মানবতা

তবুও বিবেক জাগে না

অলোক আচার্য্য

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

‘জগৎ জুড়িয়া আছে এক জাতি, সে জাতির নাম মানুষ জাতি, একই পৃথিবীর স্তন্যে লালিত, একই রবি শশী মোদের সাথী।’ কবিতার লাইন কয়েকটি ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মানুষ জাতি কবিতার। কবিতার পুরোটা অংশে তিনি মানুষকে এক জাতি, এক পৃথিবী দ্বিধা বিভক্তহীন এক অভিন্ন সত্তা হিসেবে দেখিয়েছেন। আবার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাম্যের গান গেছেন। তিনি মানব দরদী ও মানবতার জয়গান করে গেছেন। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। মানবতা আজ বিভিন্ন প্রান্তে গুমরে গুমরে কাঁদছে। রাস্তায়, নদীতে, সাগরে ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় মরছে। দেখার যেন কেউ নেই। মানুষগুলো যেন দুচোখ থেকেও বন্ধ করে বসে আছে। চোখের জল মূল্যহীন এক বস্তুতে পরিণত হয়েছে। যেখানে কেবল জাতি, বর্ণবৈষম্য বিদ্যমান। আমি সংখ্যালঘু বুঝি না, সাঁওতাল বুঝি না, রোহিঙ্গা বুঝি না, মানুষ বুঝি। অত্যাচার যার ওপরই হোক না কেন, অন্যায়ের শিকার যেই হোক না কেন সে অত্যাচারের শিকার, জুলুমের শিকার এবং মানুষ মাত্রই তার পাশে দাঁড়ানো উচিত। রোহিঙ্গা শব্দটি দিয়ে মানুষগুলোকেই ছোট করা হয়। কোনো উপজাতি, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর চেয়ে বড় পরিচয় হলো তার মনুষ্যত্ব। সে মানুষ। অধিকার দাবি এবং প্রতিষ্ঠার জন্য এটাই তার প্রধান পরিচয়।

রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন উত্তাল। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম অত্যাচার হচ্ছে। ভয়ংকর নির্মম। আমরা প্রতিবাদ করছি। আবার অনেকেই চুপ করে বসে আছি। এই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার পর থেকেই পৃথিবীতে আশ্রয় পাবার, পৃথিবীর আলো বাতাসে বড় হওয়ার, পৃথিবীতে উৎপাদিত খাদ্যের ওপর তার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু আজ যারা আশ্রয়হীন, যারা আগুনে দগ্ধ হচ্ছে, সাগরে, নদীতে দিনের পর দিন অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে তাদেরও তো একই রকম অধিকার ছিল। মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। কেন চালাচ্ছে? বেশ কিছু রোহিঙ্গা ইতোমধ্যেই দালাল মারফত বা অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করেছে। এসেই তারা বলেছে যে, এদেশের জেলে হলেও আমাদের রাখেন, ওখানে গেলে আমাদের বাঁচতে দেবে না। ওদের চোখে মুখে আতঙ্ক। মৃত্যুভয়, সব হারানোর ভয় ওদের বাধ্য করেছে কোলের শিশুকে নিয়ে সব ছেড়ে দিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতে। ওরাও তো চায়নি। ওরা বাধ্য হয়েই এটা করছে। অনেক মহল থেকে দাবি উঠছে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে। এখন পর্যন্ত সরাসরি কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের বিষয়ে স্থায়ী কোনো সিদ্ধান্ত না দিলেও যারা এদেশে প্রবেশ করেছে তাদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছে। জীবনের সাময়িক নিশ্চয়তা তারা পেয়েছে। আমার মনে হয় আশ্রয় দেওয়াই উচিত। কারণ এক সময় আমরাও কিন্তু আশ্রয় নিয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল ভারত। খাবারও দিয়েছিল তারা। আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম জীবন বাঁচাতে। এখানে রোহিঙ্গাদের বিষয়টি ভিন্ন হলেও প্রাণ বাঁচানোর বিষয়টি কিন্তু এক। প্রাণ বাঁচাতে সবাই ছুটে যায়। আশ্রয় চায়।

কিছুদিন আগেই যখন অভিবাসীর ¯্রােত সাগরে দিনের পর দিন মাসের পর মাস সাগরের জলে ভেসে বেরিয়েছিল, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যদেশে প্রবেশ করতে চাইছিল তাদের সেসব ছবি আমরা দেখেছি। সাগরের তীরে পড়ে থাকা আইলানের মতো ছোট্ট শিশুটির মৃতদেহ দেখে বিশ্ব যখন কেঁদে উঠেছিল আমরা সে ঘটনাও দেখেছিলাম। আজকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের দেশের মানুষ প্রতিবাদমুখর। যে দেশে গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী, শান্তিতে নোবেল জয়ী নেত্রী ক্ষমতায় থাকে তার কাছ থেকে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ এটা আশা করতে পারে না। আমরাও আশা করিনি। মাঝখানে একটা নদীর পার্থক্য। নাফ নদী। সেই নদী পেরিয়ে দালালের হাত ধরে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিচ্ছে আমাদের দেশে। আবার পুশব্যাকও করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে জানা গেছে, দশ বছরের বেশি হলেই তাকে মেরে ফেলছে। নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এত অত্যাচার কেন? পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে তাদের কেন কোন দেশ থাকবে না। কেন তাদের স্থায়ী কোন বসবাসের জায়গা থাকবে না? তাদের একটি পতাকা থাকবে, জাতীয় সঙ্গীত থাকবে, ভূখ- থাকবে, নিরাপত্তার অধিকার থাকবে। মোট কথা পৃথিবীর কোথাও না কোথাও তারা অবশ্যই শান্তিতে নিরাপদে থাকার অধিকার রাখে। হোক সে কোন সংখ্যালঘু, হোক সে সাঁওতাল হোক সে রোহিঙ্গা। কোনো মানুষের ওপর বিন্দুমাত্র নির্যাতন কাম্য নয়। আমরা প্রতিবাদ করছি, কিন্তু তাদের কর্ণ কুহরে আমাদের ঘৃণার বাণী পৌঁছানো যাচ্ছে না। তাদের মনে ঘৃণ্য দরজায় শুধু অন্ধকার। দানবদের হিংসার আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে বিবেকপূর্ণ সমাজ। নিরাপদ পৃথিবী চেয়েও নিরাপদ করতে চেয়েও পারছি না। বাসযোগ্য করতে গিয়ে বার বার এসব নিষ্ঠুর মানুষ বেরিয়ে আসছে। জানি না আর কত দূর সে পথ যেখানে কেবল সভ্য সমাজের সভ্য মানুষেরাই থাকবে।

আমরা মানুষসহ প্রতিটি প্রাণী প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে উঠি। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে ঘুমায় মানুষের ভেতরে থাকা বিবেক। সকালে ঘুম থেকে মানুষ জেগে ওঠে, বিবেক জাগে কী? জাগে না। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে বিবেক জেগে ওঠে না জন্যই আজ পৃথিবীতে এত ঘৃণা, হিংসা, মারামারি। কত রক্ত জল হয়ে সাগরে মিশলে মনুষ্যত্ব জাগবে বলতে পারি না। লেখার পর লেখায় পত্রিকার পাতা ভরে উঠবে, টক-শোতে টিভি বিতর্ক জমে উঠবে, কিন্তু অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটবে না। খাবারের জন্য হাহাকার দূর হবে না। বর্ণের ভিত্তিতে, গোত্রের ভিত্তিতে যারা মূল্যায়িত হবে তাদের কোন দেশ থাকতে নেই, তাদের স্বাধীনতা থাকতে নেই, তাদের মাথার ওপরে আকাশ থাকবে তবে তা শুধু হতাশ চোখে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকার জন্য, তাদের কোনো ভূখ- থাকতে নেই। তারা কেবল ক্ষমতার নলের কাছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দৌড়াবে।

তারা সন্তান হারাবে, বাড়িঘর ছেড়ে উদ্বাস্তু হবে। এভাবেই চলতে থাকবে। রূপকথার গল্পে আলাদিন নামের এক ছেলের কাছে একটা আশ্চর্য প্রদীপ ছিল। সেই প্রদীপে তিন ইচ্ছা পূরণ করা এক দৈত্য ছিল। যদি এ রকম কোনো দৈত্য আমার কাছে থাকত আমার মাত্র একটা ইচ্ছা থাকত। তা হলো সবার মাঝে বিবেক জাগিয়ে তোলা। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ভেতরের মানুষটাকে জাগিয়ে তোলা। তবে দৈত্য এটা দিতে পারত কি না সন্দেহ আছে। কারণ পৃথিবীতে এটাই সব থেকে অসম্ভব কাজ। কারণ একবার যদি ভেতরের সত্যিকারের মানুষটাকে জাগিয়ে তোলা যায়, তাহলে পৃথিবীতে কেউ অভুক্ত থাকবে না, কারো চোখে জল থাকবে না। কেউ কাউকে কষ্ট দেবে না। সেই দিন কোনোদিন আসবে কি?

লেখক : কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

"