ওষুধ প্রশাসনের দিকে নজর দেওয়া জরুরি

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

ভেজাল ও বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে শিশুমৃত্যুর মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। ওষুধ প্রশাসনের অবহেলা, অদক্ষতা ও অযোগ্যতার কারণেই এমনটি ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। এমন ঘটনা যে এবারই প্রথম ঘটল, তা নয়। এর আগেও ভেজাল প্যারাসিটামল সেবনে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং এ-সংক্রান্ত মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন ওষুধ প্রশাসনের গাফিলতির কারণে। গত রোববারে যে মামলার রায় বেরিয়েছে তাতে রিড ফার্মাসিউটিক্যালের মালিকসহ পাঁচজন বেকসুর খালাস পেয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ২০০৯ সালে ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রিড ফার্মাসিউটিক্যালসের প্যারাসিটামল খেয়ে ২৮ শিশুর করুণ মৃত্যু হয়। এ ছাড়াও ২৩ বছর আগে আরো একটি ফার্মাসিউটিক্যালসের প্যারাসিটামল খেয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়। সে মামলায়ও আসামিরা খালাস পান। অর্থাৎ দুটি বড় ওষুধ কেলেঙ্কারির মামলা প্রমাণে ওষুধ প্রশাসন ব্যর্থ হয়। শুধু এই দুটি ব্যর্থতাই নয়, স্বাস্থ্য দফতরের তথ্যের বরাত দিয়ে মঙ্গলবারের প্রতিদিনের সংবাদের খবরে বলা হয়েছে যে, ১৯৮৩ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দশ বছরে ভেজাল ওষুধ খেয়ে প্রায় ২৭০০ শিশু মারা যায়। এসব ঘটনায় ১৯৯২ সালে ওষুধ প্রশাসন মামলা করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আসামিরা খালাস পান। বাকি অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রে সাজা হলেও তা ছিল কয়েক বছরের কারাদন্ডের মতো লঘুদন্ড। মোটকথা ভেজাল ওষুধ নিয়ন্ত্রণে ওষুধ প্রশাসন বারবারই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। আর তাতে মৃত্যু ঘটছে অসংখ্য শিশুসহ অন্যান্য রোগীর। বিষয় বিচারে এটা বলা অসঙ্গত নয় যে, ওষুধ প্রশাসনের কাছে মানুষের বিশেষ করে শিশুদের প্রাণের কোনো মূল্যই নেই।

সর্বশেষ মামলাটির রায়ে আদালত যে মতামত দিয়েছেন তা অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। আদালত তার রায়ে আসামিদের বেকসুর খালাস দিয়ে বলেছেন যে, রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। তদন্তে ও আলামত সংগ্রহে গাফিলতি ছিল। এই মামলাটি যখন দায়ের হয়, তখনই তদন্ত রিপোর্ট দেখে এ মামলার বাদী ওষুধ প্রশাসন অর্থাৎ রাষ্ট্রপক্ষের জয়ের ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। শেষ পর্যন্ত হলোও তাই।

ঘটনার বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে ওষুধ প্রশাসনের অবহেলা, অযোগ্যতা ও অদক্ষতা যে ছিল, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বারবার ব্যর্থতায় মনে হয় শুধু এসব কারণই নয়, একই সঙ্গে এ ব্যাপারে ইচ্ছাকৃত গাফিলতিও দায়ী রয়েছে। সেই ইচ্ছাকৃত গাফিলতিটি কেন, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। সভ্য দুনিয়ায় খাদ্য ও ওষুধ এই দুটি বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল বা দুর্নীতি শক্ত হাতে মোকাবিলা করা হয় এবং খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন যেমন এর প্রস্তুতকারক এবং ব্যবসায়ীদের জবাবদিহিতার মধ্যে রাখে তেমনি তারাও সরকারের পক্ষ থেকে কঠিন জবাবদিহিতার মধ্যে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে মনে হয় এর কোনোটিই নেই। থাকলে এমন কয়েক হাজার শিশুমৃত্যুর পরও কেন কোনোটিরই বিচারে সাজা দেওয়া গেল না? আমরা মনে করি, এবার সরকারের উচিত ওষুধ প্রশাসনের এ ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করা এবং দোষী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসা। কারণ যারা মানুষের জীবন নিয়ে এমন গাফিলতির পরিচয় দেয়, তারা কোনোক্রমেই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। এজন্য ওষুধ প্রশাসনের দিকেই নজর দেওয়া জরুরি বলে আমরা মনে করি।

"