ভাটপাড়া নীলকুঠি

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

মাহাবুব চান্দু মেহেরপুর
ADVERTISEMENT

মেহেরপুর অঞ্চলে ১৭৭৮ সালে ক্যারল ব্লু নামে এক ইংরেজ নীলকুঠি স্থাপন করেন। অত্যধিক লাভজনক হওয়ায় ১৭৯৬ সালে এখানে নীলচাষ শুরু হয়। এ সময় বিখ্যাত বর্গি দস্যু নেতা রঘুনাথ ঘোষালীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে গোয়ালা চৌধুরী নিহত হলে মেহেরপুর অঞ্চল রানি ভবানীর জমিদারিভুক্ত হয়। রানি ভবানী নিহত হলে কাসিম বাজার অঞ্চলটি ক্রয় করেন হরিনাথ কুমার নন্দী। পরে হাত বদল হয়ে গোটা অঞ্চলটি মথুরানাথ মুখার্জির জমিদারিভুক্ত হয়। এক সময় মথুরানাথ মুখার্জির সঙ্গে কুখ্যাত নীলকর জেমস হিলের বিবাদ শুরু হয়। পরে তার ছেলে চন্দ্র মোহন বৃহৎ অঙ্কের টাকা নজরানা নিয়ে মেহেরপুরকে জেমস হিলের হাতে তুলে দেন। চন্দ্র মোহনের ছেলে মহেষ মুখার্জি জেমস হিলের মন্ত্রী নিযুক্ত হন। ইতিহাসে ইনিই নীলদর্পণ নাটকে গুপে দেওয়ান নামে পরিচিত।

১৮১৮ থেকে ১৮২০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মেহেরপুরের বেশ কয়েকটি স্থানে নীলকুঠি স্থাপিত হয়। তার মধ্যে গাংনীর ভাটপাড়া ও আমঝুপি নীলকুঠি অন্যতম। এক বিঘা জমিতে আড়াই থেকে তিন কেজি নীল উৎপন্ন হতো, যা উৎপাদন করতে ব্যয় হতো ১২-১৪ টাকা। অথচ চাষিরা পেত মাত্র তিন-চার টাকা। নীলগাছ থেকে যে রং তৈরি করা হতো তা ছিল চাষিদের রক্ত পানি করা ঘামের ফসল। ভাটপাড়া নীলকুঠিটি কাজলা নদীর তীরে ২৩ একর জমির ওপর অবস্থতি। সাহেবদের প্রমোদ ঘর ও শয়ন কক্ষ সংবলিত দ্বিতল ভবনটি আজো জীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কাঁচারি ঘর, জেলখানা, মৃত্যুকূপ ও ঘোড়ার ঘর বিলুপ্তপ্রায়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দামি মার্বেল পাথর আর গুপ্তধনের আশায় এলাকার প্রভাবশালীরা ভেঙে ফেলেছে অনেক স্থাপনা। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে সরকারের বাজস্ব বিভাগ। এরই মধ্যে ভবনের ইট ও পাথর চুরি হয়ে গেছে। দামি ও ফলদ বৃক্ষ হয়েছে নিধন। বাকি অংশে গড়ে উঠেছে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প, জায়গা জমি ক্রমান্বয়ে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। নীলকুঠির মূল ভবন ছাড়াও বিধ্বস্ত ভবনের চারপাশে আগাছার মতো ছড়িয়ে আছে নীলগাছ। কুঠি ভবন ও এ নীলগাছ স্মরণ করিয়ে দেয় নীলকরদের অত্যাচার ও নির্যাতনের কথা। স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত আছে, গভীর রাতে এখানে এসে দাঁড়ালে শোনা যায় নর্তকীদের নূপুরের আওয়াজ ও চাষিদের বুকফাটা আর্তনাদ।

কালের সাক্ষী ভাটপাড়া কুঠিবাড়িতে এখনো অনেক পর্যটক এলেও ধ্বংসাবশেষ দেখে হতাশ হয়েই তাদের ফিরতে হয়। এলাকাবাসীর দাবি, পরাধীনতার শিকলে বন্দি থাকাকালীন শোষক এবং শাসকদের নির্মম নির্যাতনের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ভাটপাড়া নীলকুঠি সংরক্ষণ করা হোক। এই স্থানটি হতে পারে ইতিহাসের নির্মমতার সাক্ষ্য বহনকারী এক অনন্য দর্শনীয় স্থান। এখানে গড়ে তোলা যেতে পারে একটি পর্যটন কেন্দ্র।

"