প্রত্যাশা

কবে বন্ধ হবে শিশুশ্রম

ফারিহা হোসেন প্রভা

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। আজকের শিশুরাই দেশ ও জাতির আগামীর কর্ণধার। পৃথিবীর প্রতিটি শিশু ফুলের মতো নিষ্পাপ, ফুল আর পবিত্রতার প্রতীক। সব দেশের সব কালে সব মানুষের হৃদয়ে শিশুরা পরম ¯েœহে অধিষ্ঠিত। শিশুরা নতুন কুঁড়ি। তাদের প্রস্ফুটিত রঙে ও সৌরভে আলোকিত এবং আমোদিত হবে অনাগত আগামী। তাই কবির ভাষায় বলা যায়, ‘আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।’ এ কারণেই প্রতিটি শিশুর নিরাপদ জন্মগ্রহণ, বিকাশ ও বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে সম্মিলিতভাবে আমাদের সবাইকে। আশার কথা হচ্ছে, এ ব্যাপারে সরকার ব্যাপক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। এখন অপেক্ষা এসব কাজের সুফল পাওয়ার। এত কিছুর পরও দুঃখজনক হলেও সত্য আজ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর দেশে দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতা, শিশুশ্রম বৃদ্ধি, নির্যাতন, নিপীড়ন বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। কিন্তু এ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও পরিত্রাণের উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক নয়। এখন একজন শিশু আপন গৃহেও নিরাপদ নয়। এই চিত্র দেশ-বিদেশে সর্বত্র কমবেশি দৃশ্যমান। যেখানে নিজ গৃহ শিশুর জন্য অনিরাপদ; সেখানে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার সময় এসেছে। কারণ আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ‘একটি সুস্থ-সবল শিশুই’ আগামী দিনকে সুন্দর করে নির্মাণ করতে পারে, পারে জাতির জন্য, পারে মানুষের জন্য একটি উন্নত সমাজ উপহার দিতে।

অবশ্য আশার কথা হচ্ছে, শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণে এখন দেশ-বিদেশে, ঘরে-বাইরে, রাজনৈতিক প্লাটফর্মে, স্থানীয় ও বৈশ্বিক পরিমন্ডলে আলোচনা হচ্ছে। এ বাস্তবতায় আজ বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম, শিশু অধিকার লঙ্ঘন একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। শিশুশ্রম যেকোনো জাতির জন্য একটি সামাজিক অভিশাপ। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী ছেলেমেয়ে সবাই শিশু। বাংলাদেশে সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার জন্য শিশুর কোনো একক সংজ্ঞা না থাকলেও জাতীয় শিশুনীতিতে কেবল ১৪ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। শিশুশ্রম হলো শিশুদের দ্বারা সম্পাদিত যেকোনো ধরনের কাজ; যা শিশুর পরিপূর্ণ দৈহিক বিকাশে, প্রত্যাশিত ন্যূনতম শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ কিংবা শিশুর প্রয়োজনীয় চিত্তবিনোদনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুশ্রমের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, যখন কোনো শ্রম বা কর্মপরিবেশ শিশুর স্বাস্থ্য বা দৈহিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক ও ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়ায়; তখন তা শিশুশ্রম হিসেবে বিবেচিত হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা প্রকাশিত ১৯৯৯ সালের এক রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সাড়ে ১৫ কোটি শিশুশ্রমিক রয়েছে; যাদের মধ্যে শতকরা ৪৬ ভাগ মেয়ে। গোটা বিশ্বে কর্মরত প্রতি পাঁচজন শিশুশ্রমিকের মধ্যে শতকরা তিনজন শিশুই এশিয়া মহাদেশের। এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের মোট শ্রমশক্তির শতকরা ১৭ ভাগই হলো শিশুশ্রমিক। ইতালির নেপলসে কেবল চামড়াশিল্পে এক হাজার শিশুশ্রমিক কর্মরত রয়েছে।

গ্রামবাংলায় শিশুরা কৃষিকাজে পিতা-মাতাকে সাহায্য করে আসছে, কিন্তু এখন দেশের সর্বক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে শিশুদের বিভিন্ন কাজে বা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শ্রমে নিয়োজিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট শ্রমিকের শতকরা ১২ ভাগ শিশুশ্রমিক। আজকের এ শিশুদের জায়গা হওয়ার কথা ছিল পরিবার ও বিদ্যালয়। কিন্তু বাস্তবতার কারণে জীবিকার তাগিদে পরিবারে সবার খাদ্যের জোগান দেওয়া, অর্থ সংকটে পড়ে তাদের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হতে হচ্ছে। শিশুশ্রম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে নিচের বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষ করে দেশে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, দারিদ্র্য ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নিরক্ষরতা ও অজ্ঞতা, কৃষিক্ষেত্রে সনাতন চাষাবাদ পদ্ধতি, ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা, বয়স্ক শ্রমিকদের বেকারত্ব বৃদ্ধির প্রভাব, গৃহহীন ভাসমান মানুষের হার বৃদ্ধি, শিশুশ্রম নিয়ন্ত্রণের আইনগত সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োগের অপর্যাপ্ততা, অসচেতনতা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নিরক্ষরতা ও দারিদ্র্য শিশুশ্রম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। যে বয়সে শিশুকে বইখাতা নিয়ে ভবিষ্যৎ জীবনগঠনে ব্যস্ত থাকার কথা; সে বয়সে তাকে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে পারিবারিক প্রয়োজনে ও অভাবের তাগিদেই মূলত অর্থ উপার্জনে আত্মনিয়োগ করতে হয়।

শিশুশ্রম শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। শিশুশ্রমের মাধ্যমে শিশুরা অর্থনৈতিকভাবে শোষণের শিকার হয়। অর্থনৈতিক শোষণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সব ক্ষতিকর কাজ থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার সব শিশুরই রয়েছে। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের গৃহীত শিশু অধিকার সনদ ১৯৯০ সালে আন্তর্জাতিক আইনের অংশে পরিণত হয়। বাংলাদেশ শিশু সনদ অনুসমর্থনকারী অন্যতম দেশ। যেসব কাজ শিশুদের শিক্ষায় বাধা সৃষ্টি করে এবং শিশুদের স্বাস্থ্য বিকাশের জন্য ক্ষতিকর; সে কাজগুলো শিশু সনদে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকার সাংবিধানিক নীতিমালার আলোকে শিশুশ্রম বন্ধের জন্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইনটি শিশুশ্রম প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম কার্যকরী আইন। শিশুশ্রম নিয়ন্ত্রণে এবং শিশু অধিকার সংরক্ষণে সরকার ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিশুনীতি প্রণয়ন করেছে। জাতীয় শিশুনীতিতে ঝুঁকিপূর্ণ কায়িক শ্রম, শোষণ, দূষিত পরিবেশ, শিশুশ্রমের অপব্যবহার কার্যকরভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

শিশুরা জাতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ সম্পদ। শিশুশ্রম বন্ধের মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও বিকাশ তথা আগামী দিনের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পথ সুগম এবং নিশ্চিত করতে হবে। শিশুশ্রম কেবল শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিকাশের প্রতিবন্ধক নয়। সমাজে অনেক সমস্যা রয়েছে, যা শিশুশ্রমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে উদ্ভূত। শিশুশ্রম জাতীয় উন্নতির বাধাস্বরূপ। শিশুশ্রম নিরসনের মাধ্যমে সুস্থ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে শিশুর অধিকার সংরক্ষণ করা সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

অবশ্য ইতোপূর্বে রাজধানীতে একাধিক অনুষ্ঠানে সরকারের কর্মপরিকল্পনা উল্লেখ করে নীতিনির্ধারকদের প্রদত্ত বক্তব্যে ওঠে আসে, সরকার শিশুশ্রম কমিয়ে আনতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে শিশুশ্রম কমবে। একই কথা উচ্চারিত হয়েছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর মুখেও। প্রধানমন্ত্রী নিজেও একাধিক অনুষ্ঠানে শিশুশ্রম নিরসনে তার সরকারের দৃপ্ত অঙ্গিকার ঘোষণা করে বক্তব্য দিয়েছেন। এতে কিছুটা হলেও আশার বাণী শোনা যাচ্ছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আজকের শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজš§। কাজেই তাদের বেড়ে ওঠা, পথচলা সুগম, সুন্দর ও নিরাপদ হোকÑএটা নিশ্চিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলকে যথাযথ ভূমিকা নিতে হবে। নতুবা ভবিষ্যৎ প্রজšে§র শিশুরা অনিশ্চয়তায় থাকলে দেশ ও জাতির উন্নয়ন অগ্রগতি সামগ্রিকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। নিশ্চয় সেটি কারো কাম্য নয়।

লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

"