সেকালের চলচ্চিত্র : ওরা ১১ জন (১৯৭২)

স্বাধীন দেশে আলোর মুখ

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
ADVERTISEMENT

সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে। নতুন পতাকা, নতুন মানচিত্র। মুক্ত পাখির মতো উড়তে শুরু করেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছুই। আমাদের চলচ্চিত্রে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়ে গেছে এই যুদ্ধে। দেশ স্বাধীনের পর ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হন বাংলা চলচ্চিত্রের দীর্ঘশ্বাস জহির রায়হান। নতুন বছরে নতুন দেশে জেগে ওঠে চলচ্চিত্র। প্রথম বছর ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় ২৪টি ছবি।

মুক্ত দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’। সদ্য যুদ্ধফেরত দুই তরুণ খসরু ও মাসুদ পারভেজ চেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী কঠিন সময়টিকে সবার কাছে তুলে ধরতে। এমন একটি মাধ্যমের কথা তারা ভাবছিলেন যাতে করে একসঙ্গে দেশ-বিদেশের অনেক মানুষ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারবে। এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও যা হয়ে থাকবে একটি প্রামাণ্য দলিল। অন্যদিকে চাষী নজরুল ইসলামও এমন একটি ভাবনা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। এই তিনজন একত্রিত হয়ে ঠিক করলেন সেই মাধ্যমটি হবে চলচ্চিত্র। আর এভাবেই নির্মাণ শুরু হয় ‘ওরা ১১ জন’ চলচ্চিত্রটির। চার মাসের খাটা-খাটুনির পর ১৯৭২ সালের ১১ আগস্ট আলোর মুখ দেখে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র।

ওরা ১১ জন চলচ্চিত্রের কাহিনি গড়ে উঠেছে ১৯৭১ সালে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত একটি গেরিলা বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে। ২৫ মার্চ কালো রাত্রির পর এ বাহিনীটি বাংলাদেশকে দখলদারমুক্ত করার লক্ষ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু গেরিলা অপারশেন চালায়। বাহিনীটির নেতৃত্ব দেন কামরুল আলম খসরু। ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পুরো সময়টিকেই ফ্রেমবন্দি করতে চেয়েছেন পরিচালক, যার নেপথ্যে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ। ছবির বেশির ভাগ অংশজুড়েই মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যাকশন দেখানো হয়েছে। ছবি শেষ হয় শত্রু বাহিনীর আত্মসমর্পণ আর মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়োল্লাসের মধ্য দিয়ে। যুদ্ধ শেষে অনেকেই ঘরে ফিরেন। কারো জন্য প্রিয় মানুষগুলো পথ চেয়ে থাকেন। কিন্তু সেই মানুষটার আর ফেরা হয় না। কেউবা ফিরে এসে পরিবারের মানুষগুলোকে খুঁজে পান না। সারি সারি লাশ আর ধ্বংসস্তূপের ওপর ভর করে মানচিত্রে জেগে উঠে নতুন একটি দেশ বাংলাদেশ। এ ছবিতে মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে পেশাদার কোনো শিল্পী অভিনয় করেননি। ওরা ১১ জন ছবিতে যে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা অভিনয় করছেন তারা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই এগারোজন হলেনÑখসরু, মুরাদ, নান্টু, আলতাফ, আবু, হেলাল, আতা, বেবি, অলিন, ফিরোজ ও মঞ্জু। এ ছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে নতুন করে সাজাতে এগিয়ে আসেন রাজ্জাক, শাবানা, নূতন, সুমিতা দেবী, খলিল, রওশন জামিল, রাজু আহমেদ প্রমুখ। ছবিটির সংলাপ লিখেছেন এটিএম শামসুজ্জামান। তিনি রাজাকার চরিত্রে ছবিটিতে অভিনয়ও করেছেন। চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত অস্ত্র-গোলাবারুদ সবই ছিল সত্যিকারের; যা একটি বিরল ঘটনা। ছবিতে ব্যবহারের জন্য জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে আর্মস ও অ্যামুনেশন সরবরাহ করা হয়। চলচ্চিত্রটিতে জয়দেবপুর সেনানিবাসের সেনাসদস্যরাও অভিনয় করেছেন। সত্যিকারের অস্ত্র ব্যবহারের ফলে ছবির শুটিংয়ে কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি। এ প্রসঙ্গে একটি দৃশ্যের কথা বলা যেতে পারে। দৃশ্যটি ছিল এমনÑএকটি মেয়েকে পাকিস্তানি হানাদাররা তাড়া করবে এবং গুলি ছুড়তে থাকবে, কিন্তু মেয়েটির গায়ে কোনো গুলি লাগবে না। যেহেতু আসল গুলি, তাই দৃশ্যটি ধারণ খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। গুলি করলে মেয়েটির গায়ে লাগার সম্ভাবনাই বেশি। গুলি ছোড়ার দায়িত্বটি কেউই নিতে চাইলেন না। এমনকি চিত্রগ্রাহক আবদুস সামাদও দৃশ্যটি ধারণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। শেষ পর্যন্ত খসরু গুলি ছোড়ার দায়িত্ব নিলেন। দৃশ্যটি ধারণ শুরু হলো। মেয়েটি দৌড়াচ্ছে আর খসরু একে একে ৩০টি গুলি ছুড়লেন। গুলি মেয়েটির খুব কাছ দিয়ে চলে গেল, কয়েকটা জামাও স্পর্শ করল, কিন্তু একটাও শরীরে লাগল না। সফলভাবে দৃশ্যটি ধারণ শেষে সবাই আনন্দে খসরুকে জড়িয়ে ধরল। ওরা ১১ জন ছবিটির আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য হলো একটি দৃশ্যে সত্যিকারের পাকিস্তানি সৈন্যরাও অভিনয় করেছেন। দৃশ্যটি ছিল ধরা পড়ে যাওয়া পাকিস্তানি সৈন্যকে মেরে ফেলার। মুক্তিযুদ্ধের সময় আটকে পড়া দুই পাকিস্তানি সৈন্য তখন চলচ্চিত্রটির ইউনিটের কাছে বন্দি ছিল। তাদের তখনো বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এই দুই সৈন্যকে দিয়েই দৃশ্যটিতে অভিনয় করানো হয়। এরপর তাদেরকে

সেনানিবাস কর্তৃপক্ষের কাছে সোপর্দ করা হয়।

ছবিটিতে মোট তিনটি গান ব্যবহার করা হয়েছে। ছবির শুরুর দৃশ্যে ‘ও আমার দেশের মাটি’ গানের সঙ্গে গ্রামবাংলার প্রকৃতি তুলে ধরা হয়।

একদম শেষ দিকে এসে সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠে ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি ব্যবহার করা হয়েছে। ছবির অপর গানটি হলো, ‘আমায় একটি খুদিরাম দাও বলে কাঁদিস না মা’। ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেছেন খোন্দকার নুরুল আলম।

‘ওরা ১১ জন’ ছবিটি ১৯৭২ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেয়।

"