এই সময়

শিক্ষকের মৃত্যু আমাদের চোখ খুলে দেবে কি

শরিফুর রহমান আদিল

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

স্বল্প খরচে মানসম্মত শিক্ষা, দেশের প্রান্তিক জনগণের নিকট সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ারোধ এবং বাল্যবিবাহ রোধে সরকার প্রতিটি দেশের প্রতিটি উপজেলাতে একটি করে স্কুল ও একটি করে কলেজকে জাতীয়করণ করার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছিল। কিন্তু সরকারের নেওয়া মহতী এ উদ্যোগ শেষ পর্ষন্ত রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে পর্যবসিত হচ্ছে! তা না হলে কোনোরকম নীতিমালা না মেনে কেন যেসব কলেজের বয়স ২-১ বছর, যেগুলোর শিক্ষার্থী সংখ্যা ২০-৫০ জন, যে কলেজে পাসের হার ৫ শতাংশ, অথবা পাসের হার একেবারে শূন্য সেসব কলেজকে কোন নীতিমালা কিংবা কী কারণে জাতীয়করণের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হলো?

সরকারের চারটি শর্ত রেখে নীতিমালা প্রণয়ন করার কী দরকার ছিল, যদি সেই নীতিমালার কোনো প্রতিফলন না ঘটিয়ে কেবল এমপি, মন্ত্রীদের সুপারিশ আর আমলাদের অনৈতিক প্রভাবের বিনিময়ে জাতীয়করণের জন্য প্রতিষ্ঠান মনোয়ন পায়? কেনই বা সরকারের দেওয়া জাতীয়করণের জন্য প্রতিটি শর্ত থাকার পর অনুপযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে? এমনও দেখা গেছে যে, বিভিন্ন স্থানের মন্ত্রী, এমপি, শিক্ষা কর্মকর্তা প্রভৃতি ক্ষমতাবানদের প্রভাব কিংবা অসচেতনতার কারণে অনেক যোগ্য ও মানসম্মত কলেজও জাতীয়করণের আওতায় আসেনি। পরিশেষে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা প্রতিদিনই তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে বিভিন্ন ধরনের বিক্ষোভ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান কিংবা হরতালের মতো কর্মসূচি পালন করছে। আর এসব কর্মসূচি পালন করে কিছু কিছু কলেজ সফলও হয়েছে, অর্থাৎ ওইসব কলেজের নাম জাতীয়করণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে আবার কোনো কোনো অযোগ্য কলেজের নাম জাতীয়করণের তালিকায় থাকলেও পরবর্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচি, কিংবা সংবাদমাধ্যমে ওইসব কলেজের অযোগ্যতা আর টাকা লেনদেনের মাধ্যমে যোগ্য করানোর চেষ্টা বেরিয়ে এলে তাদের বাদ দেওয়া হয় এবং অন্য যোগ্য কলেজকে জাতীয়করণের আশ্বাস দেওয়া হয়। যেমনÑ তালিকায় নোয়াখালীর চরজব্বার কলেজকে বাদ দিয়ে তার জায়গায় সৈকত কলেজকে অন্তর্ভুক্ত করানো আবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী কলেজকে অন্তর্ভুক্ত করে নাজিরহাট কলেজকেও একই উপজেলা থেকে জাতীয়করণের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে! কিন্তু অযোগ্য কলেজকে মনোনয়ন দেওয়ায় কোনো শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ রকম একটি যোগ্য কলেজের নাম ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজÑযার আয়তন, প্রতিষ্ঠাকাল, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ফল সব শর্তই পূরণের পরও অন্য একটি কলেজকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে এসে ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজকে তালিকাভুক্তি থেকে বাদ দেওয়া হয়। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ফুলবাড়িয়া উপজেলার ওই কলেজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই। দীর্ঘ ৪৩ দিন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে পুলিশের গুলি কিংবা বেধড়ক লাঠিপেটায় শিক্ষক ও ভ্যানচালকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে! স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এ কোন সমাজে আমরা বাস করছি যেখানে শিক্ষক কিংবা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা তাদের আঙ্গিনায় আন্দোলন করতে পারবে না? বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সোশ্যাল মিড়িয়া এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার খবরে স্পষ্টই দেখা গেছে, পুলিশ কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রবেশ করে ছাত্র-শিক্ষক এমনকি ছাত্রীদের বেধড়ক পেটাতে, যদিও পরে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার রাতে বেসরকারি এক টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পুলিশকে নির্দোষ আখ্যা দিয়ে শিক্ষকের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে। কিন্তু একপর্যায়ে সেই পুলিশ সুপার নিজের অজান্তেই নিজের বাহিনীর দোষ স্বীকার করেন। প্রশ্ন হলো এসব অতি-উৎসাহী পুলিশ সদস্যের বিচার হবে কি? প্রশ্ন জাগে পুলিশ কীভাবে একজন শিক্ষকের গায়ে তার কর্মস্থলে এসে লাঠির আঘাত দিতে পারে? কে দেবে এই উত্তর?

শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন শিক্ষকদের বেতন দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তার মানে তাকে মূল্যায়ন করতে হয় সম্মান দিয়ে, তা হলে পুলিশের লাঠিপেটায় শিক্ষকের মৃত্যুকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে? কেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সুরক্ষা আইন তৈরি হলেও শিক্ষকদের সেখানে আওতাভুক্ত করা হলো না? শিক্ষকরা কি এতই অনৈতিক? কেন জাতীয়করণ নিয়ে এই অসন্তোষ? কারা এই অসন্তোষ তৈরি করল তাদের কি বিচার হবে? নাকি বহাল তবিয়তে থেকে এই ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটানোর ফন্দি আঁটবে? শিক্ষককে লাঠিপেটা করতে হবে কেন? কেনইবা শিক্ষকদের জন্য রাবার বুলেট ব্যবহার করতে হবে? তারা তাদের দাবি আদায়ে নিজের কর্মস্থলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে পারবে না? তারা কি রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাঙচুর করছিল নাকি জনজীবনের স্বাভাবিকতাকে বাধা দিচ্ছিল? আর কত শিক্ষকের প্রাণ গেলে উপর্যুক্ত বেতন না দিয়ে সম্মানের বুলি শোনানো হবে? আর কত শিক্ষক লাঞ্ছিত হলে তাদের জন্য সুরক্ষা আইন তৈরি করা হবে। কবে জাতীয়করণের নামে এই কলহ বন্ধ হবে? কেন ডিও লেটারকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে? নীতিমালা থাকলে আবার ডিওর বিষয়টি আসবে কেন? তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, কেউ কেউ ফুলবাড়িয়ার ঘটনাকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার মনে করে শিক্ষক কিংবা ভ্যানচালকের মৃত্যুকে মূল্যহীন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই কোন সমাজ যেখানে শিক্ষকের মৃত্যুর পরও আমরা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে পথ খুঁজি? আমাদের মনে রাখা দরকার, পৃথিবীতে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একেবারে নিঃশর্তভাবে সন্তানের কল্যাণ চায় এক হলো মাতাপিতা আর অন্যটি হলো শিক্ষক সমাজ। অথচ তাদের নিয়ে আজ প্রশ্ন তোলা হচ্ছে!

বলতে দ্বিধা নেই যে, ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজের মতো দেশের সব মাধ্যমিক ও কলেজশিক্ষকদের মনে জাতীয়করণ নিয়ে এই ধরনের ক্ষোভ বিদ্যমান, যার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের মানববন্ধনের মধ্য দিয়ে। শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার নিকট সমগ্র শিক্ষক সম্প্রদায়ের দাবি, ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজের ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা যাতে পরে না ঘটে তার জন্য ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজসহ সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসার ত্বরিৎ ঘোষণা দেওয়া হোক। পাশাপাশি আত্তীকরণ বিধিমালা-২০০০ সংশোধন করে শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়ের দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

 

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক

adil_jnu@yahoo.com

"