ইংরেজ শাসকদের স্মৃতিচিহ্ন

নীলফামারী কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ইংরেজ আমলের নীলকুঠি ভবন

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

* ওয়ালী মাহমুদ সুমন
ADVERTISEMENT

প্রায় দেড়শ’ বছর আগের কথা। ইংরেজ শাসনামলে নীলফামারী অঞ্চলের মানুষ ছিল নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত। পুরো নীলফামারীই সে সময় নীলখামারি হিসেবে পরিচত ছিল। ইংরেজরা তাদের প্রয়োজনে এখানকার চাষিদের দিয়ে নীল চাষ করাত। কিন্তু তাতে ইংরেজ শাসকদের কাপড়ের কলকারখানা দারুণ চললেও কৃষকদের ভাগ্যের খাতা শূন্যই রয়ে যেত। কৃষকরা দিন-রাত পরিশ্রম করার পরও দিন দিন তাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিন নিপীড়িত হয়ে একসময় এ এলাকার শোষিত জনগোষ্ঠী ফুঁসে ওঠে। ১৮৫৯ সালে এ অঞ্চলের কৃষকের ঘরে ঘরে শুরু হয় বিদ্রোহ।

তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা নীল চাষের ব্যাপারে এতটাই উন্মত্ত ও নির্মম ছিল যে, নিরীহ কৃষকদের ওপর নির্যাতন করতেও তারা পিছপা হতো না। তাদের সেই নির্যাতনের স্থাপনা হিসেবে পরিচিত অসংখ্য নীলকুঠি নীরব সাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে নীলফামারীর অনেক জায়গায়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বর্তমানে নীলফামারী শহরের তিন কিলোমিটার উত্তরে ‘নটখানা’ নামক স্থানে ছিল নীল খামার। তারও আগে স্থানটির নাম ছিল ‘লটখানা’। তৎকালীন শাসকরা অবাধ্য নীল চাষিদের এ নীল খামারে এনে লটকিয়ে চাবুক দিয়ে পিটিয়ে তুলে দিত পিঠের চামড়া। তাদের ওপর চালাত পাশবিক নির্যাতন। এ কারণে স্থানীয়ভাবে এসব স্থানের নাম রাখা হয়েছিল ‘লটখানা’। কালের আবর্তে লটখানা শব্দটি উচ্চারিত হতে থাকে ‘নটখানা’ নামে। তবে এই নামকরণ নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক না কেন নীল চাষকে কেন্দ্র করেই যে ‘নীলফামারী’ শব্দের উৎপত্তি তা নিয়ে অনেক ইতিহাসবিদ একমত পোষণ করেন।

নীলফামারী জেলা শহরের এখন অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে, প্রায় সবখানেই লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। তবুও রয়ে গেছে জীর্ণ এবং নিশ্চিহ্নপ্রায় কিছু স্মৃতি, যেগুলো ইতিহাস জুড়ে হাজারো চিত্র চোখের সামনে তুলে ধরে নতুন করে। নীলফামারী কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি তেমনই এক স্মৃতি চিহ্ন। পুরনো স্থাপত্য কৌশলে নির্মিত ভবনটি ব্যবহার করত নীলকর সাহেবরা। চুন, সুরকি ও ইট দিয়ে নির্মিত ভবনটির ভেতরে রয়েছে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা। এ ছাড়াও রয়েছে একটি বাথরুম ও কিছু প্রশস্ত জানালা। এরই মধ্যে ভবনটিতে সামান্য সংস্কার হয়েছে। হারিয়ে গেছে কিছু স্মৃতি। ভবনটির দিকে চোখ পড়লেই হৃদয়পটে ভেসে ওঠে দরিদ্র কৃষকের ওপর অত্যাচারী নীলকরদের নির্যাতনের বীভৎস দৃশ্য।

নীলফামারীর শিক্ষাবিদ ও গবেষক রাজা সহিদুল আসলাম বলেন, অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব ঘটলে কলের তৈরি কাপড়গুলোর জন্য নীলের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সেই সময় ব্রিটিশ সরকার ভারত উপমহাদেশ শাসন করত। তারই সূত্র ধরে পূর্ব বাংলার কৃষককে তারা জোর করে নীল চাষ করাত। চাষ পদ্ধতি ছিল বর্গা। জমি বর্গা নিয়ে নীল চাষ করত কৃষক। কিন্তু নীলকর, জমির মালিকের পাওনা, চাষ খরচÑসবকিছু বাদ দিয়ে কৃষকের ভাগ্যে শূন্যের অঙ্ক বৈ কিছুই জুটত না। ফলে কৃষক নীল চাষে অস্বীকৃতি জানায়। আর এ কারণে তাদের ওপর নেমে আসত অমানবিক নির্যাতন। তাদের স্ত্রী-সন্তানের ওপর চালানো হতো অত্যাচার। তিনি আরো বলেন, নির্যাতনের মাত্রা বাড়লে ১৮৫৯ সালে এ অঞ্চলের কৃষকের ঘরে ঘরে শুরু হয় ব্যাপক বিদ্রোহ। এ রকম অনেক ঐতিহাসিক সত্য কথাগুলোকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয় এ ভবনটি। বর্তমানে এই ভবনটি অফিসারদের ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তার মতে, ইতিহাসের প্রয়োজনে উচিত ছিল একে সরকারিভাবে সংরক্ষণের; স্থানীয় জনগণ মনে করে ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে এ ভবনটি সংরক্ষণ করে জাদুঘরে পরিণত করা উচিত, যাতে নীলফামারীর আগামী প্রজন্ম জানতে পারে এদেশের মানুষের ওপর নিষ্পেষণের ইতিহাস।

 

 

"