ইতিহাস

মুঘল স্মৃতিচিহ্ন : বড় কাটরা

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

এলিজা বিনতে এলাহী
ADVERTISEMENT

গল্পের বইয়ে অসংখ্যবার পড়া সরাইখানা শব্দটির সঙ্গে বাস্তবের অবয়বটা কেমন তা জানার কৌতূহল ছিল অনেক দিন থেকেই। কল্পনায় দেখা সরাইখানার চেহারার সঙ্গে আসল সরাইখানাকে মেলানোর জন্যই বড় কাটরা দেখতে যাওয়া। অনেক দিন ধরেই বড় কাটরা নামটি জানা ছিল, কিন্তু দেখা হয়ে ওঠেনি। বড় কাটরা ছিল মুঘল আমলের একটি সরাইখানা। বাংলাদেশে তো বটেই, ভারতবর্ষের প্রাচীনতম সরাইখানার তালিকায়ও বড় কাটরা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ঈদের ছুটিতে ঢাকার রাস্তাঘাট কিছুটা ফাঁকা থাকায় বড় কাটরা দেখার উদ্দেশ্যে বের হলাম একদিন। গায়ে গায়ে লেগে থাকা বাড়িঘর, সরু গলি, ঠাসাঠাসি লোকজন, ধুপধুনা আর বিরানি-কাবাবের গন্ধ মিলিয়ে পুরান ঢাকার চিরাচরিত চেহারাটা ঈদের ছুটিতে ছিল কিছুটা অন্যরকম। বড় কাটরা খুঁজতে চক বাজারের চত্বরকে পিছনে রেখে সরু একটা গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগোলাম সামনে। কিন্তু কাছে গিয়েও বুঝতে পারছিলাম না যে বড় কাটরার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কারণ ঐতিহ্যের এই স্মৃতিচিহ্নর আশপাশটা আধুনিক বাড়িঘর ঢেকে ফেলেছে। প্রথম দর্শনে মনে হয় রাস্তার ওপর প্রায় ৪০ ফুট উঁচু বিশাল একটি প্রাচীন গেট। সময় নিয়ে ডানে-বামের ফাঁকফোকর দিয়ে খুঁজলে পুরো স্থাপনাটির জরাজীর্ণ অবয়বের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। আরেকটু খুঁটিয়ে দেখলে দেয়ালের গায়ে মুঘল আমলের বাদশাহী অলঙ্করণের শেষচিহ্নের ছিটেফোঁটা চোখে পড়ে। অথচ সেকালের ঢাকার অন্যতম মনোরম অট্টালিকা ছিল এই বড় কাটরা। ‘সেকাল’ বলতে সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের কথা বলছি। তখন ঢাকা মুঘলদের অধীনে। ১৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে যুবরাজ শাহ্ ?সুজার জন্য ‘মীর-ঈ-ইমারত’ অর্থাৎ প্রধান স্থপতি আবুল কাসেম যখন বড় কাটরা নির্মাণ করেন তখন বুড়িগঙ্গা বয়ে যেত এর দক্ষিণ ফটকজুড়ে। একসময় ঢাকার কোলঘেঁষে বয়ে চলা গঙ্গার এই শাখা নদীটি যৌবন হারিয়ে এখন সরে গেছে অনেক দূরে। আর বড় কাটরাকে ঘিরে ধরেছে দোকানপাট, বাড়িঘর, গলি আর তস্যগলি। শাহ্ সুজা শেষমেশ কেন যে এ অট্টালিকায় থাকেননি সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যতটুকু জানা যায়, স্থপতি মীর কাসেমকে তিনি উপহার হিসেবে দিয়ে দেন এই বড় কাটরা, যা হাতবদল হয়ে পরবর্তীতে সরাইখানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বড় কাটরা সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রাপ্ত দুটি শিলালিপি, যাতে লেখা আছে, ‘ঈশ্বরের অনুগ্রহ লাভের জন্য আবুল কাসেম নির্মাণ করেছেন এ অট্টালিকার সংলগ্ন বাইশটি দোকান। এখানে ক্লান্ত পথিকরা বিনা খরচে বিশ্রাম নেবে আর দোকানের আয় দিয়ে নির্বাহ করা হবে এর ব্যয়।’ সে সময় ঢাকা ছিল বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল। নদী বা স্থলপথে আসা বণিকরা এসে বিশ্রাম নিত এই কাটরায়। মুঘল আমলের এ সরাইখানা নির্মাণের প্রায় দেড়শ’ বছর পর ব্রিটিশ কালেক্টর স্যার চার্লস ডয়েলির আঁকা ছবিটিই সম্ভবত বড় কাটরার প্রাচীনতম ছবিÑযা ইতিহাসের অন্যতম দলিল। ১৮০৮ থেকে ১৮১৮ সালের মধ্যে আঁকা ছবির পাশাপাশি বড় কাটরা সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘স্থানীয় নিরতিশয় দরিদ্রজনরা এই বড় কাটরার কক্ষগুলোতে থাকেন।’ এর পরপরই ১৮২২ সালের দিকে ‘ডয়েলির’ লেখায় বড় কাটরার সৌন্দর্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। উনিশ শতকের শেষ দিকে বা কুড়ি শতকের প্রথমদিকে বড় কাটরা ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের দখলে। পরে তা হাতবদল হতে হতে এখন বারোভূতের আখড়া। প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর, রাজউক, সিটি করপোরেশন, আর জামিয়াতুল হুসানিয়া আশরাফুল উলুম নামে ট্রাস্টিবোর্ডের টানা-হেঁচড়ায় আজকের বড় কাটরার ভেতর ভাতের হোটেল, দোকানপাট, থেকে শুরু করে গড়ে উঠেছে মাদ্রাসা পর্যন্ত। এটি যে দেশের ঐতিহ্যের অংশ, ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ তার ছিটেফোঁটাও নেই বর্তমানের বড় কাটরায়।

ভরদুপুরে কাটরার নিচতলার হোটেলে যখন ঢুকলাম তখন ভেতরে গিজগিজ করছে লোক। খেতে খেতে চোখ আটকে গেল দেয়ালের ওপর। যেখানে অর্ধসমাপ্ত টাইলস দিয়ে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে পুরনো অভিজাত দেয়ালের অস্তিত্বের চিহ্ন। দেয়ালের ওপাশটায় কী আছে তা দেখার অপার কৌতূহল হচ্ছিল। ওখানেই পরিচয় হয় স্থানীয় এক তরুণ সাঈদের সঙ্গে। তার সহযোগিতায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ঢুকে যাই বড় কাটরার ভেতরে। সাঈদের কাছেই জানতে পারলাম, স্থানীয় লোকজনের মধ্যে কাটরাকে ঘিরে রয়েছে নানা রকম মিথ। অন্ধকারাচ্ছন্ন গোলকধাঁধার মতো পথ দিয়ে সাবধানে হাঁটতে হাঁটতে দ্রুততার সঙ্গে দেখে নিচ্ছিলাম ভেতরতা। ইট-সুরকির পুরু দেয়াল, দেয়ালের ফাঁকফোকর দিয়ে দেখতে দেখতে চোখ আটকে যায় প্যাসেজের গায়ে বড় একটা ফোকর দেখে। সাঈদ জানায়, স্থানীয় লোকজন এটাকে বলে ‘জীনের কবর’। মনে প্রশ্ন এলো, এটা কি সেই চম্পাবতীর সমাধি? মতান্তরে যিনি ছিলেন শায়েস্তা খাঁর কন্যা কিংবা উপপতœী। এই চম্পাবতীর নামানুসারেই এলাকাটির নাম হয়েছে ‘চম্পাতলী’। প্রথমটায় বুঝতে পারিনি যে, কাটরার ভেতরে মাদ্রাসার ছাত্রাবাস। প্রাচীন ছোট ছোট সরাইখানার বিশ্রামকক্ষগুলো এখন মাদ্রাসা ছাত্রদের দখলে। আবাসন সঙ্কটে হয়ত প্রথম তলার ছাদের ওপর তোলা হয়েছে ইটের দেয়াল আর টিনের অসামঞ্জস্য ঘর। জরাজীর্ণ অভিজাত অট্টালিকার করুণ দশা দেখতে দেখতে ছাদে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম বড় কাটরার পুরো অবয়বটুকু। ভীষণ হতাশ লাগছিল। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বড় কাটরা হয়ত রূপকথার মতো মনে হবে। অথচ এটি হতে পারত দেশের অন্যতম পর্যটন স্থান।

"