প্রতিক্রিয়া

দর্শক কেন ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্র পছন্দ করে

এস আর শানু খান

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন জাতি আমরা। নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারীও আমরা। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে কিঞ্চিৎ সীমাবদ্ধতা থাকলেও অন্য কোনো দিক দিয়ে পিছিয়ে নেই এ দেশ। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, সোনার বাংলাদেশ। সারা বিশ্বের নামীদামি সব দেশের জায়গাগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেই স্পষ্ট হবে যে, সব জায়গাতেই এই বাংলার কেউ না কেউ উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলো জ্বালাচ্ছেন। ক্ষমতা কিংবা যোগাযোগের খাতিরে নয়; একমাত্র শ্রম, মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রতিভার বলেই সেখানে পৌঁছেছেন তারা। আমরা সেই ভাষায় কথা বলি, যা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃত। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি আছেন, যারা প্রকাশ্যে বাংলা ভাষা শেখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন অজস্রবার। তবে কিসে আমরা পিছিয়ে।

বাংলা চলচ্চিত্রকে হিংস্র বাঘের মতো খামচে ধরেছে ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্র। তবে এর পেছনে কারণ আছে অনেক। এটা যে শুধু ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের হিংস্রতা তা নয়। এর জন্য আমাদের চলচ্চিত্রের হরিণী ভাবমূর্তিটাও কিন্তু কম দায়ী নয়। বাঘের চেহারা দেখলেই কিংবা শব্দ শুনলেই হরিণ যেখানেই থাকুক না কেন, চোখ বুজে দৌড়ে পালায়। বাঘ আসলে কী জিনিস, কী করে সেটা অনেক হরিণের বাচ্চা না জানলেও দেখা মাত্রই পড়িমরি দৌড় আরম্ভ করে। কেননা সে এটা দেখে শিখেছে তার মায়ের কাছ থেকে। যুগের পর যুগ অবলা হরিণ এভাবেই বাঘের হয়রানির শিকার হয়ে আসছে। বাঘের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় বলতে হরিণ দৌড়ে পালানো ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না। কখনো ভাবেনি, পালানো ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা আছে কি না।

আমরা মুখে বলি ভারতীয় চলচ্চিত্র চাই না। অথচ মনে মনে আবার অনুসরণ করে চলি ভারতীয় কলাকুশলীদের। আমাদের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন, যাদের রয়েছে এ দেশের অগণিত ভক্ত। অথচ সেই অভিনেতা-অভিনেত্রীরা বিভিন্ন টকশো বা রিয়েলিটি শোতে গিয়ে উপস্থাপক যখন জিজ্ঞেস করেন, আপনি কাকে অনুসরণ করেন। তখন চোখ বুজে বলে দেন ভারতীয় কোনো শিল্পীর নাম।

মনে করুন, আপনি কোথাও মেয়ে দেখতে গেছেন। মেয়ের বাবা-কাকা দুই ভাই। দুই ভাইয়েরই একটি করে মেয়ে আছে। দুজনেই খুব সুন্দর। আপনি দেখতে গেছেন একজনকে। কিন্তু আপনি যেকোনোভাবেই দুই মেয়েকেই দেখে ফেলেছেন। একজনের থেকে আর একজন ভালো। কেউ কারো থেকে কোনো অংশে কম নয়। এমন পরিস্থিতিতে আপনি যে মেয়ে দেখতে গেছেন, সেই মেয়ের বাবা যদি বলেই বসেন যে, আমার মেয়ে থেকে আমার ছোট ভাইয়ের মেয়ে শতগুণ ভালো তখন আপনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন। নিশ্চয় ছোট ভাইয়ের মেয়েটাকেই পছন্দ করবেন। ঠিক তেমনটাই ঘটছে আমাদের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে। আমাদের দেশের নামীদামি সব অভিনেতা-অভিনেত্রী সব সময় ভারতীয় চলচ্চিত্রের জয়গান গেয়ে থাকেন। এ ছাড়াও আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের একটি প্রধান সমস্যা হলো, একটি ছবির সঙ্গে ডজন খানেক ছবির কাহিনির সাদৃশ্য দেখা যায়। এক মিনিট দেখলে অগ্রিম বিশ মিনিটের সংলাপ-কাহিনি বলে দিতে পারে দর্শক। নির্মাতারা খুব অলস হয়ে পড়েছেন। নিজের ভেতর থেকে নতুন কিছু বের করতে রাজি নন। শুধু কপি-পেস্ট করতে পটু হয়ে পড়েছেন। এসব কারণেই দর্শক বাংলা সিনেমার প্রতি তার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। হারিয়ে ফেলেছেন সেই আস্থা যে শুধু সাদৃশ্য নয় নতুন ব্যতিক্রমী কিছুও আসতে পারে বাংলা সিনেমায়। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা অভিনয় করতে পারি না বা আমাদের যোগ্যতা নেই বিষয়টা তা নয়। অনেক বাংলাদেশি আছেন, যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন চলচ্চিত্রে দাপটের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন এবং সেখানকার অনেক জনপ্রিয় শিল্পীদেরকেও টপকাচ্ছেন। শুধু দর্শকের দোষ মনে করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে দিনে দিনে দেশের চলচ্চিত্র দর্শকশূন্যতায় ভুগবে। পৈত্রিক কিংবা মাতৃক কোটায় নয়, কর্মঠ এবং বাস্তববাদী শিল্পী অন্বেষণ করতে হবে।

তাই আমাদের উচিত নতুনত্বকে প্রাধান্য দেওয়া। সঠিকও যথাযথ মানসম্মত সিনেমা বানানো। আমাদের সরকার বাংলা সিনেমাকে এগিয়ে নিতে যা কিছু দরকার, সেগুলো অবশ্যই সরবরাহ করবে বলে আশা রাখছি।

লেখক : চলচ্চিত্রকর্মী

"