ধর্ম

জুমার বিশেষ বক্তব্য হোক গণকল্যাণমুখী

শাহীন হাসনাত

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোকে আল্লাহতায়ালা শুক্রবার দান করেননি। ইহুদিদের জন্য ছিল শনিবার আর খ্রিস্টানদের জন্য ছিল রোববার। তাই তারা কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের পরে থাকবে। দুনিয়ায় আগমনের দিক থেকে আমরা পরে এসেছি কিন্তু আখিরাতে আমরা হব অগ্রবর্তী। তবে অন্যান্য সৃষ্টির আগে তাদের ফয়সালা হবে।’ -সহিহ বুখারি ও মুসলিম

অন্য আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি উত্তমরূপে ওজু করে জুমার নামাজে হাজির হবে এবং মনোযোগের সঙ্গে খুতবা শুনবে ও চুপ থাকবে, এই জুমা থেকে অন্য জুমা পর্যন্ত তার সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ -সহিহ মুসলিম

নামাজসমূহের মাঝে জুমার নামাজ হচ্ছে, সবচেয়ে অনন্য মর্যাদার ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ইসলাম জুমার নামাজের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া এবং যতœবান হওয়ার কথা বলেছে। আর এ নামাজের সওয়াবও অন্যান্য নামাজের চেয়ে বেশি। হিজরি প্রথম মতান্তরে দ্বিতীয় বর্ষে জুমার নামাজ পড়ার নির্দেশ জারি হয়। ৪ রাকাত জোহরের নামাজের পরিবর্তে শুক্রবারে ২ রাকাত নামাজই হলো জুমার নামাজ। জুমার নামাজ ঘরে একাকী পড়ার বিধান নেই।

জুমার নামাজের আগে রয়েছে আরবি খুতবা। খুতবা মানে ধর্মোপদেশ, ইমাম বা খতিব সাহেব কর্তৃক উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে প্রদত্ত বক্তৃতা। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং খলিফারা প্রতি শুক্রবারে জুমার নামাজে ধর্মীয় বিষয়সহ সমাজের বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে প্রয়োজনীয় আদেশ-উপদেশ সংবলিত খুতবা প্রদান করতেন মুসল্লিদের উদ্দেশে, যাতে মুসল্লিরা জ্ঞান লাভ করে তদানুযায়ী আমল করতে পারেন।

হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) রীতি ও পদ্ধতি অনুসরণে এবং তার খুতবাদানের অভীষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সমুন্নত রাখতে পৃথিবীব্যাপী মসজিদগুলোতে খুতবা দেওয়া হয়। এটাই খুতবা দানের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

খুতবা যেহেতু আরবি ভাষায় দেওয়া হয়, আর সেটা বাংলা ভাষাভাষী মুসল্লিদের বুঝতে অসুবিধা হয়, তাই খতিব সাহেবরা খুতবার বিষয়বস্তুকেই খুতবার আগে বাংলায় বলে দেন। খুতবা-পূর্ব এই বয়ান বা ভাষণ এখন অনেকটাই জুমার নামাজের অনুষঙ্গ হয়ে গেছে। তবে এ ক্ষেত্রে সম্মানিত খতিব সাহেবদের কাছে নিবেদন থাকবে, খুতবা-পূর্ব জুমার বয়ান সংক্ষিপ্ত করার। কারণ জামাতে উপস্থিত মুসল্লিদের মধ্যে কেউ অসুস্থ, বয়োবৃদ্ধ এবং নামাজের পরে কারো জরুরি কাজ থাকতে পারে। এমতাবস্থায় খুতবা-পূর্ব বয়ান, খুতবা ও জুমার নামাজে বেশি সময় নিলে তা মুসল্লিদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

 

জুমার খুতবা দুটি। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন এবং মাঝে বসতেন। অতঃপর বসা থেকে উঠে দ্বিতীয় খুতবা দিতেন। জুমার দুই খুতবা দুই রাকাত নামাজের স্থলাভিষিক্ত। তাই চুপ করে খুতবা শুনতে হবে। অনেক মসজিদে খুতবার সময় দানবাক্স চালাতে দেখা যায়, এটা অনুচিত ও শরিয়ত গর্হিত কাজ।

হাদিসে আছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘জুমার দিন খুতবা চলাকালে তুমি যদি তোমার সাথিকে বলো, চুপ করো, তাহলে তুমিও অনর্থক কাজ করলে।’ -সহিহ বুখারি ও মুসলিম

 

অন্যান্য দিনের জোহরের নামাজ আর জুমার নামাজের প্রধান তফাত হলো খুতবা প্রদান এবং উপস্থিত মুসল্লিদের তা শ্রবণ করা। খতিব সাহেব কর্তৃক প্রদত্ত প্রথম খুতবায় থাকবে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা, পরামর্শ প্রদান ও সতর্কীকরণ। দ্বিতীয় খুতবায় থাকবে হামদ ও নাতসহ নিজের ও উপস্থিত মুসল্লিদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং অন্যদের জন্য দোয়া করা ইত্যাদি।

উভয় খুতবাই আরবি ভাষায় হতে হবে। তবে দ্বিতীয় খুতবাটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহ প্রায় একই রকমভাবে প্রদান করে থাকে; যেমন নামাজের জন্য আজান ও ইকামতের ক্ষেত্রে হয়।

বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদের প্রত্যেকটিতে জুমা-পূর্ব বয়ানও হয়ে থাকে। জুমা-পূর্ব এসব বয়ান হতে পারে উপস্থিত মুসল্লিদের জন্য দ্বীন ও ইসলাম শিক্ষার অন্যতম একটি মাধ্যম। কিন্তু সুষ্ঠু ও যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে তা হয়ে উঠছে না। দেশব্যাপী ইমাম ও খতিব সাহেবরা যদি একটি সম্মিলিত পরিকল্পনার মাধ্যমে জুমা-পূর্ব বয়ানগুলো রাখেন তাহলে মানুষ এর দ্বারা বেশি উপকৃত হবে।

এখন দেখা যায়, এক মসজিদে ওয়াজ হচ্ছে নামাজের ফজিলত নিয়ে তো অন্য মসজিদে হচ্ছে দান-খয়রাতের বিষয় নিয়ে। বারবার ঘুরেফিরে একই ওয়াজ বছরান্তে মুসল্লিদের শুনতে হচ্ছে। ফলে খুতবা-পূর্ব বয়ানে মুসল্লির উপস্থিতি দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ইসলাম বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, খুতবা-পূর্ব বয়ানকে সমসাময়িক বিষয় দিয়ে সাজিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে মুসল্লিদের সামনে পেশ করা। প্রত্যেক সপ্তাহে নিত্যনতুন বিষয়ে মানুষকে উপদেশ দেওয়া। মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ সমস্যার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করা। শুধু ফজিলতের কথা না বলে সামাজিক বিভিন্ন অনাচার ও সমস্যা নিয়েও কথা বলা।

এ ক্ষেত্রে ইমাম ও খতিব সাহেবরা নিচের বিষয়গুলো নির্বাচন করতে পারেন। সুদের ভয়াবহতা ও সুদজনিত কারণে অর্থনৈতিক দৈন্য, ঘুষ-দুর্নীতি পরিহারের পন্থা, সন্ত্রাস, ছিনতাই ও চুরি-ডাকাতি বন্ধে ইসলামের পদক্ষেপ, ইভটিজিং, মাদক ও ধূমপানের বিরুদ্ধে ইসলামের বিধান, মাপে বা ওজনে কম প্রদান ও খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মেশানোর বিরুদ্ধে শরিয়তের হুকুম, সন্ত্রাস ও উগ্র জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করা, যৌতুক প্রথা উচ্ছেদে ইসলাম কী বলে, নারীর অধিকার প্রদানে ইসলাম, রাষ্ট্রে বসবাসরত প্রত্যেক নাগরিকের জানমাল ও ইজ্জতের প্রতি সম্মানে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অন্য ধর্মাবলম্বীসহ সবার সঙ্গে সদাচরণ করতে উদ্বুদ্ধকরণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে নসিহত, অন্যের সম্পদ ভোগদখল করার পরিণতি সম্পর্কে কোরআন-হাদিসের বক্তব্য জানানো, ইসলামের নান্দনিক সৌন্দর্যবোধ, দাওয়াতে তাবলিগ, ভোটাধিকার, মানবাধিকারসহ শিশুর প্রতি ইসলামের নির্দেশনা; মোট কথা নীতি-নৈতিকতা বলতে যা কিছু বোঝায় ও অন্যায় বলে যা কিছু স্বীকৃত সবকিছু সম্পর্কে মানুষকে ইসলামের কথা বলে সঠিক পথের দিশা দেওয়াই হবে একজন সচেতন ইমাম ও খতিবের মূল দায়িত্ব।

 

লেখক : শিক্ষক ও কলাম লেখক

"