানে ৪৪২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলো কেপিএমের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। কেপিএম একজন নির্বাহী পরিচালক, একজন মহাব্যবস্থাপক ও নয়টি বিভিন্ন বিভাগের (প্রশাসন, প্রকৌশল, উৎপাদন, বিপণন, হিসাব এবং অন্যান্য) প্রধানদের সহায়তায় পরিচালিত হয়। বিসিআইসির প্রধান কার্যালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। একটি এন্টারপ্রাইজ বোর্ড করপোরেশনের নীতিমালা অনুযায়ী এর পরিকল্পনা ও কর্মসূচি তৈরি করে থাকে।

 

সূত্র : বাংলাপিডিয়া

 

 

"