পরিবেশ

কেশবপুরের বিস্ময়

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

জয়দেব চক্রবর্ত্তী
ADVERTISEMENT

যশোর শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরের কেশবপুর উপজেলা সদরে বাসযোগে পৌঁছালে শহরেই মিলবে বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান। খাদ্যের সন্ধানে এরা লোকালয়ে ঘুরে বেড়ায়। এখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে হনুমানদের দারুণ সখ্য অনেক দিন ধরেই। মানুষের হাত থেকে খাদ্য চেয়ে নেয় তারা। সুযোগ পেলে দোকান থেকে হাত বাড়িয়ে বিস্কুট-কলা-রুটি নিয়ে চলে যায় তারা। এতে এখানকার ব্যবসায়ীরা হনুমানগুলোর ওপর ক্ষুব্ধ হন না। কেশবপুর উপজেলা বন কর্মকর্তার অফিস সূত্র জানায়, কেশবপুরে সরকারি হিসাবে হনুমানের সংখ্যা সাড়ে ৩শ’। কিন্তু বাস্তবে কেশবপুরে প্রায় সাড়ে ৫শ’ হনুমান রয়েছে। এরা ৯ থেকে ১০টি গ্রুপে ভাগ হয়ে বিচরণ করে। এরা মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করে। এ কারণে দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই কেশবপুরে আসেন কালোমুখো হনুমানদের দেখতে। তারা নিজ হাতে হনুমানগুলোকে বাদাম, বিস্কুট ও কলা খেতে দিয়ে আনন্দ পান। কেশবপুর পুরাতন বাস স্ট্যান্ডের সাধন টি-স্টলের মালিক সাধন সাহা, ভানু চক্রবর্ত্তী জানান, হনুমানগুলো খাদ্যান্বেষণে লোকালয়ে এসে ক্ষতি করলেও তাদের রয়েছে প্রচ- অনুভূতি শক্তি।

হনুমানগুলোর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গ্রুপভিত্তিক চলাফেরা করা। এক একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেয় একজন করে পুরুষ হনুমান। প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, এ প্রজাতির হনুমান সাধারণত পাঁছ বছর বয়স থেকে ৬ মাস অন্তর বাচ্চা প্রসব করে থাকে। এদের গড় আয়ু ২০ থেকে ২৫ বছর। এক একটির ওজন ৫ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের হাত ও পায়ের পাতা মুখের মতোই কালো। চলাফেরা করার সময় এরা লেজ উঁচু করে চলে থাকে।

হনুমানদের দলটি মূলত কেশবপুর উপজেলা পরিষদের সামনে, পশুসম্পদ কার্যালয়ের পিছনে, কেশবপুর খাদ্যগুদাম এলাকা, রামচন্দ্রপুর, ব্রহ্মকাঠি, বালিয়াডাঙ্গা, মধ্যকুল, সাহাপাড়া, মুজগুন্নি, ভোগতি গ্রাম এলাকা ও কেশবপুর প্রেসক্লাব এলাকা দিয়ে স্বাভাবিক চলাফেরা করে থাকে।

সরকারিভাবে প্রতিদিন এদের খাদ্য সরবরাহ করা হলেও বরাদ্দকৃত খাদ্য প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় এখানকার হনুমানগুলো প্রায়ই খাবারের খোঁজে কলা বোঝাই ট্রাক, পিক আপযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যায়। ইতোমধ্যে ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পাইকগাছা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, মাগুরাসহ বিভিন্ন স্থানে অনেক হনুমান খাবার খোঁজে গিয়ে আর কেশবপুরে ফিরে আসেনি। অনেক স্থানে নির্যাতনে মৃত্যুও হয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাওয়ার বিষয়ে জানতে পারলে সেখানকার বন কর্মকর্তারা পিকআপযোগে হনুমানগুলোকে এনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বন কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করেন।

এই হনুমান দল নিয়ে অনেক রোমাঞ্চকর কাহিনিও আছে। স্থানীয়রা জানায়, একবার কেশবপুর থানার এক ব্যক্তি হনুমানের লেজে কোপ দিয়ে জখম করায় হনুমানের দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে থানা কর্মকর্তার বাসভবন ঘেরাও করে বিচার প্রার্থনা করে। এক পর্যায়ে পুলিশ ওই ব্যক্তিকে আটক করতে বাধ্য হয়। আটকের পর তারা থানা কম্পাউন্ড ত্যাগ করে। আরেকবার ঢাকাগামী একটি পরিবহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে এক হনুমানের মৃত্যু হলে তারা সড়ক অবরোধ কর্মসূচিও পালন করেছিল।

কেশবপুরের বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান রক্ষায় সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত খাদ্য সঠিকভাবে বিতরণ করা হচ্ছে কি না বা তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখভালের জন্য তদারক কমিটি রয়েছে। যার নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন কেশবপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। ২০১৩ সালের ১৫ আগস্ট থেকে সরকারের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ইকোটুরিজম উন্নয়ন প্রকল্পে কেশবপুরের হনুমানদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে নিরাপদ বিচরণে তাদের জন্য অভয়ারণ্য সৃষ্টি করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

 

 

"