শিক্ষা

অলিম্পিক গেমস

শেষ পর্ব

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

দক্ষতাবর্ধক মাদকের ব্যবহার

 

১৯০৪ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের ম্যারাথন দৌড়ে থমাস হিকস।

বিংশ শতকের শুরুর দিকে অনেক ক্রীড়াবিদ দক্ষতাবর্ধক ওষুধের ব্যবহার শুরু করে। ১৯০৪ সালে ম্যারাথন দৌড়ে স্বর্ণপদক জয়ী ক্রীড়াবিদ থমাস হিকস তার প্রশিক্ষক কর্তৃক দেওয়া স্ট্রিকনিন মাদক ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৬০ সালে একজন ডেনিশ সাইক্লিস্ট ক্যুদ এনমার্ক জেনসন মাদক সেবন করে গেমসে অবতীর্ণ হওয়ার পর সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ময়নাতদন্তে পাওয়া যায় যে অ্যাম্ফিটামিন নামক মাদকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার মৃত্যু হয়। এটিই ছিল শক্তিবর্ধক মাদক সেবনের ফলে অলিম্পিক গেমসে মৃত্যুর প্রথম ঘটনা। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে অলিম্পিক ফেডারেশন দক্ষতাবর্ধক মাদকের ব্যবহার নিষিদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়; যার ফলে ১৯৬৭ সালে অলিম্পিক কাউন্সিল আইনের মাধ্যমে মাদকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা শুরু হয়।

সুইডিশ পেন্টাথলিট হান্স-গানার লিলজানওয়াল হলেন প্রথম ক্রীড়াবিদ যিনি ১৯৬৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে মাদক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে তার ব্রোঞ্জ পদক হারান। এর পরেই সবচেয়ে প্রচারিত মাদক কেলেঙ্কারির ঘটনা ছিল বেন জনসনের। তিনি ১৯৮৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে স্ট্যানোজোলল মাদক সেবনের জন্য ১০০ মিটার দৌড়ের স্বর্ণপদক হারান। সেই পদক দেওয়া হয় দ্বিতীয় হওয়া কার্ল লুইসকে, যিনি আবার অলিম্পিক শুরুর আগে নিষিদ্ধ মাদকের ব্যবহারে ধরা পড়েছিলেন। অলিম্পিকে মাদকের ব্যবহার রোধ করার জন্য নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে, ১৯৯৯ সালে বিশ্ব মাদকবিরোধী এজেন্সি গঠন করা হয়। যার ফলে ২০০০ সালের গ্রীষ্মকালীন ও ২০০২ সালের শীতকালীন অলিম্পিকে মাদক পরীক্ষার অনুত্তীর্ণ ক্রীড়াবিদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। বিশেষ করে ভারোত্তোলন ও ক্রস-কান্ট্রি স্কিইং ক্রীড়াবিদদের একটি বড় অংশ মাদক ব্যবহারের জন্য ধরা পড়েন। ধীরে ধীরে সচেতনতা বাড়ার ফলে, ২০০৬ শীতকালীন অলিম্পিকের সময় মাত্র একজন প্রতিযোগী মাদক পরীক্ষায় ধরা পড়ে তার পদক খোয়ায়। আইওসি-স্থিরীকৃত মাদক পরীক্ষার নিয়মাবলি সারা বিশ্বে মানা হয়; এবং অন্যান্য ক্রীড়া সংস্থাগুলো একে মেনে চলার চেষ্টা করে। বেজিং অলিম্পিকের সময়, ৩৬৬৭ প্রতিযোগীর মূত্র ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে মাদক পরীক্ষা হয় বিশ্ব মাদকবিরোধী এজেন্সির তত্ত্বাবধানে। অলিম্পিক শুরুর আগেই বিভিন্ন জাতীয় অলিম্পিক কমিটি নিজের দেশের অনেক ক্রীড়াবিদকে মাদক পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ায় এবং অলিম্পিকে না পাঠানোয় মাত্র তিনজন প্রতিযোগী অলিম্পিক চলাকালীন মাদক পরীক্ষায় ধরা পড়ে। এই সাফল্যের পর লন্ডনে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক ও প্যারা-অলিম্পিক মিলিয়ে ৬০০০ জনেরও বেশি প্রতিযোগীর মাদক পরীক্ষা হয়। অলিম্পিকের আগের পরীক্ষায় ১০৭ প্রতিযোগী ধরা পড়েন ও বহিষ্কৃত হন। অলিম্পিক চলাকালীন আটজন প্রতিযোগী ধরা পড়েন ও নিলম্বিত হন। এদের মধ্যে ছিলেন শট পাটার নাদিয়া ওস্টাপচুক, যার স্বর্ণপদক কেড়ে নেওয়া হয়।

লিঙ্গবৈষম্য

১৯০০ সালে প্যারিস অলিম্পিকে নারীরা সর্বপ্রথম অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। তথাপিও ১৯৯২ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে প্রায় ৩৫টি দেশ সব ইভেন্টের জন্য শুধু পুরুষ প্রতিনিধি প্রেরণ করে। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে শুধু পুরুষ প্রতিনিধি প্রেরণকারী দেশের সংখ্যা দ্রুত হারে হ্রাস পায়। ২০০০ সালে বাহরাইন প্রথমবার, ফাতেমা হামিদ জিরাশি ও মরিয়াম মোহামেদ হাদি আল হিলি নামে দুই মহিলা প্রতিযোগীকে প্রেরণ করে। ২০০৪ সালে, আফগানিস্তানের হয়ে সর্বপ্রথম রবিনা মুকিমার ও ফারিবা রেজাঈ নামে দুজন মহিলা অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করে। ২০০৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী অলিম্পিকে সর্বপ্রথম মহিলা প্রতিযোগীকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়।

২০১০ সালের আগ পর্যন্ত তিনটি দেশ কখনই নারী ক্রীড়াবিদকে প্রেরণ করেনি। এই তিনটি দেশ হলো ব্রুনাই, সৌদি আরব ও কাতার। প্রতিবার একজন করে খেলোয়াড় পাঠিয়ে ব্রুনাই মাত্র তিনটি অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করে, অপরদিকে কাতার ও সৌদি আরব শুধু পুরুষ দল নিয়ে নিয়মিতভাবে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করে আসছিল। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ঘোষণা করে, যেসব রাষ্ট্র নারী ক্রীড়াবিদ পাঠানোর ব্যাপারে আগ্রহী নয় তাদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা হবে। এর পরপরই কাতার অলিম্পিক কমিটি ঘোষণা করে যে, শুটিং এবং ফেন্সিংয়ে অংশগ্রহণের জন্য তারা ২০১২ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে চারজন নারী খেলোয়াড় পাঠানোর ব্যাপারে আশাবাদী।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত ২০১২ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক ছিল অলিম্পিক ইতিহাসে প্রথম অলিম্পিক, যেখানে অংশগ্রহণকারী সব রাষ্ট্রই মহিলা ক্রীড়াবিদ এনেছিল। সৌদি আরব দুজন, কাতার চারজন এবং ব্রুনাই একজন (৪০০ মিটার বাধাদৌড়ে মাজিয়া মহুসিন) মহিলা প্রতিযোগী এনেছিল। কাতার আবার তাদের একজন মহিলা প্রতিযোগীকে, বাহিয়া আস-হামাদ (শুটিং), ২০১২ অলিম্পিকে তাদের পতাকাবাহিকা করেছিল। ২০১২ অলিম্পিকেই, বাহরাইনের মরিয়ম ইউসুফ জামাল প্রথম আরব উপসাগরীয় মহিলা হিসেবে অলিম্পিক পদক জেতেন, যখন তিনি ১৫০০ মিটার দৌড়ে তৃতীয় হন।

অশ্বচালনাই একমাত্র অলিম্পিক খেলা যেখানে পুরুষ ও মহিলা একসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক পর্যন্ত দেখা যায়, পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বিভাগভিত্তিক পদকের সংখ্যা কম। তবে ২০১২ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক থেকে মহিলাদের মুষ্টিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় এখন পুরুষ ও মহিলাদের অলিম্পিক ক্রীড়া সংখ্যা সমান। যদিও শীতকালীন অলিম্পিকে, মহিলারা এখনো যুগ্ম নর্ডিকে অংশ নিতে পারেন না। আর গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে সমলয় সাঁতার ও ছন্দবদ্ধ জিমন্যাস্টিক্সে পুরুষদের কোনো প্রতিযোগিতা হয় না।

................................................................

সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতা

 

বিশ্বযুদ্ধের কারণে মোট তিনটি অলিম্পিক গেমস আয়োজন করা সম্ভব হয়নি, এগুলো হলোÑ১৯১৬, ১৯৪০ এবং ১৯৪৪। ১৯১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪০ ও ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অলিম্পিক অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। ২০০৮ সালে বেইজিং গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনের দিনে রাশিয়া ও জর্জিয়ার যুদ্ধ শুরু হলেও অলিম্পিক অনুষ্ঠান অব্যাহত থাকে। উল্লেখ্য, যে ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভøাদিমির পুতিন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ উপস্থিত ছিলেন এবং চীনা প্রধানমন্ত্রী হু জিন্তাওয়ের সভাপতিত্বে মধ্যাহ্নভোজে এই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।

১৯৭২ সালের মিউনিখে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসে সরাসরি সন্ত্রাসবাদী হানা হয়। ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর নামক একটি ফিলিস্তিনিই জঙ্গি সংগঠন ১১ ইসরায়েলি ক্রীড়াবিদকে অপহরণ করে। ইতিহাসের এই নির্মমতম ঘটনাটি মিউনিখ হত্যাকা- নামে পরিচিত। জঙ্গিরা তাদের অপহরণের পরপরই দুজন ক্রীড়াবিদকে হত্যা করে এবং পরে বন্দিদের পালানোর চেষ্টা ব্যর্থ হলে বাকি ৯ জনকেও হত্যা করে। উক্ত ঘটনায় পাঁচজন জঙ্গিসহ একজন জার্মান পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত গত দুটি অলিম্পিক আসরেই সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ দেখা যায়। ১৯৬৬ সালের আটলান্টায় গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের সময় সেন্টেনিয়াল অলিম্পিক পার্কের পাশে একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। এতে দুজন নিহত ও ১১১ জন আহত হয়। এই ঘটনার পেছনে দায়ী ছিল এরিক রুডল্ফ নামে একজন স্থানীয় সন্ত্রাসবাদী। পরে তার যাবজ্জীবন কারাদ- হয়। অপরদিকে ইউটার সল্ট লেক সিটিতে অনুষ্ঠিত ২০০২ সালের শীতকালীন অলিম্পিক গেমসটি শুরু হয় টুইন টাওয়ারে ৯/১১তে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ঠিক পাঁচ মাস পরে। এর ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কড়া ও নজিরবিহীন।

যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি, আটবার (চারবার গ্রীষ্মকালীন ও চারবার শীতকালীন) অলিম্পিকের আয়োজন করেছে। তিনবার গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের আয়োজন করে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডন সবচেয়ে বেশিবার অলিম্পিক আয়োজক শহরের রেকর্ড ধারণ করছে। এছাড়া দু’বার করে অলিম্পিক আয়োজন করেছে জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও গ্রিস। অন্যদিকে, দুইবার অলিম্পিক আয়োজনের কৃতিত্বের অধিকারী শহরগুলো হলোÑ লস অ্যাঞ্জেলেস, প্যারিস ও অ্যাথেন্স। ২০২০ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের সঙ্গে সঙ্গে এশিয়া থেকে জাপানের টোকিও শহরও দুবার অলিম্পিক আয়োজনের গৌরব অর্জন করবে।

শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজনের নিরিখে তিনবার আয়োজন করে ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের পরেই অবস্থান করছে। এছাড়া সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, জাপান, কানাডা ও ইতালি দুইবার করে অলিম্পিক আয়োজন করেছে। আয়োজক শহরের মধ্যে দুবার করে আয়োজন করে সবার উপরে আছে লেক প্লেসিড, ইন্সব্রুক ও সেন্ট মরিৎজ।

 

-সপ্তক ডেস্ক

"