ভ্রমণ

শালবন বিহারে একদিন

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

জনি হোসেন কাব্য
ADVERTISEMENT

মিডটার্ম পরীক্ষা শেষ হয়েছে। একে তো পরীক্ষার চাপ, তারপর আবার নগরে যান্ত্রিকতার জীবন। সব মিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলাম সবাই। বন্ধুরা মিলে তাই একদিন শিক্ষা সফরের পরিকল্পনা করলাম। সাংবাদিক বোরহান স্যার প্রস্তাব করলেন কুমিল্লা ভ্রমণের। শিক্ষার্থীরা একবাক্যে রাজি। ৩১ অক্টোবর সোমবার সকালে কাক্সিক্ষত স্থানে যাওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলো।

পরিকল্পনা অনুযায়ী যাত্রা শুরুর দিন সবাই সময়মতো উপস্থিত হলো বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। সকাল ৭টায় বাস ছাড়ল। ভ্রমণপিপাসুদের হইহল্লায় মুখরিত হয়ে উঠল পুরো বাসটি। প্রায় দেড় ঘণ্টা জার্নি শেষে বাস এসে থামল একটা হোটেলের সামনে। সবাই সকালের নাস্তা সেরে নিল। কিছুটা ফ্রেশ হয়ে বাস আবার ছাড়ল গন্তব্যের দিকে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা জার্নি শেষে বাস পৌঁছে গেল প্রথম গন্তব্যস্থল ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে।

ভেতরে প্রবেশ করেই ওয়ার সিমেট্রি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেল। এটি কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধি। ১৯৪১-৪৫ সালে বার্মায় সংঘটিত যুদ্ধে যে ৪৫০০০ কমনওয়েলথ সৈনিক নিহত হন, তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে এই সমাধিক্ষেত্রটি তৈরি করা হয়েছিল। এই সমাধিক্ষেত্রে ৭৩৬টি কবর আছে। এর মধ্যে অধিকাংশ হলেন সে সময়কার হাসপাতালের মৃত সৈনিকরা। তাছাড়াও যুদ্ধের পর বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু লাশ স্থানান্তর করেও এখানে সমাহিত করা হয়।

বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনীর তিনজন নাবিক, ৫৬৭ জন সৈনিক এবং ১৬৬ জন বৈমানিকের সমাধি রয়েছে এখানে। সব মিলিয়ে ৭২৩ জন নিহতের পরিচয় জানা সম্ভব হয়েছিল। ব্রিটিশদের এমন সুসজ্জিত সমাধি এবং ফুলের বাগানের সৌন্দর্য বিমোহিত করল সকল ভ্রমণপিপাসু মনকে।

আধাঘণ্টা সিমেট্রিটা পরিদর্শন শেষে সবাই রওনা হলাম দ্বিতীয় গন্তব্যস্থলের দিকে। প্রায় ১৫ মিনিট ভ্রমণ শেষে বাস এসে থামল কুমিল্লা শালবন বৌদ্ধবিহার গেটের সামনে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সবাই প্রবেশ করলাম বিহারের ভেতরে। এখানে প্রবেশের পথ একটিই। এই বৌদ্ধবিহারটি খননকৃত প্রতœতাত্ত্বিক আদিনিদর্শন। আকারে পুরো বিহারটি চৌকো। উত্তর বাহুর মধ্যবর্তী স্থানে বিশালাকার তোরণ এই বিহারের বিশেষ আকর্ষণ। মূল ফটকের পূর্বপাশে খননকৃত একটি প্রাচীন কূপও রয়েছে দেখার মতো।

ঝুলন্ত সাইনবোর্ড পড়ে জানা গেল, পূর্বে এই প্রতœস্থানটি শালবন ‘রাজার বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু খননের পর ১১৫ জন ভিক্ষুক বিশিষ্ট ৫৫০ ফুট বাই ৫৫০ ফুট পরিমাপের একটি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ উন্মোচিত হওয়ায় একে ‘শালবন বিহার’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। যার আসল নাম ছিল ‘ভবদেব মহাবিহার’। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বিহারটির আশপাশে একসময় শাল-গজারির ঘন বন ছিল বলেও বিহারটির নামকরণ হয়েছে শালবন বিহার।

বিহার পরিদর্শন শেষে স্থানীয় মাঠে ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল। খেলা শেষে বিহারসংলগ্ন হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম আমরা। এরপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার রওনা হলাম শেষ গন্তব্যস্থলের দিকে। ১০ মিনিট যাত্রার পর বাস এসে থামল বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) সামনে। এখানেও কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সবাই ভেতরে প্রবেশ করলাম।

বার্ডের প্রধান ফটকের ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল সুসজ্জিত মসজিদ। প্রথম পদার্পণেই তার নৈসর্গিক পরিবেশ মুগ্ধ করল। এত পরিচ্ছন্ন একটি প্রতিষ্ঠান, এত সুন্দর শৈল্পিক তার অবকাঠামো আর তারই পাশে নানান রঙের ফুলের বাগান ছিল মুগ্ধ করার মতোই। বার্ড ক্যাম্পাসে রয়েছে ব্যাংক, ডাকঘর, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল সেন্টার, ভিআইপি স্যুট, গেস্ট হাউস, বন কুটির, রানী কুটিরসহ ৭টি হোস্টেল। শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যাপিঠ হিসেবে রয়েছে শিশু বিতান বার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়। খেলাধুলাসহ বিনোদনের জন্য রয়েছে ক্রীড়া ও বিনোদন কেন্দ্র। রয়েছে এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ এবং একটি আধুনিক গ্রন্থাগার।

বার্ডের ভেতরে পিচঢালা পথ ধরে সবাই সামনে এগোতে থাকলাম। কিছুদূর যেতে উঁচু একটি স্থানে বসার জন্য ঘাসবেষ্টিত জায়গার দেখা মিলল। রোমান স্যারের বুনোজোঁক ভীতির কারণে সেখানে আর বসা হলো না। পরে সবাই গেস্ট হাউস-২-এর পাশে পাকা গোলচত্বরে গোল হয়ে বসলাম। বসার উদ্দেশ্য ছিল কুমিল্লা ভ্রমণ নিয়ে মজার বক্তৃতা উপস্থাপন করা। সবাই সবার মতো করে রসাত্মক বক্তৃতা উপস্থাপন করল। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের ভ্রমণটাও ছিল সৌন্দর্যে ভরা।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ভ্রমণপিপাসুদেরও তাড়া বাড়ল নিজ গন্তব্যে ফেরার। সবাই বাসে এসে বসল। শিক্ষার্থীদের গান উল্লাসে মেতে উঠল পুরোটি পথ। অদম্য উচ্ছ্বাস নিয়ে সবাই যার যার বাসায় ফিরলাম।

 

 

"