রোহিঙ্গা গণহত্যা

মূক ও বধির বিশ্ববিবেক!

মোতাহার হোসেন

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

বিশ্বের দেশে দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা, হত্যার ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে মিয়ানমারে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর সে দেশের সামরিক জান্তার চলমান হামলা, নির্যাতন, ১০ বছরের ঊর্ধ্বে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়নের মাত্রা ছাড়িয়েছে দুঃখজনক পর্যায়ে। এক কথায় এখন নিজভূমে পরবাসী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। সংখ্যালঘু এই রোহিঙ্গাদের সে দেশের বাসিন্দা মনে করেন না জাতিগত সংখ্যাগুরু বৌদ্ধরা। অবশ্য বিগত আশির দশকের মাঝামাঝিতে প্রকাশ্যে আসে মিয়ানমারে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, হত্যাকান্ড, নির্যাতন-নিপীড়ন, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, জোর করে তাদের ভিটেবাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা। সেই থেকে ধারাবাহিকভাবে কমবেশি এ নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা, বাড়িঘর থেকে জোর-জবরদস্তি করে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে চলেছে। কিন্তু বরাবরই বিশ্ববাসী শুধু নীরব দর্শকের ভূমিকায় চেয়ে চেয়ে দেখেছে। তেমন জোরালো প্রতিবাদ, প্রতিরোধে এ নির্যাতন বন্ধ না হলে ওই সরকারের ওপর আরোপ করা হয়নি বিধিনিষেধ।

দেশি-বিদেশি প্রচারমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিদিন লোমহর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে চলেছে। ভেবে কষ্ট লাগে, মিয়ামনারের রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির দল। যিনি সারা জীবন অধিকারহারা, গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। এজন্য তাকে জীবনের বেশির ভাগ সময় রাখা হয়েছে অন্তরীণ। ভোগ করতে হয়েছে নির্যাতন, নিপীড়ন। আর আজ তিনি এবং তার দল ক্ষমতায় এসে এখন শান্তি এবং মানবতাবিরোধী কর্মকান্ড করছেন।

কষ্টটা মূলত এ কারণেই। প্রত্যাশা ছিলÑ তিনি ও তার সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগী হবেন। গণতান্ত্রিক ও সংগ্রামীকন্যা অং সান সু চি কীভাবে ‘গণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী সরকারে’ রূপান্তরিত হলেন, সে প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তামাম দুনিয়ার বিবেকবান মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক নেত্রী সু চির ক্ষমতাকালীন কীভাবে সংঘটিত হতে পারে রাখাইন রাজ্যে নিরীহ নিরস্ত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর সর্বনাশা মারণাস্ত্রের প্রয়োগ। কীভাবে সেখানে নারী-পুরুষ, শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এই আগুনে পুড়ে মানুষ অঙ্গার-কয়লা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে মানবতার বিরুদ্ধে, মানবাধিকারের বিরুদ্ধে, শান্তির বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এত কিছুর পরও এখন পর্যন্ত বিশ্ববিবেক, বিশ্ববাসীর এই গণহত্যা, মানবতার চরম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে স্বোচ্চার প্রতিবাদ চোখে পড়েনি। চোখে পড়েনি বিশ্বের গণতন্ত্র ও শান্তির পক্ষে থাকা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের কোনো বক্তব্য-বিবৃতি। এই বিষয়ের সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্য এবং প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয় কিশোরগঞ্জের মরমি কবি ও গবেষক ইবনে সালেহ মুনতাসির রচিত ‘তাদের জন্য শোকগাঁথা’ শীর্ষক লিরিকটি। লিরিকটির কিছু অংশ তুলে ধরা হলো: ‘চীনা মার্কিনীরা জাতিগত দাঙ্গা সহিংসতা নিষ্ঠুরতায় খেলে দাবার খেলা/অং সান সুচিদের অসুরতা বর্বরতার শিকার রোহিঙ্গাদের কোথায় ভেলা/হাজার বছরের স্মৃতি ইতিহাস কথা বলে রোহিঙ্গাদের গণতন্ত্রের মেলায়/ঘৃণ্য জাতিগত সহিংসতায় রোহিঙ্গারা কেন হবে খেলায়॥ বিশ্ববিবেক জাগ্রত সুরে কেন কথা বলে না তার সুরে/সেদিন কি খুব বেশী দূরে যেদিন জাতীয়তাবাদীদের দখলে যাবে বিশ্ব দূরে/থামাতে হবে এ বর্বরতা অসুরতা সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে/তা নাহলে গণতন্ত্র মানবাধিকারের কথা বলা অসার হবে ধূপনাছে॥’ পত্রিকার খবর অনুযায়ী, মিয়ানমার সরকার স্বীকার করে না তাদের নাগরিক হিসেবে। যেকোনো ছুতো পেলেই রোহিঙ্গাদের ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। সংখ্যাগুরুদের দেওয়া আগুনে ঘর পোড়ে; দেহ পুড়ে হয় ছাই। এবার রোহিঙ্গাদের ওপর চড়াও হয়েছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ।

দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে রোহিঙ্গা পুরুষরা মরছে গুলি খেয়ে। শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে গলা কেটে, আর নারীদের ওপর চলছে দলবদ্ধ ধর্ষণ। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে এসব মুসলিমকে বাধ্য করা হচ্ছে দেশ ছেড়ে পালাতে। এভাবেই গত দেড় মাস ধরে মিয়ানমারে বিপন্ন মানবতা কেঁদে বেড়াচ্ছে নাফ নদীর ওপারে। আন্তর্জাতিক বিশ্ব যেন নিরুপায় ‘শান্তির নোবেল’ জয়ী অং সান সু চির দেশে।

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রায় ১০ লাখ মানুষের বাস। গত ৯ অক্টোবর সীমান্ত বাহিনীর চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর চরম নির্যাতন শুরু করে দেশটির সেনা ও পুলিশ। গত দেড় মাসে ৩ শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। রোহিঙ্গাদের ১২ শতাধিক বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়েছে। স্যাটেলাইটে পাওয়া ছবির ভিত্তিতে এমন বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। জাতিসংঘের এক হিসাব অনুযায়ী, চলমান এই সংঘাতে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এসব নির্যাতিত রোহিঙ্গার অনেকেই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে হেঁটে বা নদীপথে বাংলাদেশমুখী হচ্ছে আশ্রয়ের জন্য। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার এক কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক বলেন, মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের হত্যা করছে, শিশুদের গলা কাটছে, নারীদের করছে ধর্ষণ। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে তাদের নদী পার হয়ে পাশের দেশ বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য করছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশ মিলিতভাবেই রোহিঙ্গাদের ওপর এসব নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। এতে মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের পুরো জাতিকেই নির্মূল করতে চায় দেশটির সরকার। তবে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গাই বর্ণনা দিয়েছে ভয়াবহ নির্যাতনের।

মানবতার বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হলেও খুব সাদামাটাভাবেই অং সান সু চি বলেছেন, সংকট উত্তরণে ‘সময়’ লাগবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বরাবরই মুখ বুজে থেকেছেন সু চি। তার সরকার এখন ক্ষমতায়। তার বিরুদ্ধে তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিযোগÑ রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য করছেন না তিনি। এ অভিযোগ অস্বীকার করে সু চি বলেছেন, দেশের মানবিক সংকট থেকে উত্তরণে সময় লাগবে। সরকার কাজ করছে কীভাবে সমস্যা সমাধান করা যায় বলেও মন্তব্য সু চির। সু চির রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) সরকার গঠনের ছয় মাসপূর্তিতে সম্প্রতি মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সু চি আরো বলেন, আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বদ্ধপরিকর। রাখাইনের সমস্যা এক-দুই দিনের নয়। দশকের পর দশক ধরে এ সমস্যা বিরাজমান। আর তা এক রাতের মধ্যেই সমাধান করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আমরা দেশের সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা বা নিরাপত্তা নস্যাৎ হতে দিতে পারি না।

সামরিক জান্তার নির্যাতন থেকে পরিত্রাণে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজারসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় অবৈধভাবে বসবাস করে আসছে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিসহ নানা অপরাধ অপকর্মে জড়িয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। এমনকি বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে রোহিঙ্গারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে সেসব দেশেও সমস্যা সৃষ্টি করেছে মর্মে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœœ হচ্ছে মারাত্মকভাবে। এমনই অবস্থায় নতুন করে যদি এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে তাহলে জনবহুল এই দেশে নতুন করে বহুবিধ সমস্যা সৃষ্টি হবে। কাজেই যেকোনোভাবেই হোক দেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হবে যেকোনো উপায়ে। এটাও সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলকে মনে রাখতে হবে।

কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার রক্ষা, শ্বেতাঙ্গদের হামলা-নির্যাতন, নিপীড়ন, কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা ম্যান্ডেলা এবং বাংলাদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু জাতির অধিকার আদায়ে সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, আত্মত্যাগ বিশ্বে আজ এক জ্বলন্ত ইতিহাস। অথচ মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেত্রী সু চির বিগত সাড়ে তিন দশকের সংগ্রাম, আন্দোলন, আত্মত্যাগ আজ ধুলায় মিশে যাচ্ছে। কলঙ্কিত এবং কালিমা লিপ্ত হচ্ছে সু চির সেই সোনালি অতীত। কারণ তিনি চিরদিনের জন্য, চিরকালীনভাবে নেত্রী গণমানুষের, নির্যাতিত মানুষের, শোষিত মানুষের নেত্রী হতে পারতেন ‘রোহিঙ্গা ইস্যু’তে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে। কারণ দীর্ঘ সেনাশাসনে জর্জরিত মিয়ানমারের মতো একটি দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লড়াই করে বিশ্বের দরবারে আইকনে পরিণত হয়েছেন সু চি। তাকে বলা হয়, মিয়ানমারের ‘ম্যান্ডেলা’। গণতন্ত্রের জন্য ম্যান্ডেলা জেল খেটেছেন ২৭ বছর, বঙ্গবন্ধু ২৪ বছর, আর সু চি গৃহবন্দি থেকেছেন ১৫ বছরের বেশি সময়। জেলে থাকতেই তারা বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত হয়েছেন জাতির গণতন্ত্রের নায়ক হিসেবে। পরবর্তীকালে ম্যান্ডেলা ও সু চি দুজনই ভূষিত হয়েছেন শান্তির নোবেল পুরস্কারে। কারামুক্তির পর ম্যান্ডেলা হয়েছেন দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে সু চি প্রেসিডেন্ট পদে না বসলেও কার্যত প্রেসিডেন্ট; রাষ্ট্রের একচ্ছত্র চালিকাশক্তি তিনিই। তবে গণতন্ত্র ও মানবতার জন্য জীবনের শেষ পর্যন্ত ম্যান্ডেলা কাজ করে গেলেও সু চি পিছিয়ে গেলেন অজানা কারণে। কারণ হিসেবে নিন্দুকের কথায়, ক্ষমতার লোভ তাকে পেয়ে বসেছে। জান্তার হাত থেকে নিজের ক্ষমতা সুসংহত রাখতেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো কথা বলছেন না তিনি। তাই গণমাধ্যমগুলোতে কেউ কেউ বলছেন, সু চি একজন ‘গণতান্ত্রিক স্বৈরশাসক’। আমাদের প্রত্যাশাÑ রাখাইন সম্প্রদায়ের ওপর বর্বরোচিত এই হামলা, হত্যা, নির্যাতন বন্ধে শুধুু অং সান সু চিই নন, বিশ্ববিবেক জাগ্রত হবে। মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত এই অপরাধ রুখতে বিশ্ববাসী এগিয়ে আসবে। নতুবা মানুষ হিসেবে আমরা প্রত্যেকেই বিবেকের কাঠগড়ায় অপরাধী হয়ে থাকব।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

motaherbd123@gmail.com

"