রোহিঙ্গা নির্যাতন

সমুদ্রে ভাসমান মানবতা

আবুল বাশার শেখ

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

ভূপেন হাজারিকার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংগীত ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে/একটু সহানুভূতি কি মানুষ কি পেতে পারে না! ও বন্ধু মানুষ মানুষের জন্যে’। এই সংগীতটি কেউ শোনেনি আর এটি পছন্দ করে না এমন মানুষ মনে হয় খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হবে। এই সংগীতের সূত্র ধরেই আলোচনা শুরু করি। আমি মানুষ, রক্তে-মাংসে গড়া একজন মানুষ। আমার ভেতরে এক আর বাইরে আরেক। আমার পাশে যে সে শিশু, নারী কিংবা পুরুষ যাই হোক না কেনÑ সর্বাগ্রে একটিই পরিচয় সে-ও মানুষ। কবি বলেছেন, ‘কালো আর ধলু বাহিরে কেবল ভেতরে সবার সমান রাঙা’। আজকের সমাজে হোক তা দেশে কিংবা দেশের বাইরে, একটি বিষয় কমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো বর্ণবাদ। এই বর্ণবাদের কারণে দেশে দেশে দিন দিন মানুষের প্রতি মানুষের সহিংসতা বেড়েই চলেছে। তার বাস্তব উদাহরণÑ বর্তমান সময়ে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর বৌদ্ধদের অমানবিক নির্যাতন-সহিংসতা। যা দেখলে যে কারো বিবেক নাড়া দেওয়ার কথা। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ধর্ষণ করা হচ্ছে নারীদের। শুধু তাই নয়, তাদের হত্যা করে উলঙ্গ অবস্থায় ফেলে রাখা হচ্ছে। এসব অত্যাচারের হাত থেকে প্রাণে বেঁচে থাকতে অসহায় রোহিঙ্গারা ঝাঁপিয়ে পড়ছেন সাগরে।

রোহিঙ্গারা যখন মিয়ানমার সাগরের অথৈ জলে নিরুদ্দেশে যাত্রা করেন, তখন হয়তো তাদের একটাই আশা থাকে, কয়েকটা দিন সাগরের পানিতে ভেসে থেকে অজানা কোন দেশে পাড়ি দিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকতে পারবেন। নৌকায় ভাসা রোহিঙ্গারা একটু খাবারের আশায় চেয়ে থাকেন আকাশের দিকে। তাদের কারো মুখে খাবার নেই। নেই বিশুদ্ধ পানি। নৌকা ছাড়ার সময় যেটুকু খাবার ছিল তা শেষ হয়েছে অনেক আগেই। অভুক্ত মা তার ছেলের দিকে চেয়ে থাকেন অপলক দৃষ্টিতে। আর তাকায় সাগরের অথৈ পানির দিকে। পরিবারের কর্তা নিরুপায় সাগরের পানিতে ভাসতে থাকেন।

স্বাভাবিক পৃথিবীর কাছে মিয়ানমার এমনিতেই এক রহস্যময় নাম। দেশটির রাজনীতি থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক বা সামাজিক কোনো কিছুর খবরই বাকি বিশ্ব ঠিকভাবে কখনো জানেনি। অর্ধেকেরও বেশি বনভূমি আবৃত এই দেশের এক কোনায় আরাকান নামের একটা প্রদেশ আছে, যার ভেতর জাতিগতভাবে মুসলিম রোহিঙ্গা নামধারী এ জনগোষ্ঠীর বাস। রোহিঙ্গা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিম মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। তারা ইসলামধর্মে দীক্ষিত। রোহিঙ্গাদের আলাদা ভাষা থাকলেও তা অলিখিত। উইকিপিডিয়া তথ্যমতে ২০১২ সালে, প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে বসবাস করেন। মিয়ানমার ছাড়াও ৫ লাখের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এবং প্রায় ৫ লাখ সৌদি আরবে বাস করে বলে ধারণা করা হয়; যারা বিভিন্ন সময় মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের কারণে দেশত্যাগে বাধ্য হন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী।

রহস্যময় সে দেশের সবচেয়ে সিক্রেট ইস্যু হলোÑ রোহিঙ্গা মুসলিমদের খবর। প্রতিনিয়ত মৃত্যু আর ধর্ষণের শঙ্কা মাথায় নিয়ে ঘোরা এ জাতির প্রকৃত অত্যাচারিত হওয়ার ইতিহাস বোধহয় তাদের সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউই জানে না। যতটুকু জানা গেছে, তাতেই সুস্থ মানুষের বিবেককে আঘাত করার জন্য যথেষ্ট। মিয়ানমারে এ রোহিঙ্গাদের কোনো নাগরিকত্ব নেই। তাদের কোনো ভোটাধিকার নেই, সমগ্র মিয়ানমার তো দূরের কথা, নিজেদের প্রদেশেই তাদের কোনো শিক্ষার অধিকার নেই। আরাকান বা রাখাইনের বিশ্ববিদ্যালয়ে রোহিঙ্গা প্রবেশ নিষিদ্ধ। এদের কোনো লাইব্রেরি নেই, প্রায় সব মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। এদের পুরুষদের জোর করে রাষ্ট্রীয় খাতে বিনা বেতনে শ্রমিক হিসেবে কাজ করানো হয়। গবাদি পশুপালন করে, সামান্য জমিতে কৃষিকাজ করে অথবা বনে-বাদাড়ে ঘুরে এটা-সেটা কুড়িয়ে বিক্রি করে বা বন থেকেই কুড়িয়েই কিছু খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন কেটে যায়। তাদের ভ্রমণের ওপর কঠোর নজরদারি আর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অত্যন্ত সীমিত করে দেওয়া হয়েছে এদের চিকিৎসা গ্রহণের সুবিধাকে। বড় কোনো হাসপাতালে জটিল রোগের চিকিৎসা পাওয়ার কোনো অধিকার তাদের নেই। মিয়ানমার সরকার তাদের নিজেদের ভেতর বিয়ে নিষিদ্ধ করেছে শুধু তাই নয়, সন্তান ধারণের ব্যাপারেও এদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে।

যদিও বাংলাদেশ সরকার রাজনৈতিক কারণে রোহিঙ্গা প্রবেশের বিপক্ষে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিশাল একটা অংশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দানের পক্ষে। আমাদের দেশ এত বেশি ধনী না, তবে আমাদের মানবিক চাহিদা আমাদের মতো তারাও মানুষ, তাদেরও বাঁচার অধিকারটুকু আছে। ইতিহাস বলে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত যদি আমাদের আশ্রয় না দিত, তাহলে বিষয়টি কেমন দেখাত। আমাদের মহান স্বাধীনতার সময় ভারতে যখন আমরা অস্থায়ী শিবির স্থাপন করি, তখন কিন্তু তারা আমাদের তাড়িয়ে দেয়নি। তারা আমাদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। সে দিকটাও বর্তমান প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের জন্য একটু বিবেচনা করা দরকার।

সারা বিশ্বে বড় বড় নেতা মুখে মুখে মানুষের কথা বলেন, মানবাধিকারের কথা বলেন, বাস্তবে কী হচ্ছে সেদিকে তারা কতটুকু নজর দিচ্ছেন? আজকে সমুদ্রে ভাসমান এই মানুষগুলো কি তাদের চোখে মানুষ নন? বিশ্ববিবেক কি হারিয়ে গেছে?

প্রতিদিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হচ্ছে, প্রচারিত হচ্ছে। অবাক করার মতো, দুঃখ করার মতো বিষয়Ñ যারা বিশ্বশান্তির বারতা নিয়ে এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে আমেরিকা ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাদের কানে কি রোহিঙ্গাদের বুক ফাটানো আর্তনাদ একবারের জন্যও পৌঁছায় না। অং সান সু চি কিংবা ড. মুহম্মদ ইউনূস বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অসামান্য (!) অবদান রেখে যারা নোবেল শান্তি পুরস্কার হাতিয়ে নিয়েছেন; এত কাছে থেকে তারাও কি দেখতে পাচ্ছেন না, মানুষের এমন করুণ মৃত্যু! নাকি অগ্রহায়ণের মৃদু শীতেই গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়েছেন তারা? মিয়ানমারের এমন মানবিক বিপর্যয়ে শান্তির নেত্রী অং সান সু চি নীরব কেন? শান্তির নোবেল হারানোর ভয়ে! না অন্য কিছু?

লেখক : সংবাদকর্মী

basharpoet@yahoo.com

"